গার্দিওলার বিদায়: এক সোনালি যুগের অবসান
- Details
- by খেলাধুলা ডেস্ক
পেপ গার্দিওলা ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে এক দশক ধরে ফুটবল সাম্রাজ্য শাসন করার পর এবার বিদায় নিচ্ছেন। তার এই বিদায় কেবল একটি ক্লাবের সফল অধ্যায়ের সমাপ্তি নয়, বরং আধুনিক ফুটবলের কৌশলগত পরিবর্তনের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার ইস্যুতে একজন সরব কণ্ঠস্বরের প্রস্থানকেও চিহ্নিত করে।

রোববার ইতিহাদ স্টেডিয়ামের টানেল দিয়ে যখন তিনি শেষবারের মতো হেঁটে যাবেন, তখন সেই মুহূর্তটি এক ভিন্ন মাত্রা পাবে। গার্দিওলার হাত ধরে গত এক দশকে ম্যানচেস্টার সিটি যেমন একটি ফুটবল সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছে, তেমনি বিশ্বজুড়ে আধুনিক ফুটবলের খেলার ধরনও বদলে গেছে।
তবে স্কাই ব্লুজদের হয়ে গার্দিওলার শেষ বছরগুলো কেবল কৌশল আর ট্রফি জয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ইসরায়েল যখন গাজায় বর্বরোচিত হামলা চালিয়ে যাচ্ছিল, তখন কাতালান এই কোচ বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষস্থানীয় অল্প কয়েকজন ব্যক্তির মধ্যে অন্যতম হিসেবে ফিলিস্তিনিদের দুর্দশা নিয়ে সরব হন। রাজনৈতিক ঝুঁকি এড়িয়ে চলার প্রবণতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তার উপস্থিতিকে মানবিকতার পক্ষে কথা বলার সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়েছেন।
তার এই বিদায়ের মাধ্যমে এমন এক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটছে, যা ক্লাব এবং প্রিমিয়ার লিগ উভয়েরই পরিচিতি বদলে দিয়েছে এবং এনে দিয়েছে অভূতপূর্ব সাফল্য।
গার্দিওলা বলেন, ‘কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। যদি তা-ই হতো, তবে আমি এখানেই থাকতাম। তবে আমার ম্যানচেস্টার সিটির প্রতি মানুষের যে ভালোবাসা, স্মৃতি ও অনুভূতি রয়েছে, তা চিরকাল অম্লান থাকবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি কেন চলে যাচ্ছি, সেই কারণ জিজ্ঞাসা করবেন না। এর নির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই, তবে আমার মন বলছে, বিদায় নেওয়ার এটাই সঠিক সময়।’
অ্যাস্টন ভিলার বিপক্ষে প্রিমিয়ার লিগের শেষ ম্যাচের মধ্য দিয়ে তার এই যাত্রার পর্দা নামবে, যা অনেক সময় কেবল কোচিং নয়, বরং ফুটবলের এক নতুন ইতিহাস রচনার মতো মনে হয়েছে।
ম্যানচেস্টারে আসার অনেক আগেই গার্দিওলা ফুটবলে পরিবর্তন এনেছিলেন। বার্সেলোনার কাছে সান্তপেদরে জন্মগ্রহণকারী এই ব্যক্তি বার্সেলোনার লা মাসিয়া একাডেমি থেকে ইয়োহান ক্রুইফের ‘ড্রিম টিম’-এর একজন মেধাবী মিডফিল্ডার হিসেবে উঠে আসেন।
খেলোয়াড় হিসেবেও তার ক্যারিয়ার স্পেন ছাড়িয়ে বহুদূর বিস্তৃত ছিল। ২০০১ সালে বার্সেলোনা ছাড়ার পর তিনি ইতালির ব্রেসিয়া ও রোমায় খেলেন। পরে কাতারের আল আহলিতে যোগ দেন এবং ২০০৬ সালের জুলাইয়ে মেক্সিকোর দোরাদোস দে সিনালোয়াতে ক্যারিয়ারের ইতি টানেন। স্পেনের হয়ে তিনি ৪০টিরও বেশি ম্যাচ খেলেছেন।
তবে ডাগআউটে তার প্রভাব ছিল যুগান্তকারী।
২০০৮ সালে বার্সেলোনার দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি একটি প্রতিভাবান দল পান। কিন্তু তিনি সেখানে একটি মতাদর্শ তৈরি করেন। লিওনেল মেসি, জাভি হার্নান্দেজ ও আন্দ্রেস ইনিয়েস্তাদের নিয়ে গড়া তার বার্সেলোনা দল ‘টিকি-টাকা’-কে কেবল কৌশল থেকে ফুটবলের এক নতুন দর্শনে উন্নীত করে।
প্রথম মৌসুমেই বার্সেলোনা ট্রেবল জেতে। ২০০৮ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে গার্দিওলা ১৪টি ট্রফি জেতেন এবং এমন একটি দল তৈরি করেন, যাকে অনেকেই ফুটবল ইতিহাসের সেরা ক্লাব দল বলে মনে করেন।
বায়ার্ন মিউনিখে তার সময়গুলো চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা ছাড়াই সেই কৌশলগত বিপ্লবকে আরও গভীর করেছিল। ২০১৬ সালে ম্যানচেস্টারে পৌঁছানোর পর গার্দিওলা কেবল একজন কোচ ছিলেন না, তিনি হয়ে ওঠেন ফুটবলের প্রধান চিন্তাবিদ।
সিটিতে তার ধারণাগুলো বিশাল আকার ধারণ করে। গোলরক্ষক হয়ে ওঠেন প্লেমেকার, ফুল-ব্যাকরা মিডফিল্ডে চলে আসেন এবং ডিফেন্ডাররা আক্রমণ তৈরিতে ভূমিকা রাখেন। পজিশন বদলানোর এই রীতি কাঠামো এবং উপস্থিত বুদ্ধির মধ্যকার পার্থক্যকে মুছে দেয়।
ইংলিশ ফুটবল একসময় গার্দিওলার পদ্ধতি নিয়ে সন্দিহান থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা মেনে নিতে বাধ্য হয়।
সিটি প্রিমিয়ার লিগের প্রথম দল হিসেবে এক মৌসুমে ১০০ পয়েন্ট অর্জন করে এবং টানা চারটি লিগ শিরোপা জেতে। ২০২৩ সালে ট্রেবল জয় ছিল ম্যানচেস্টারে গার্দিওলার সবচেয়ে বড় অর্জন।
সিটির হয়ে তিনি মোট ২০টি ট্রফি জিতেছেন, যা তার পুরো ম্যানেজারিয়াল ক্যারিয়ারে জেতা ৪১টি শিরোপার প্রায় অর্ধেক। ট্রফির বাইরেও তিনি রেখে যাচ্ছেন এক বিশাল উত্তরাধিকার।
ম্যানচেস্টারে গার্দিওলার শেষ বছরগুলো আরেকটি কারণে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। গাজায় ইসরায়েলের হামলার প্রকাশ্যে নিন্দা জানানো বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর ছিলেন তিনি।
ফুটবল প্রতিষ্ঠান, স্পন্সর ও খেলোয়াড়রা যখন প্রকাশ্যে রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়া এড়িয়ে চলতেন, গার্দিওলা তখন বারবার কথা বলার পথ বেছে নিয়েছেন।
গত বছর তিনি একটি প্রাক-ম্যাচ সংবাদ সম্মেলন এড়িয়ে বার্সেলোনায় ‘অ্যাক্ট এক্স প্যালেস্টাইন’ সংহতি অনুষ্ঠানে যোগ দেন। সেখানে ফিলিস্তিনি কেফিয়াহ পরে তিনি এমন কিছু মন্তব্য করেন, যা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে কোনো শীর্ষ ফুটবল ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে সাহসী বক্তব্য ছিল।
গার্দিওলা বলেন, ‘গত দুই বছর ধরে যখন আমি কোনো শিশুকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা টেলিভিশনে দেখি, যে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে নিজের ভিডিও করে কাঁদছে আর খুঁজছে তার মাকে, অথচ সে জানেই না তার মা কোথায়। তখন আমি ভাবি, তারা কী ভাবছে? আমার মনে হয় আমরা তাদের একা ফেলে রেখেছি, পরিত্যাগ করেছি।’
নিউক্যাসল ইউনাইটেডের বিপক্ষে কারাবাও কাপের সেমিফাইনালের আগে গার্দিওলা আবারও সংবাদ সম্মেলন ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের দুর্দশা নিয়ে কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘মানব ইতিহাসে এর আগে কখনো সবকিছু আমাদের চোখের সামনে এতটা স্পষ্টভাবে আসেনি। ফিলিস্তিনে যে গণহত্যা চলছে, ইউক্রেন, রাশিয়া, সুদান—সব জায়গায় যা ঘটছে, তা মানুষ হিসেবে আমাদের সবার সমস্যা। এটি কেবল ফিলিস্তিনের বিষয় নয়, এটি এমন প্রতিটি কারণের বিষয় যা মানবতাকে আরও উন্নত করতে পারে।’
২০২৫ সালে ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রির বক্তব্যে বিষয়টি আবারও উঠে আসে।
গার্দিওলা বলেন, ‘আমি সঠিক নাকি আপনি ভুল, বিষয়টা তা নয়। বিষয়টা হলো জীবনের প্রতি ভালোবাসা, প্রতিবেশীর প্রতি যত্নশীল হওয়া। গাজার শিশুদের নিয়ে দুঃস্বপ্ন শুরু হওয়ার পর থেকে আমি প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আমার সন্তানদের দেখি এবং খুব ভয় পাই। হয়তো এই ছবিটা আমরা যেখানে বাস করছি সেখান থেকে অনেক দূরের মনে হতে পারে। আপনারা প্রশ্ন করতে পারেন যে আমরা কী করতে পারি।’
গার্দিওলার এসব মন্তব্য ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হলেও এর সমালোচনাও হয়েছে। গত বছর জুইশ রিপ্রেজেন্টেটিভ কাউন্সিল অব গ্রেটার ম্যানচেস্টার অ্যান্ড রিজিওন সিটি চেয়ারম্যান খালদুন আল মুবারককে চিঠি দিয়ে সতর্ক করে যে, তার কথাগুলো ম্যানচেস্টারে থাকা ইহুদিদের জীবনকে বিপন্ন করে তুলছে।
তবে তার এই উদ্বেগ কেবল গাজার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ২০১৮ সালে কারাবন্দি কাতালান রাজনীতিবিদদের সমর্থনে হলুদ ফিতা পরার কারণে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন তাকে ২০ হাজার পাউন্ড জরিমানা করে।
ফেব্রুয়ারিতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি ইউক্রেন, সুদানের সহিংসতা এবং যুক্তরাষ্ট্রে আইসিই (ICE) এজেন্টদের জড়িত থাকার ঘটনায় দুজনের মৃত্যুর বিষয়েও কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘যখন আপনার একটি আদর্শ থাকে এবং সেটি রক্ষা করার জন্য আপনাকে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করতে হয়, তখন আমাকে ক্ষমা করবেন, আমি এর প্রতিবাদ করব। আমি সবসময় এগুলোর বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকব।’
সিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ডাগআউট ছাড়ার পরও গার্দিওলা অ্যাম্বাসেডর এবং উপদেষ্টা হিসেবে সিটি ফুটবল গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন।
এরই মধ্যে পুরো ফুটবল বিশ্ব থেকে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে। ক্লাব চেয়ারম্যান আল মুবারক ঘোষণা করেছেন যে, ইতিহাদ স্টেডিয়ামের নর্থ স্ট্যান্ডের নাম পরিবর্তন করে ‘পেপ গার্দিওলা স্ট্যান্ড’ রাখা হবে।
তবে গার্দিওলার প্রভাব কেবল গ্যালারি বা ট্রফির মধ্যে আটকে রাখা যাবে না। তিনি ফুটবলের জ্যামিতিই বদলে দিয়েছেন। কোচরা কীভাবে চিন্তা করেন, খেলোয়াড়রা কীভাবে ঘোরেন, ক্লাবগুলো কীভাবে দল গঠন করে এবং ভক্তরা কীভাবে খেলাটি বোঝেন—তার সবকিছুতেই তিনি পরিবর্তন এনেছেন।
কর্পোরেট নীরবতা ও সতর্কতার এই যুগে গার্দিওলা এমন এক বিরল ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছেন, যিনি স্টেডিয়ামের বাইরেও মানুষের দুর্দশা নিয়ে জনসমক্ষে কথা বলতে দ্বিধা করেননি।
রোববার ম্যানচেস্টার সিটি তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে সফল ম্যানেজারকে বিদায় জানাবে। তবে ফুটবল বিশ্ব বিদায় জানাবে এই যুগের অন্যতম এক রূপকারকে।
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.