দীর্ঘ ১০ বছরের সফল এক অধ্যায়ের পর ম্যানচেস্টার সিটির কোচের দায়িত্ব থেকে বিদায় নিয়েছেন পেপ গার্দিওলা। নিজের শেষ ম্যাচে হারলেও পুরো ইতিহাদ স্টেডিয়াম জুড়ে ছিল আবেগ আর কান্নার ছড়াছড়ি। এই বিদায়ের মধ্য দিয়ে ইংলিশ ফুটবলে সিটির এক সোনালি যুগের অবসান ঘটল।

অশ্রুসিক্ত বিদায়ে সিটিতে শেষ হলো গার্দিওলা অধ্যায়
পেপ গার্দিওলা

রোববার অ্যাস্টন ভিলার বিপক্ষে নিজের শেষ ম্যাচে ডাগআউটে বেশ শান্তভাবেই দাঁড়িয়ে ছিলেন গার্দিওলা। তবে ৫৯ মিনিটে যখন দলের অধিনায়ক বের্নার্দো সিলভাকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়া হয়, তখন আর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি তিনি। মাঠ ছাড়ার সময় দুই দলের খেলোয়াড়রা পর্তুগিজ এই মিডফিল্ডারকে সম্মান জানান। এ সময় সিলভার পাশাপাশি গার্দিওলার চোখেও পানি দেখা যায়।

ইংলিশ ফুটবলে সিটির সাম্প্রতিক আধিপত্যের দুই মূল কারিগর টাচলাইনে একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন। প্রিমিয়ার লিগের দুই কিংবদন্তির এই আবেগঘন মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দী করেন আলোকচিত্রীরা। কেভিন ডি ব্রুইন, সার্জিও আগুয়েরো এবং ইয়াইয়া তুরের মতো কিংবদন্তিদের ছবির পাশাপাশি এই ছবিটিও ইতিহাদ স্টেডিয়ামের করিডোরে বাঁধাই করে রাখা হবে।

সাদা টি-শার্ট দিয়ে চোখের পানি মুছে নিজের শেষ ম্যাচে দলকে জয় এনে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন এই স্প্যানিশ কোচ। কিন্তু বুধবার ইউরোপা লিগ জয়ের পর আত্মবিশ্বাসী অ্যাস্টন ভিলার কাছে শেষ পর্যন্ত হারতেই হয় সিটিকে। তবে ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে হারের কষ্ট ছাপিয়ে মাঠ এবং গ্যালারিতে শুধুই আবেগ ছড়িয়ে পড়ে।

দিনের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে ৫৫ বছর বয়সী গার্দিওলা বলেন, ‘এই অধ্যায়টি সবসময় থেকে যাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ম্যাচের আগে আজ বের্নার্দো বেশ আবেগপ্রবণ ছিল। আপনি যদি কাঁদতে চান তবে কাঁদুন, হাসতে চাইলে হাসুন। আবেগ প্রকাশ করতে হয়। আমি কাঁদি না, তবে যখন অন্য কাউকে কাঁদতে দেখি, তখন আমারও কান্না পায়।’

এই অসাধারণ যুগের সমাপ্তির সাক্ষী হতে স্টেডিয়ামের বাইরে ভক্তদের উপচে পড়া ভিড় ছিল। ম্যাচ শুরুর আগে গার্দিওলার মুখ আঁকা পতাকা এবং স্কার্ফ দেদারসে বিক্রি হয়েছে। কলিন বেল স্ট্যান্ডের প্রবেশদ্বারে ব্যারিকেডের পাশে শত শত সমর্থক লাইন ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন, শুধু তাদের কোচকে শেষবারের মতো স্টেডিয়ামে প্রবেশ করতে দেখার জন্য।

গার্দিওলার অধীনে ম্যানচেস্টার সিটি ছয়বার প্রিমিয়ার লিগ, একটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, তিনটি এফএ কাপ এবং পাঁচটি কারাবাও কাপ জিতেছে। এর আগে সিটি কখনও এমন সাফল্যের দেখা পায়নি। স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের অধীনে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এবং সত্তরের ও আশির দশকে বব পেইসলির লিভারপুল ছাড়া খুব কম দলই এমন সাফল্য পেয়েছে।

ম্যাচ শুরুর আগে পূর্ব গ্যালারিতে একটি বিশাল ব্যানার ওড়ানো হয়, যেখানে লেখা ছিল ‘পেপের সঙ্গে ১০ বছর - গেম চেঞ্জার, হিস্ট্রি মেকার, সিটি ফরএভার’।

অ্যাস্টন ভিলার কোচ উনাই এমেরি ম্যাচের আগে গার্দিওলাকে ফুটবলের ‘একমাত্র প্রতিভা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং তাকে একটি স্মারক উপহার দেন। আতোয়ান সেমেনিও যখন প্রথম গোলটি করেন, তখন গার্দিওলা তার আসনেই বসে ছিলেন।

ইতিহাদ স্টেডিয়ামের উত্তর দিকের গ্যালারিটি সম্প্রসারণ করে তার সম্মানে ‘পেপ গার্দিওলা স্ট্যান্ড’ নামকরণ করা হয়েছে। শুক্রবার গার্দিওলা জানিয়েছিলেন, স্টেডিয়ামে আজীবনের জন্য তার বাবার নাম যুক্ত থাকায় তিনি অত্যন্ত গর্বিত। কোচের দায়িত্বে ছেলের শেষ ম্যাচ দেখতে ৯৫ বছর বয়সী বাবা ভ্যালেন্টিও মাঠে উপস্থিত ছিলেন।

মাঠে বিদায়ী বক্তব্য দেওয়ার সময় গার্দিওলার কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। সমর্থকরা শেষবারের মতো তার নামে স্লোগান দেন। তিনি পুরো মাঠ একবার ঘুরে টানেল দিয়ে বেরিয়ে যান।

গার্দিওলা বলেন, ‘অনেক স্মৃতি রয়েছে। শিরোপার কথা ভুলে যান, স্মৃতিগুলোই আসল। এখানকার সবাই অসাধারণ।’

তিনি আরও বলেন, ‘জীবন বিভিন্ন অধ্যায়ের সমষ্টি, আমরা একটি অসাধারণ সময় পার করেছি। যদি আমার শক্তি থাকত তবে আমি এখানেই থেকে যেতাম। নতুন কাউকে এখন এই দায়িত্ব নিতে হবে। আমাদের সময়টা ভালো ছিল। সবাইকে ধন্যবাদ, নতুন স্ট্যান্ডটি অনেক সুন্দর।’

ওলি ওয়াটকিন্সের জোড়া গোলে সিটিকে হারিয়ে লিগে চতুর্থ স্থান নিশ্চিত করেছে এমেরির দল। এমেরি বলেন, ‘পেপ গার্দিওলার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা আমার জন্য বিশাল সম্মানের। তিনি সেরা। আমি বিশেষ করে স্পেনে তার বিপক্ষে অনেক সময় ধরে প্রতিযোগিতা করে নিজের ক্যারিয়ার গড়েছি। তিনি বিশ্বের সেরা কোচ।’

সিটির কোচ হিসেবে ৫৯৩টি ম্যাচের মধ্যে ৪১৬টিতে জয় পেয়েছেন গার্দিওলা, যেখানে তার জয়ের হার ৭০ দশমিক ২ শতাংশ। ইংল্যান্ডের শীর্ষ লিগে কেবল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ফার্গুসন তার চেয়ে বেশি শিরোপা জিতেছেন।

গার্দিওলার প্রতি ম্যাচে ২ দশমিক ২৮ পয়েন্ট অর্জনের রেকর্ড ইংল্যান্ডে ২০ বা তার বেশি ম্যাচ পরিচালনা করা যেকোনো কোচের চেয়ে বেশি। প্রিমিয়ার লিগের এক মৌসুমে ১০০ পয়েন্ট পাওয়া একমাত্র দল হিসেবে রেকর্ড ধরে রেখেছে সিটি।

সাউথ স্ট্যান্ড থেকে সমর্থকরা গার্দিওলার নামে স্লোগান দিচ্ছিলেন। কারণ তারা জানেন, বিদায়ের পর তিনি ক্লাবের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

এদিকে গার্দিওলার উত্তরসূরি হিসেবে এনজো মারেসকার সঙ্গে ক্লাবের আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে। মারেসকা প্রসঙ্গে বিবিসির রেডিও ফাইভ লাইভে সাবেক স্ট্রাইকার ক্রিস সাটন বলেন, ‘ম্যানচেস্টার সিটির ভক্তদের এনজো মারেসকার বিষয়ে ধৈর্য ধরতে হবে। পেপ গার্দিওলার অভাব পূরণ করা এক অসম্ভব কাজ।’

সাটন আরও বলেন, ‘এই মৌসুমে তারা এফএ কাপ এবং লিগ কাপ জিতেছে, তবে এরপরও তারা কিছুটা হতাশ হবে। কারণ গার্দিওলার অধীনে তারা অনেক দূর এগিয়েছে।’

উত্তরসূরির প্রতি গার্দিওলার পরামর্শ কী? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘তাদের নিজেদের মতো হতে হবে। এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তারা যেভাবে যোগাযোগ করে, যেভাবে খেলে, তাদের নিজস্বতা বজায় রাখতে হবে। এই ক্লাবটি অনেক বিষয়ে ভালো এবং তারা খুব ভালোভাবে পরিবর্তন সামলাতে পারে। সবকিছু ভালো হবে।’

তবে শুধু গার্দিওলাই নন, এই গ্রীষ্মে ইতিহাদ থেকে আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বিদায় নিচ্ছেন। আগামী মাসে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অধিনায়ক সিলভা এবং ডিফেন্ডার জন স্টোনস ক্লাব ছাড়বেন। তাদের কোচ বাঁধাই করা জার্সি উপহার দেন।

সিলভা গার্দিওলার অধীনে রেকর্ড ৪৬০টি ম্যাচ খেলেছেন। দর্শকদের উদ্দেশে সিলভা বলেন, ‘সিটির প্রতি, আপনাদের প্রতি আমার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা সত্যিই কঠিন। আমি মনে করি না আমার জীবনে আর কখনও এমন ভালোবাসা অনুভব করব। এটি চিরকাল আমার পরিবার হয়ে থাকবে এবং আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ।’

স্টোনস বলেন, ‘আপনাদের ভালোবাসার জন্য আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারছি না। এটি স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতো। আমার এবং আমার পরিবারের অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে আপনাদের অনেক ধন্যবাদ।’

সাবেক অধিনায়ক ইলকায় গুন্দোয়ান এবং গোলরক্ষক এদেরসনও ইতিহাদে ফিরে এসেছিলেন। তারা দুজনেই গত গ্রীষ্মে দলবদলের শেষ দিনে তুরস্কে পাড়ি জমিয়েছিলেন।

এছাড়া গার্দিওলার সহকারী ম্যানেল এস্টিয়ার্তে, ফিটনেস কোচ লরেঞ্জো বুয়েনাভেন্টুরা এবং দীর্ঘদিনের গোলরক্ষক কোচ জাভি মানচিসিডোরও ক্লাব ছাড়ছেন। এটি সত্যিই ইতিহাদে একটি যুগের অবসান, যে যুগটি গার্দিওলা, তার খেলোয়াড় এবং সিটির সমর্থকরা চিরকাল মনে রাখবেন।

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.