আপনি পড়ছেন

বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসার পর দেশের মানুষের মধ্যে বড় ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারকে ঘিরে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং প্রশাসনিক সংকটের পর মানুষ চেয়েছিল দ্রুত পরিবর্তনের আভাস।

বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিন: মানুষ কতটা সন্তুষ্ট?
বিএনপির লোগো

তবে ক্ষমতায় আসার প্রায় ১০০ দিন পর সরকার এখন এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ দৃশ্যমান হলেও অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা ও জনদুর্ভোগের বড় চ্যালেঞ্জগুলো এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।

ক্ষমতায় এসেই সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, সরকারি ব্যয়ে সংযম আনা এবং গ্রামীণ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা দেয়। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বিতরণ, বিভিন্ন ধর্মীয় নেতার জন্য ভাতা চালু এবং খাল খনন কর্মসূচির মতো উদ্যোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা ইতিবাচক বার্তা দেয়।

এ ছাড়া রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে বিএনপির সংসদ সদস্যদের করমুক্ত গাড়ি সুবিধা না নেওয়ার সিদ্ধান্তও আলোচনায় আসে। প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার কথাও সরকার জানিয়েছে।

সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকেই তিনটি বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়—নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। কিন্তু তিন মাস পরও এই তিন খাতেই মানুষের অসন্তোষ পুরোপুরি কমেনি।

বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনকে চাপে রেখেছে। মার্চে সামান্য কমার পর এপ্রিলেই আবার মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে উঠে যায়। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ব্যয় বেড়ে গেছে উল্লেখযোগ্যভাবে।

নতুন সরকার দায়িত্ব নেয় একটি নাজুক অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে। উচ্চ সরকারি ঋণ, দুর্বল ব্যাংকিং খাত, কম বিনিয়োগ এবং বৈদেশিক চাপ শুরু থেকেই সরকারের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

এর মধ্যে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও নতুন সংকট তৈরি করে। সরকার গঠনের কিছুদিন পরই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার অস্থির হয়ে পড়ে। ফলে আমদানি ব্যয় বেড়ে যায় এবং সরকারকে দ্রুত জ্বালানি সাশ্রয়মূলক পদক্ষেপ নিতে হয়।

অফিস, ব্যাংক ও বিপণিবিতানের সময়সূচি কমানো, এলএনজি ও জ্বালানি তেল আমদানির বিকল্প উৎস খোঁজার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিভিন্ন এলাকায় এখনো জ্বালানি সরবরাহে অনিয়ম ও সংকটের অভিযোগ রয়েছে।

বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে। খুন, চাঁদাবাজি, অপহরণ, মব অ্যাটাকসহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালালেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান সাফল্য এখনো সীমিত।

বিশ্লেষকদের মতে, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান মনে করেন, সরকারের ভেতরে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। তার ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রী ইতিবাচক পরিবর্তন চাইছেন, কিন্তু মন্ত্রীদের কর্মকাণ্ডে সেই সমন্বয় সবসময় দেখা যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, সামাজিক নিরাপত্তামূলক উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারের উচিত ছিল শুরুতেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া।

অর্থনীতি ও নিরাপত্তার পাশাপাশি সরকারকে স্বাস্থ্য খাতেও বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশজুড়ে শত শত শিশুর মৃত্যুর খবর পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে।

সরকার অবশ্য জরুরি ভিত্তিতে টিকা সংগ্রহ, টিকাদান কর্মসূচি জোরদার এবং স্বাস্থ্য প্রশাসনে পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া এই সংকট পুরোপুরি মোকাবিলা করা কঠিন হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামানের মতে, সরকার কিছু জনবান্ধব পদক্ষেপ নিলেও কাঠামোগত সংস্কারের গতি এখনো ধীর। প্রশাসনিক দুর্বলতা ও পুরোনো ব্যবস্থার প্রভাব অনেকখানিই রয়ে গেছে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, সরকারি চাকরিতে দলীয়করণ বা পক্ষপাতমূলক নিয়োগ সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ পদে যোগ্য ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।

সরকারের শীর্ষ নেতাদের দাবি, বর্তমানে যে সংকটগুলো সামনে এসেছে তার বেশিরভাগই আগের সরকারের সময়কার দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার ফল। তাদের মতে, মাত্র তিন মাসে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকার ১৮০ দিনের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে এবং সময় শেষে এর ফলাফল জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে।

তিনি আরও দাবি করেন, সরকারে কোনো সমন্বয়হীনতা নেই এবং মন্ত্রিসভা ও আন্তঃমন্ত্রণালয় পর্যায়ে নিয়মিত সমন্বয় হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনগণের উচ্চ প্রত্যাশাকে বাস্তব সাফল্যে রূপ দেওয়া। কারণ বিপুল জনসমর্থন ধরে রাখতে হলে অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও জনসেবায় দৃশ্যমান উন্নতি দেখানো ছাড়া বিকল্প নেই।

আগামী কয়েক মাসই ঠিক করে দেবে—এই সরকার জনসমর্থনকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতায় রূপ দিতে পারবে, নাকি প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান আরও বড় হবে।

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.