বিশ্ব অর্থনীতিতে ৭০০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতির শঙ্কা
- Details
- by আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতি ও বাণিজ্যে বড় ধরনের ধীরগতি দেখা দিতে পারে। সংঘাত শুরুর পর গত প্রায় ১০০ দিনে জ্বালানি তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও সারের সরবরাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের এই সশস্ত্র সংঘাত মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগাম হামলার জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে বন্ধ করে দেয়। এই অচলাবস্থার কারণে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া সার বাণিজ্যের ৩০ শতাংশ, ইউরিয়া সরবরাহের প্রায় ৪০ শতাংশ, সালফার সরবরাহের ৫০ শতাংশ এবং ফসফেট সরবরাহের ৩০ শতাংশ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিলে বিশ্বে প্রতিদিন জ্বালানি তেলের চাহিদা ছিল ১০ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল। তবে সরবরাহ ছিল ৯ কোটি ৫১ লাখ ব্যারেল। হরমুজ প্রণালী দিয়ে সরবরাহ বন্ধ থাকায় যুদ্ধপূর্ব অবস্থার তুলনায় উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারীদের দৈনিক লোকসান ১ কোটি ৪৪ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে।
বর্তমানে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম যুদ্ধপূর্ব অবস্থার চেয়ে ৩০ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে সরবরাহ সংকটের কারণে ইউরোপে গ্যাসের দাম ৫০ শতাংশ বেড়েছে। ওয়ার্ল্ড মেরিটাইম কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে জাহাজের জ্বালানি খরচ ৫৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশ্বব্যাপী জাহাজ চলাচল নেটওয়ার্কে বিঘ্ন এবং জ্বালানি খরচ বৃদ্ধির কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় ক্রমাগত চাপ বাড়ছে। প্রণালীতে জাহাজ আটকে থাকায় পরিবহন খরচ বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন দেশের আমদানি-রপ্তানি ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সরবরাহ সংকটের কারণে ব্যবহার কমে যাওয়া এবং কোম্পানিগুলোর উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির ফলে বিশ্ব অর্থনীতি ও বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ব্যাপকভাবে কমানো হয়েছে।
অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) বুধবার তাদের সর্বশেষ ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে জানায়, এই যুদ্ধ এবং এর স্থায়িত্ব বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি মূল্যায়নে নির্ধারক ভূমিকা পালন করবে। সংস্থাটি ‘স্বল্পমেয়াদি অচলাবস্থা’ এবং ‘দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা’ নামে দুটি পরিস্থিতির পূর্বাভাস দিয়েছে।
ওইসিডির ধারণা, যুদ্ধ যদি স্বল্পস্থায়ী হয়, তবে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালের ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬ সালে ২ দশমিক ৮ শতাংশে নামতে পারে। তবে ২০২৭ সালে তা বেড়ে ৩ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে। বর্তমানে বৈশ্বিক অর্থনীতির আকার প্রায় ১১৮ ট্রিলিয়ন ডলার। এই অবস্থায় প্রবৃদ্ধি শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ কমার অর্থ হলো বিশ্ব অর্থনীতির অন্তত ৭০০ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য ক্ষতি।
সংস্থাটির মতে, যুদ্ধ ও বাণিজ্য বাধা যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে চলতি বছর বিশ্ব অর্থনীতি দুর্বল হয়ে ২ দশমিক ১ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ১ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে আসতে পারে।
একই সময়ে ঋণমান নির্ণয়কারী সংস্থা ফিচ রেটিংস যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট তেল সংকটের কথা উল্লেখ করে ২০২৬ সালের জন্য তাদের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস শূন্য দশমিক ২ শতাংশ কমিয়ে ২ দশমিক ৪ শতাংশ করেছে।
তবে আশার কথা হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত প্রযুক্তি খাতে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি বিনিয়োগ হওয়ায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তেলের ধাক্কা কিছুটা সামলানো যাচ্ছে। এটি এশিয়ার দেশগুলোর রপ্তানি ও বিশ্ব বাণিজ্য প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করছে।
ফিচ জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে ১৪ সপ্তাহ ধরে বাণিজ্য বন্ধ রয়েছে এবং আগামী জুলাইয়ের আগে এটি পুনরায় চালুর কোনো সম্ভাবনা নেই। মজুত কমে যাওয়ায় আগামী দুই মাসে তেলের বাজার আরও অস্থিতিশীল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ স্বল্প মেয়াদে প্রণালী দিয়ে সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম।
এদিকে ওইসিডি ধারণা করছে, বিশ্ব বাণিজ্য প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালের ৫ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬ সালে ৩ দশমিক ১ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ২ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়াবে। উপসাগরীয় অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ব্যাপকভাবে কমে যাওয়া এবং জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির কারণে ২০২৬ সালের দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রান্তিকে সার্বিক বাণিজ্য প্রবৃদ্ধি কমার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধির পর চলতি বছর বিশ্ব বাণিজ্য কমে ১ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ২ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে। তবে এআই-সংশ্লিষ্ট পণ্যের শক্তিশালী চাহিদা জ্বালানি সংকটের কারণে সৃষ্ট এই ধীরগতি কিছুটা সামাল দিচ্ছে।
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থা (আঙ্কটাড) সতর্ক করে জানিয়েছে, বিশ্ব অর্থনীতি একটি অধিকতর নাজুক সময়ের দিকে এগোচ্ছে এবং ২০২৬ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে ২ দশমিক ৬ শতাংশ হবে।
তেল আমদানিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ আরও তীব্র হচ্ছে। আঙ্কটাডের তথ্যমতে, বর্তমান সংকটে ঝুঁকিপূর্ণ ৭৫টি দেশের মধ্যে ৬৫টি দেশই জ্বালানি তেল আমদানিকারক। এসব দেশে প্রায় ১০০ কোটি মানুষের বসবাস, যাদের ৩০ শতাংশেরও বেশি মানুষ দিনে ৩ ডলারের কম আয়ে জীবনযাপন করে।
বর্তমান আমদানি পরিস্থিতি বিবেচনায়, তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে জ্বালানি আমদানিনির্ভর এসব অর্থনীতির বার্ষিক ব্যয় আরও ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বাড়তে পারে।
ইস্তাম্বুল থেকে এমির ইলদিরিমের লেখায় প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন নুরান এরকুল কায়া।
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.