আপনি পড়ছেন

অনলাইন জুয়া, স্পোর্টস বেটিং, ভার্চ্যুয়াল ক্যাসিনো এবং ক্রিপ্টোকারেন্সিভিত্তিক আর্থিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন আনতে যাচ্ছে সরকার। তবে প্রস্তাবিত ‘বেটিং ও জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ এর কয়েকটি ধারা নিয়ে ইতোমধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকারকর্মী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।

পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি-গ্রেপ্তার, প্রশ্নের মুখে নতুন জুয়া আইন
প্রতীকী ছবি

বিশেষ করে আদালতের পরোয়ানা ছাড়াই কেবল ‘যুক্তিসংগত বিশ্বাস’ থেকে তল্লাশি, ডিজিটাল তথ্য জব্দ এবং গ্রেপ্তারের ক্ষমতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি এবং জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট তৈরির প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

খসড়া আইনের প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যদি মনে করেন যে জুয়াসংক্রান্ত অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তাহলে তিনি আদালতের অনুমতি ছাড়াই সংশ্লিষ্ট স্থানে প্রবেশ, তল্লাশি, আলামত জব্দ এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে পারবেন।

এই ক্ষমতা প্রয়োগের আওতায় থাকবেন পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট, সিআইডি, র‍্যাব, এনএসআই, ডিজিএফআই, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং সরকার মনোনীত অন্যান্য সংস্থার কর্মকর্তারা।

তদন্তের সময় মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, সিম কার্ড, ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট, ডিজিটাল ওয়ালেট, ক্রিপ্টো সম্পদ, সার্ভার এবং বিভিন্ন ডিজিটাল রেকর্ড জব্দ করার সুযোগও রাখা হয়েছে।

আইনের খসড়ায় সরকারকে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারেরও বিস্তৃত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) মনিটরিং, ডিপ প্যাকেট ইন্সপেকশন (ডিপিআই), রিস্ক স্কোরিং সিস্টেম এবং ট্রানজেকশন মনিটরিং প্রযুক্তি।

এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে সন্দেহজনক ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ, ডিজিটাল ওয়ালেট, আর্থিক লেনদেন এবং বিভিন্ন অনলাইন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা যাবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধ দমনে প্রযুক্তির ব্যবহার প্রয়োজনীয় হলেও যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি ছাড়া এটি ব্যক্তিগত গোপনীয়তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেনের মতে, নাগরিকদের ওপর নজরদারি চালানোর ক্ষমতা যদি রাষ্ট্রের হাতে দেওয়া হয়, তাহলে সেই ক্ষমতার ব্যবহার কে পর্যবেক্ষণ করবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

তার ভাষ্য, কোনো স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা ছাড়া কেবল সন্দেহ বা বিশ্বাসের ভিত্তিতে ডিজিটাল নজরদারির সুযোগ তৈরি হলে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও তথ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

এআই প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও তিনি মানবিক তদারকির ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, কেবল অ্যালগরিদমের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেওয়া আন্তর্জাতিকভাবেও প্রশ্নবিদ্ধ।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) মনে করছে, অনলাইন ও অফলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই প্রয়োজন। তবে সেই লক্ষ্য অর্জনের নামে নাগরিকের মৌলিক অধিকার সংকুচিত হওয়ার সুযোগ রাখা উচিত নয়।

সংস্থাটির মতে, জবাবদিহিহীন নজরদারি ব্যবস্থা ভবিষ্যতে ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে এবং একটি অতিনজরদারিনির্ভর রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে।

খসড়া আইনের অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো ‘জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট’। এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তির—জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, মোবাইল নম্বর, ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস অ্যাকাউন্ট, ডিজিটাল ওয়ালেট, ব্যবহৃত ডিভাইস, আইপি ঠিকানা এবং ওয়েবসাইট ও অ্যাপসংক্রান্ত তথ্য।

তবে একজন ব্যক্তিকে কীভাবে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে, কতদিন রাখা হবে কিংবা ভুলবশত অন্তর্ভুক্ত হলে কীভাবে নাম বাদ দেওয়া যাবে—এসব বিষয়ে খসড়ায় স্পষ্ট নির্দেশনা নেই।

প্রস্তাবিত আইনে জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে নিবন্ধিত সিম, মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব, ডিজিটাল ওয়ালেট এবং অন্যান্য আর্থিক তথ্য একত্রে যাচাই করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

এছাড়া বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশন এবং ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ থাকায় ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।

খসড়া অনুযায়ী, জুয়াসংক্রান্ত সব অপরাধকে আমলযোগ্য, অজামিনযোগ্য এবং আপস-অযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

ফলে অভিযোগ পাওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরাসরি তদন্ত শুরু করতে পারবে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির জন্য জামিন পাওয়ার সুযোগ সীমিত হতে পারে।

আইনে অপরাধের ধরন অনুযায়ী কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। অনলাইন জুয়ার জন্য সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড ও ৫ কোটি টাকা জরিমানা

আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ১০ কোটি টাকা জরিমানা
জুয়ার অর্থ ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে পাচার করলে সর্বোচ্চ ১২ বছরের কারাদণ্ড ও ১০ কোটি টাকা জরিমানা এটিই খসড়া আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি।

প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, নতুন আইনের কিছু ধারা সাইবার সুরক্ষা আইন এবং ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

তাদের আশঙ্কা, বিভিন্ন তদন্ত সংস্থাকে ডিজিটাল তথ্যের ওপর অতিরিক্ত প্রবেশাধিকার দিলে নাগরিকের গোপনীয়তা রক্ষার বিদ্যমান আইনি কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

মানবাধিকার সংগঠন ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল যুগে জুয়া ও অনলাইন বেটিং নিয়ন্ত্রণে আধুনিক আইন অবশ্যই প্রয়োজন। তবে সেই আইন যেন অপরাধ দমনের পাশাপাশি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তাও সমানভাবে রক্ষা করে।

এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, আইনটি এখনও খসড়া পর্যায়ে রয়েছে এবং বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নিয়ে প্রয়োজনীয় সংশোধনের পরই চূড়ান্ত করা হবে।

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.