সব গল্পেরই একটা শেষ পাতা থাকে। রূপকথারও। কিন্তু কিছু রূপকথা এত দীর্ঘ, এত মায়াবী আর এত বেশি অভ্যাস হয়ে যাওয়া যে, সেটার শেষ পাতাটা ওল্টাতেও আঙুল কাঁপে। বুকটার ভেতর কেমন যেন একটা শূন্যতা এসে ভর করে। আগামীকাল সকালে কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে যখন নীল-সাদা ঝড় উঠবে, তখন ফুটবলপ্রেমী মাত্রই বুকের বাঁ-পাশে একটা মৃদু মোচড় অনুভব করবেন। কারণ তারা জানেন, তারা যা দেখছেন তা কেবল একটা ফুটবল ম্যাচ নয়—তা আসলে একটা মহাকাব্যের শেষ অধ্যায়।

শেষ বাঁশির আগে, মেসির শেষ দেখার মুগ্ধতা
মেসির জাদুর শেষ দেখা..

লিওনেল মেসি খেলছেন তাঁর ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। দেখতে দেখতে বয়সটাও ৩৯ ছুঁইছুঁই। যখন মাঠে নামবেন, আন্তর্জাতিক ফুটবলে ২০০তম ম্যাচের সেই অবিশ্বাস্য মাইলফলকও ছোঁয়া হয়ে যাবে। কিন্তু এই সংখ্যাগুলো আসলে মেসির ক্ষেত্রে বড্ড অবান্তর, বড্ড শুষ্ক। মেসিকে কি আর কখনো সংখ্যার ফ্রেমে বাঁধা গেছে? আগের বিশ্বকাপগুলোর দিকে একটু ফিরে তাকালে দেখা যায়, প্রতিটি আসরে মেসির পাশে একটা অদৃশ্য শব্দ হেঁটে বেড়াত—'চাপ'। ডিয়েগো ম্যারাডোনার সেই ছায়া, ২০১৪-র সেই ট্রফির অপূর্ণতা, আর আর্জেন্টিনা সহ পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের প্রত্যাশার হিমালয় একা পিঠে বয়ে বেড়িয়েছেন এই জাদুকর। কাতার বিশ্বকাপে যখন সেই সোনার হরিণ ধরা দিল, মনে হয়েছিল গল্পটা ওখানেই শেষ। ওটাই তো ছিল নিখুঁত ক্লাইমেক্স।

কিন্তু বিধাতা হয়তো এই ফুটবল ঈশ্বরকে একটা ‘বোনাস’ দিতে চেয়েছিলেন। তাই এই বিশ্বকাপে মেসি এসেছেন একদম হালকা হয়ে, কোনো দেনা-পাওনার হিসাব ছাড়া। মেসি এখন খেলছেন কোনো ঋণের বোঝা ছাড়া, কেবল আনন্দের জন্য। এই যে চাপমুক্ত মেসি, এর চেয়ে সুন্দর আর কী হতে পারে? এখন আর তাঁকে ম্যারাডোনা হওয়ার প্রমাণ দিতে হয় না। তিনি নিজেই নিজের এক অনন্য উচ্চতা, যেখানে পৌঁছানোর সাধ্য আর কারও নেই।

তবে শুধু আবেগ দিয়ে তো আর বিশ্বকাপ জেতা যায় না। ফুটবল পণ্ডিতদের ড্রইংবোর্ডে যখন আর্জেন্টিনার ট্যাকটিক্স আর স্কোয়াড ডেপথের ব্যবচ্ছেদ চলে, তখন বোঝা যায় লা আলবিসেলেস্তেরা এবার কেবল একটি ‘ফেয়ারওয়েল ট্যুর’ করতে আসেনি; তারা এসেছে ট্রফিটা ধরে রাখতে। এবারের আর্জেন্টিনা দলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর ‘ট্যাকটিক্যাল রূপান্তর’। কাতার বিশ্বকাপের সেই মাঝমাঠের ক্লান্তি দূর করতে লিওনেল স্কালোনি এবার দলে এনেছেন একঝাঁক তরুণ রক্ত। এনজো ফার্নান্দেজ আর অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের অভিজ্ঞতার পাশে নিকো পাজ কিংবা থিয়াগো আলমাদাদের মতো তরুণদের অন্তর্ভুক্তি আর্জেন্টিনার মাঝমাঠকে দিয়েছে নতুন গতি ও সৃষ্টিশীলতা।

মেসি এখন আর ৯০ মিনিট জুড়ে দৌড়ান না; তাঁর সেই অতিমানবীয় ওয়ার্করেটের ঘাটতি পুষিয়ে দেওয়ার জন্য স্কালোনি এক 'রানিং মেশিন' মিডফিল্ড তৈরি করেছেন। আক্রমণভাগে জুলিয়ান আলভারেজের অক্লান্ত প্রেসিং আর বক্সে অভিজ্ঞ লাউতারো মার্টিনেজের ফিনিশিং প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আর পোস্টের নিচে সেই চেনা ‘ডিবু’ এমিলিয়ানো মার্টিনেজ তো আছেনই—যাঁর গ্লাভসে এখনো লেগে আছে অবিশ্বাস্য সব পেনাল্টি সেভের আত্মবিশ্বাস।

তাহলে এবার কতটুকু সম্ভাবনা ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের? ইউরোপীয় পরাশক্তি যেমন কিলিয়ান এমবাপের ফ্রান্স কিংবা একঝাঁক প্রতিভাধর তরুণের জার্মানি এবার আর্জেন্টিনার জন্য বড় বাধা হবে। বিশেষ করে নকআউট পর্বের হাই ভোল্টেজ ম্যাচে ৩৯ বছর বয়সী মেসির গতিহীনতা কখনো কখনো দলকে রক্ষণাত্মকভাবে কিছুটা ব্যাকফুটে ফেলতে পারে। তবে ফুটবল তো শুধু পা দিয়ে খেলা হয় না, খেলা হয় মগজ আর মনস্তত্ত্ব দিয়েও। স্কালোনির এই দলটি গত কয়েক বছরে হারতে ভুলে গেছে। কোপা আমেরিকা আর বিশ্বকাপের ব্যাক-টু-ব্যাক ট্রফি জয় এই দলটার ডিএনএ-তে এক অপরাজেয় মানসিকতা (Elite Winning Mentality) ঢুকিয়ে দিয়েছে। কাগজে-কলমে ফেভারিট হয়তো অনেকেই, কিন্তু টুর্নামেন্টের গভীরতায় 'লাস্ট ড্যান্স' দিতে থাকা মেসির দলের চেয়ে বিপজ্জনক আর কেউ নেই।

আমেরিকার মানুষ হয়তো ফুটবলটাকে ঠিক ওভাবে বোঝে না, যেভাবে বোঝে বুয়েনস আইরেস বা এশিয়ার মেগা সিটিগুলোর কোটি কোটি ভক্তরা। তবে এটা অনস্বীকার্য, মেসি এমএলএস-এ আসার পর থেকে এই মহাদেশের ফুটবল-সংস্কৃতিই বদলে গেছে। এই বিশ্বকাপটা যেন মেসির তরফ থেকে উত্তর আমেরিকার জন্য একটা বিদায়ী উপহার। তিনি মাঠে নামছেন, আলতো ছোঁয়ায় বল ড্রিবল করছেন, আর গ্যালারিতে বসে থাকা হাজারো মানুষ ভাবছে—‘আহা, আর কদিন!’ খেলা শেষে হয়তো আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে আরও অনেকে আসবেন, ১০ নম্বর জার্সির নতুন কোনো মালিক হবে। কিন্তু ওই যে ড্রপ পকেটে বল রিসিভ করে, চিতার গতিতে চারজন ডিফেন্ডারকে বোকা বানিয়ে দূরপাল্লার কোণাকুণি শটে জাল কাঁপানো—সেই জাদুকরি দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য আর হবে না।

রেফারির শেষ বাঁশি বাজতে এখনো কিছুদিন বাকি। ট্রফি এবার আর্জেন্টিনার ঘরে থাকবে কি থাকবে না, সেই তর্ক তোলা থাক পরিসংখ্যানবিদদের জন্য। আমরা বরং চোখ ভরে দেখে নিই। এই ফুটবল-দেবতার শেষ কটি নাচ দেখে হাততালি দিই। এমন সৌভাগ্য তো মানুষের জীবনে একবারই আসে!

— ডা. আবু হেনা মোস্তফা বেলাল, ক্রীড়া অনুরাগী ও লেখক।

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.