আপনি পড়ছেন

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান কয়েক মাসের যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) একমত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। দেশ দুটির প্রকাশিত সমঝোতা স্মারকের নথিতে শব্দের ভিন্নতা থাকলেও মূল বিষয়গুলোতে ব্যাপক ঐকমত্য দেখা গেছে। লেবানন ইস্যু, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, হরমুজ প্রণালী এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো সমাধানে এই চুক্তিতে একটি অভিন্ন রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে।

মতপার্থক্য থাকলেও যুদ্ধ বন্ধে অভিন্ন রোডম্যাপে একমত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা

গত বৃহস্পতিবার সকালে তেহরান জানায়, দুই দেশের প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের পর চুক্তিটি সম্পূর্ণরূপে কার্যকর হয়েছে। এরপরই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই সমঝোতা স্মারক নতুন করে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করে। ইরানের আধা-সরকারি মেহের নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন যে মার্কিন নৌ অবরোধ শিথিলের মতো চুক্তির বেশ কিছু ধারা ইতিমধ্যে বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।

গত বুধবার ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনা ১৪ দফার এই সমঝোতা স্মারকের ইরানি সংস্করণ প্রকাশ করে। অন্যদিকে, নিরাপত্তা, সামুদ্রিক নৌ চলাচল, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, পারমাণবিক ইস্যু এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্রধান বিধানগুলোর রূপরেখা দিয়ে মার্কিন কর্মকর্তারা তাদের নিজস্ব খসড়া পাঠ্য প্রকাশ করেন।

শব্দচয়নে পার্থক্য থাকলেও উভয় সংস্করণেই মূলত একই ধরনের কূটনৈতিক রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। উভয় নথির ১ নম্বর ধারায় লেবাননসহ সব ফ্রন্টে তাৎক্ষণিক ও স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্ররা ভবিষ্যতে হুমকি বা শক্তি প্রয়োগ থেকে বিরত থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

উভয় নথিতেই সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়া পারস্পরিক সম্মতিতে আলোচনার মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ রেখে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছে।

প্রস্তাবিত চুক্তির প্রধান উপাদানগুলোর ক্ষেত্রেও উভয় পাঠ্য একমত পোষণ করে। এর মধ্যে রয়েছে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, হরমুজ প্রণালী দিয়ে সামুদ্রিক যান চলাচল পুনরায় শুরু করা, ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল, জব্দ করা ইরানি সম্পদ ছাড়করণ এবং সমঝোতা স্মারকসহ ভবিষ্যতের যেকোনো চুক্তির বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণে একটি ব্যবস্থা গঠন করা। চূড়ান্ত চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে বলেও উভয় নথিতে উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে ইরানের জন্য ৩০ হাজার কোটি ডলারের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্যাকেজের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

উভয় সংস্করণেই লেবাননের কথা উল্লেখ থাকলেও সেখানে ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। মার্কিন নথিতে বলা হয়েছে, লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধ হবে এবং পক্ষগুলো ভবিষ্যতে হুমকি বা শক্তি প্রয়োগ থেকে বিরত থাকবে। তবে ইরানি সংস্করণ আরও এক ধাপ এগিয়ে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে পক্ষগুলো লেবাননের আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের নিশ্চয়তা দেবে এবং চূড়ান্ত চুক্তিতে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধের স্থায়ী অবসানের বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে। এই শব্দচয়নের মাধ্যমে ইরানি নথিতে লেবাননকে কেবল যুদ্ধবিরতির একটি ফ্রন্ট হিসেবে উপস্থাপন না করে, বরং আরও বেশি কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক ভূমিকা দেওয়া হয়েছে।

উভয় সংস্করণের ৭ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক নিষেধাজ্ঞাসহ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবনা ও আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) বোর্ড অব গভর্নরসের নির্দেশিত পদক্ষেপগুলো অবসানে কাজ করবে। তবে ইরানি সংস্করণে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। একে আলোচনার একটি মৌলিক অংশ হিসেবে বর্ণনা করে চূড়ান্ত চুক্তিতে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে একটি সময়সূচির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

উভয় নথিতে বলা হয়েছে, ইরানের অপরিশোধিত তেল, পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য এবং ব্যাংকিং, বিমা ও পরিবহনসহ সংশ্লিষ্ট পরিষেবাগুলোর রপ্তানির অনুমতি দিতে ওয়াশিংটন ছাড়পত্র জারি করবে। জব্দ করা ইরানি সম্পদের বিষয়ে মার্কিন নথিতে বলা হয়েছে, আলোচনার মাধ্যমে প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হবে। অন্যদিকে, ইরানি নথিতে আরও বিশদ বিবরণ দিয়ে জোর দেওয়া হয়েছে যে তহবিলগুলো অবশ্যই সম্পূর্ণ ব্যবহারযোগ্য থাকতে হবে এবং ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মনোনীত সুবিধাভোগীদের কাছে তা পৌঁছাতে হবে।

নৌ চলাচল ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও উভয় সংস্করণে ব্যাপক মিল রয়েছে। উভয় নথিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তাৎক্ষণিকভাবে নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের কাজ শুরু করবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করবে। অন্যদিকে, ইরান উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের মধ্য দিয়ে বাণিজ্যিক যান চলাচলের সুবিধা দেবে। ইসমাইল বাঘাই জানান, অবরোধ শিথিলের বিষয়ে মার্কিন প্রতিশ্রুতি ইতিমধ্যে কার্যকর হতে শুরু করেছে এবং ইরানি জাহাজগুলো কোনো সমস্যা ছাড়াই বন্দরে প্রবেশ ও প্রস্থান করছে।

তবে ইরানি সংস্করণে যুক্ত করা হয়েছে যে এই নৌ চলাচল ৬০ দিনের জন্য সম্পূর্ণ বিনা খরচে থাকবে এবং হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ প্রশাসন নিয়ে ওমান ও উপসাগরীয় অন্যান্য দেশের সঙ্গে আলোচনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ৮ নম্বর ধারায় থাকা পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে উভয় নথিতে বলা হয়েছে, ইরান পুনরায় নিশ্চিত করবে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন বা সংগ্রহ করবে না এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ও সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা করা হবে।

ইরানের পারমাণবিক চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি কাঠামোর মধ্যে আলোচনা এবং আইএইএ-এর তত্ত্বাবধানে সাইটে তরলীকরণের উল্লেখসহ ইরানি সংস্করণে আরও কিছু প্রযুক্তিগত বিশদ বিবরণ রয়েছে। ইসমাইল বাঘাই জোর দিয়ে জানান, আলোচনা কেবল পারমাণবিক ইস্যু এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

চুক্তির ধারাবাহিকতা নিয়েও উভয় পক্ষের মধ্যে বড় ধরনের মিল রয়েছে। উভয় নথিতে বলা হয়েছে, চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনা এগিয়ে যাওয়ার আগেই যুদ্ধবিরতি, নৌ ব্যবস্থা, তেল রপ্তানি এবং জব্দ করা সম্পদের মতো মূল ধারাগুলোর বাস্তবায়ন শুরু হবে।

গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নৃশংস হামলায় ৩ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হওয়ার পর কয়েক মাস ধরে চলা আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই সমঝোতা স্মারক সই হলো। সেই সংঘাত পরবর্তীতে ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের হামলা পর্যন্ত গড়ায়। এর পাশাপাশি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনের রুট হরমুজ প্রণালী দিয়ে সামুদ্রিক নৌ চলাচলেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংস্করণের এই মিলগুলো থেকে বোঝা যায়, উভয় পক্ষই এখন সামুদ্রিক নিরাপত্তা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, পারমাণবিক ইস্যু এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা হ্রাসের মতো বিষয়গুলোতে একটি অভিন্ন কাঠামোর আওতায় কাজ করছে।

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.