আপনি পড়ছেন

যুদ্ধপরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা থাকলেও বর্তমানে তা চরম আকার ধারণ করেছে। এক দশকে দেশটি সপ্তম প্রধানমন্ত্রীর দেখা পেতে যাচ্ছে, যেখানে অতীতে মার্গারেট থ্যাচার ও টনি ব্লেয়ারের মতো নেতারা এক দশক ক্ষমতায় ছিলেন। ব্রেক্সিট, দুর্বল নেতৃত্ব, ভোটারদের পরিবর্তনশীল আচরণ এবং এমপিদের সঙ্গে দূরত্বের কারণেই মূলত ব্রিটিশ রাজনীতিতে এই অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে।

যে কারণে বারবার পতন হচ্ছে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীদের
যুক্তরাজ্যের সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার

একসময় ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীরা দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার জন্য পরিচিত ছিলেন। ডাউনিং স্ট্রিটে একবার পৌঁছালে তারা মেয়াদ পূর্ণ করবেন বলেই ধরে নেওয়া হতো। দুটি প্রধান দলের আধিপত্য, সুশৃঙ্খল সংসদীয় ব্লক এবং এমন একটি নির্বাচনী ব্যবস্থা যা ভোটকে কমন্সে সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পরিণত করত—এসব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীরা একটি স্থিতিশীল ভিত্তি পেতেন। মার্গারেট থ্যাচার এবং টনি ব্লেয়ার দুজনেই প্রায় এক দশক ক্ষমতায় ছিলেন, যা এখন অকল্পনীয় মনে হয়। কিন্তু বর্তমানে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীরা দ্রুত আসছেন এবং বিদায় নিচ্ছেন। তেরেসা মে এবং বরিস জনসন প্রত্যেকে তিন বছরের সামান্য বেশি সময় টিকেছিলেন। লিজ ট্রাস মাত্র ৪৯ দিন ক্ষমতায় ছিলেন। ২০২৪ সালে লেবার পার্টির বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ডাউনিং স্ট্রিটে প্রবেশ করা কিয়ার স্টারমারও ব্যতিক্রম হতে পারেননি। মাত্র দুই বছর পর তিনিও বিদায় নিচ্ছেন। ব্রিটেনের এই বিখ্যাত স্থিতিশীলতা কেন এত দ্রুত রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলায় রূপ নিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এর পেছনে বেশ কয়েকটি স্পষ্ট কারণ থাকলেও কোনোটিই এককভাবে দায়ী নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও তীব্র করেছে, তবে ইন্টারনেট শুধু ব্রিটেনেই নেই। ব্রেক্সিট কি দেশ পরিচালনা কঠিন করে তুলেছে? এর উত্তর হলো, হ্যাঁ। এটি দলের ভেতরে বিভাজন তৈরি করেছে, রাজনৈতিক পরিচয়কে আরও গভীর করেছে এবং প্রধানমন্ত্রীদের শুধু নীতিগত বিবাদ নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ধারণারও মোকাবিলা করতে বাধ্য করেছে। তবে শিক্ষাবিদরা মনে করেন, ব্রেক্সিট হঠাৎ করেই ব্রিটেনের এই অস্থিতিশীলতা তৈরি করেনি। বরং এটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরে আগে থেকেই তৈরি হওয়া চাপকে ত্বরান্বিত করেছে।

ব্রিটেনের এই অবস্থার জন্য দুর্বল নেতৃত্বও একটি বড় কারণ। সাম্প্রতিক কয়েকজন প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রে মূল সমস্যা ছিল দক্ষতার অভাব। তেরেসা মে তার ব্রেক্সিট চুক্তি সংসদে পাস করাতে পারেননি, আর লিজ ট্রাসের চরম অর্থনৈতিক পরীক্ষা শুরু হতেই মুখ থুবড়ে পড়ে। অন্যদের ক্ষেত্রে সমস্যা ছিল বিচারবোধ ও নৈতিকতার। বরিস জনসন দেশবাসীকে নিয়ম মানতে বলে নিজেই তা ভেঙেছেন এবং পরে তা অস্বীকার করে নিজের আরও ক্ষতি করেছেন। কিয়ার স্টারমার নীতিগত সিদ্ধান্তহীনতার পাশাপাশি গুরুতর ভুল করেছেন, যার মধ্যে পিটার ম্যান্ডেলসনের নিয়োগ ছিল অন্যতম।

তবে শুধু দুর্বল নেতৃত্ব দিয়ে পুরো পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা যায় না। অতীতেও ব্রিটেনে অনেক ব্যর্থ রাজনীতিক ছিলেন। এর পেছনের গভীর সমস্যাটি হলো প্রধানমন্ত্রী এবং তাদের দলের এমপিদের মধ্যে পরিবর্তনশীল সম্পর্ক। যেকোনো প্রধানমন্ত্রীর তার কর্মসূচি পাস করাতে এবং বিপদে পড়লে রক্ষার জন্য সংসদীয় দলের সমর্থন প্রয়োজন। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে এই সম্পর্ক অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য ছিল। কিন্তু ১৯৭০-এর দশক থেকে এমপিরা নিজেদের দলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে, নেতাদের চ্যালেঞ্জ জানাতে এবং প্রয়োজনে তাদের ক্ষমতাচ্যুত করতে বেশি ইচ্ছুক হয়ে উঠেছেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জর্জ জোনসের বিখ্যাত উপমা ধার করে বলা যায়, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা একটি ইলাস্টিক ব্যান্ডের মতো, যা কেবল একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্তই টানা সম্ভব।

১৯৯০-এর দশক থেকে ব্রিটিশ রাজনীতির অনেক বড় ঘটনার পেছনে এমপি এবং প্রধানমন্ত্রীদের এই ফাটল ধরা সম্পর্ক দায়ী। ইরাক যুদ্ধ তার নিজের দলের ভেতরে টনি ব্লেয়ারের কর্তৃত্বকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। ২০০৩ সালে এত বেশি লেবার এমপি তার ইরাক নীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন যে, ব্লেয়ার এবং তার সহযোগীরা ভেবেছিলেন এর ফলে তার প্রধানমন্ত্রিত্ব হারাতে হতে পারে। বিদ্রোহটি ব্যর্থ হলেও যুদ্ধ এবং এর পরিণতি ব্লেয়ার ও তার অনেক এমপির মধ্যে স্থায়ী দূরত্ব তৈরি করে। নিজের দলের ইউরোপবিদ্বেষী বিদ্রোহী এমপিদের ক্রমাগত চাপের মুখে ডেভিড ক্যামেরন ব্রেক্সিট গণভোটের আয়োজন করেছিলেন। ভোটাররা যখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পক্ষে রায় দেন, তখন তিনি পদত্যাগ করেন। বরিস জনসনের পার্টিগেট কেলেঙ্কারির মিথ্যাচার তার জন্য মারাত্মক প্রমাণিত হয়, যখন তার নিজের এমপিরা তাকে সমর্থন দিতে অস্বীকৃতি জানান। কিয়ার স্টারমারের কল্যাণভাতা কর্তন এবং কঠোর অভিবাসন নীতি তার দলের এমপিদের আনুগত্য ও নীতির মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিতে বাধ্য করেছিল।

এই ফাটলের কারণে এমপিরা এখন তাদের নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বেশি আগ্রহী। সাধারণ নির্বাচনের আগেই প্রধানমন্ত্রীদের ক্ষমতাচ্যুত করা এখন ব্রিটেনের একটি আধুনিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে ডাউনিং স্ট্রিটে প্রবেশ করা এবং নির্বাচনে হেরে বিদায় নেওয়া সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এডওয়ার্ড হিথ, যা ঘটেছিল ১৯৭৪ সালে। এরপর থেকে নেতারা ভোটারদের ব্যালটের মাধ্যমে বিদায় নেওয়ার চেয়ে দলের অভ্যন্তরীণ চাপ, কেলেঙ্কারি, পদত্যাগ বা উত্তরাধিকারের কারণেই বেশি ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন। এই প্রবণতা এখন ত্বরান্বিত হচ্ছে। সর্বশেষ পাঁচজন প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে চারজনই নিজেদের দলের অভ্যন্তরীণ চাপের কারণে বিদায় নিয়েছেন। কেবল ঋষি সুনাক সাধারণ নির্বাচনে ভোটারদের দ্বারা ক্ষমতাচ্যুত হন।

এই বিশৃঙ্খলার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো ভোটারদের পরিবর্তনশীল আচরণ। ব্রিটেন এখন আর শক্তিশালী দ্বিদলীয় ব্যবস্থার মধ্যে নেই। ইংল্যান্ডে ভোটাররা এখন লেবার বা কনজারভেটিভ দলের ওপর আগের মতো আস্থা না রেখে বিভিন্ন দলের মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ছেন। স্কটল্যান্ডে স্বাধীনতার বিতর্ক এখনও রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রিত করছে। উত্তর আয়ারল্যান্ডে নির্বাচন একটি ভিন্ন দলীয় ব্যবস্থা অনুসরণ করে, যা ইউনিয়নিজম, জাতীয়তাবাদ এবং ক্রমবর্ধমান মধ্যপন্থী অবস্থান দ্বারা প্রভাবিত। ওয়েলসে লেবার পার্টি এখন প্লেইড সিমরু এবং রিফর্ম দলের কাছ থেকে শক্তিশালী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।

নতুন এই ভোটের মেরুকরণ প্রধানমন্ত্রী এবং এমপি উভয়ের জন্যই টিকে থাকা কঠিন করে তুলেছে। নেতাদের জন্য এখন জেতা মানে শুধু লেবার বা কনজারভেটিভ ভোটারদের ধরে রাখা নয়। এর মানে হলো কোন ভোটারদের টানতে হবে, কোন প্রতিশ্রুতি শিথিল করতে হবে এবং দলের জোটের কোন অংশগুলোকে ঝুঁকিতে ফেলা যাবে, তা নির্ধারণ করা। কিয়ার স্টারমারের ঘনিষ্ঠরা বিশ্বাস করতেন যে, কঠোর অভিবাসন নীতি রিফর্ম দলের দিকে ঝুঁকে পড়া ভোটারদের ধরে রাখতে বা ফিরিয়ে আনতে পারবে। কিন্তু এই নীতিগুলো লেবার এমপিদের ক্ষুব্ধ করে এবং দলের বামপন্থিদের জন্য আরও জায়গা তৈরি করে দেয়, যেখানে গ্রিন পার্টি আগে থেকেই প্রমাণ করছিল যে তারা লেবার দলের ভোট ও আসন কেড়ে নিতে পারে।

বিভক্ত ভোটের ধরন বর্তমান এমপিদেরও আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। যখন ভোটারদের আনুগত্য কমে যায় এবং পুরনো দলীয় বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন দলের নেতা অজনপ্রিয়, বেপরোয়া বা কেলেঙ্কারিতে জড়ালে এমপিদের আতঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ থাকে। পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে ভোটারদের রায়ের জন্য অপেক্ষা করার বদলে তারা আগেই পদক্ষেপ নিতে উৎসাহী হন। এটি নেতাদের অপসারণ আরও সহজ করে তোলে এবং প্রধানমন্ত্রীদের দ্রুত পরিবর্তন ঘটায়।

দুর্বল নেতা, অস্থির এমপি এবং বিভক্ত ভোটের ধরন—সব মিলিয়ে একটি চক্র তৈরি করেছে। প্রতিটি ব্যর্থ প্রধানমন্ত্রিত্ব পরবর্তীটিকে আরও কঠিন করে তোলে। একজন নতুন প্রধানমন্ত্রী এসে সবকিছু নতুন করে শুরুর প্রতিশ্রুতি দেন, কিন্তু তিনি আগের সেই গভীর সমস্যা, উদ্বিগ্ন এমপি এবং জনগণের আরও কম ধৈর্য উত্তরাধিকার সূত্রে পান। স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার বদলে প্রতিটি নেতৃত্ব পরিবর্তন পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করা আরও সহজ করে তোলে।

অ্যান্ডি বার্নহ্যাম এই চক্রেরই উত্তরাধিকারী হতে যাচ্ছেন। তিনি এই চক্র ভাঙতে পারবেন কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। ২০১৭ সাল থেকে সংসদে ফিরে আসার আগ পর্যন্ত গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করা বার্নহ্যাম তার সমর্থকদের কাছে কাজ আদায় করা এবং সহজ ভাষায় রাজনীতি বোঝানোর জন্য পরিচিত। মেকারফিল্ড উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে সংসদে ফেরা তার এই দাবির একটি প্রমাণ দেয়। সেখানে বিভক্ত রাজনীতির বৃহত্তর প্রবণতাকে পাশ কাটিয়ে লেবার পার্টি তাদের ভোট বাড়িয়েছে।

তবে এখনও অনেক কিছু জানার বাকি আছে। গ্রেটার ম্যানচেস্টারে বার্নহ্যাম যতটা সফল বলে তার সমর্থকরা দাবি করেন, তা নিয়ে সবাই একমত নন। পরিবহনের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ তাকে একটি শক্তিশালী গল্প বলার সুযোগ দিয়েছিল, কিন্তু জাতীয় সরকার তার সেই প্রতিশ্রুতিগুলোকে আরও কঠিনভাবে পরীক্ষা করবে। তিনি যদি লেবার পার্টির কঠোর অভিবাসন নীতি বজায় রাখেন, জননিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি যদি ভোটারদের প্রত্যাশার চেয়ে দুর্বল প্রমাণিত হয় বা তার জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করে, তবে দলের ভেতরের সদিচ্ছা দ্রুত উধাও হতে পারে। তখন বার্নহ্যামকেও তার পূর্বসূরিদের মতো একই বিপদের মুখোমুখি হতে হবে। এমপিরা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন যে, তাদের নেতা এমন এক ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছেন যা তারা নিতে পারবেন না। এটি তাকে আবারও সেই চক্রের ভেতরে ফেলে দেবে যা তার ভাঙার কথা ছিল।

আল জাজিরায় প্রকাশিত একটি নিবন্ধন অবলম্বনে

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.