বিড়ালের মতো নিভৃত ও শান্ত। কিন্তু গোলের দক্ষতায় ক্ষিপ্র ও দুর্দান্ত। নিখুঁত নিপুণতায় তিনি শিকারের কাজটি সেরে নেন। দেখতে সাধারণ মনে হলেও, ফিনিশিংয়ে অতিমানবীয় এবং নিখুঁত। ভিনিচিয়াস জুনিয়র। নিঃশব্দ শিকারের নিজস্ব শৈলী তাকে বর্তমান ফুটবল বিশ্বের সেরাদের একজন করে তুলেছে। সহজ বাংলায় বলা যায়, ভিনি এবারের বিশ্বকাপের এক মারাত্মক ফরোয়ার্ড।

ভিনিচিয়াস জুনিয়র: সুনিপুণ দক্ষতার নিঃশব্দ শিকারী
ভিনিচিয়াস জুনিয়র

শান্ত বালক ভিনিচিয়াস মাঠে এমনভাবে পজিশন নেন, যেন তিনি শান্ত আছেন। অথবা থেকেও নেই নেই অবস্থা আরকি। কিন্তু আকস্মিক গতি পরিবর্তন করে ফেলেন। অফ-দ্য-বল মুভমেন্টের (বল ছাড়া দৌড়ানো) মাধ্যমে প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের মনোযোগ এড়িয়ে সম্পূর্ণ আনমার্কড অবস্থায় গোল করার জায়গায় পৌঁছে যান। মুহূর্তের মধ্যেই ডিফেন্ডারদের চোখের পলকে গতি বাড়িয়ে প্রতিপক্ষের বক্সে ঢুকে পড়েন। এবং ডি-বক্সের ভেতর অত্যন্ত কম জায়গার মধ্যেও বলের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন। অসাধারণ ড্রিবলিং ও ঠান্ডা মাথার ফিনিশিংয়ে গোলরক্ষকের নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করে অত্যন্ত নিপুণ ও শান্তভাবে বলটাকে জালে জড়িয়ে দেন।

বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে ব্রাজিলের খেলা শেষ। তিন ম্যাচ শেষে অপরাজিত থেকে গ্রুপ সেরা হয়ে নকআউটে পৌঁছেছে ব্রাজিল। তিন ম্যাচেই গোল পেয়েছেন ভিনি। সি-গ্রুপে ব্রাজিলের সঙ্গী ছিল স্কটল্যান্ড, মরক্কো এবং হাইতি। এবার ব্রাজিল তাদের প্রথম ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল মরক্কোর। ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্র হয়েছিল। ম্যাচের ২১ মিনিটে ইসমাইল সাইবারির গোলে মরক্কো এগিয়ে যায়। পরবর্তীতে ৩২ মিনিটে ব্রাজিলের তারকা ফরোয়ার্ড ভিনিচিয়াস চমৎকার একটি গোল করে দলকে সমতায় ফিরিয়েছিলেন।

২০ জুন, ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়ার ফিলাডেলফিয়ার স্টেডিয়ামে দ্বিতীয় খেলায় হাইতিকে কোনো সুযোগ না দিয়ে ৩-০ ব্যবধানের সহজ জয় তুলে নেয় সেলেসাওরা। ম্যাথিউস কুনিয়ার জোড়া গোলের সঙ্গে গোল করেন ভিনিও। কুনিয়ার গোল দুটিতে বল জোগান দিয়েছিলেন ভিনিচিয়াস। গ্রুপ পর্বের তৃতীয় ম্যাচে নিজেদেরকে আরও বেশি মেলে ধরে ব্রাজিল। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটিতে জোড়া গোল করেন ভিনি। ভিএআর বাধা হয়ে না দাঁড়ালে হয়তো হ্যাটট্রিকের দেখা পেয়ে যেতেন আনচেলত্তির সুবোধ শিষ্যটি।

দেশের পক্ষে মাঠে নেমে ভিনি খুব যে সুবিধা করতে পেরেছিলেন, আসলে তা কিন্তু নয়; যতটা সফলতার দেখা পেয়েছিলেন ক্লাবে, রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে। বলা যায় জাতীয় দলে স্ট্রাগলই করছিলেন ভিনি। এই বিশ্বকাপের আগে ব্রাজিলের হয়ে ৪৭ ম্যাচ খেলে গোল করেছেন মাত্র ৭টি। অবশ্য রিয়াল মাদ্রিদেও একসময় বাজে পারফরম্যান্সের কারণে সবচেয়ে বেশি ট্রলের শিকার হতে হয়েছে ভিনিচিয়াসকে। ব্যঙ্গ করে তাঁকে বলা হতো ‘ভিনিপেলে’। সবাই ধরেই নিয়েছিল যে, রবিনহো, আদ্রিয়ানো, পাতোদের মতো এই ছেলেও হয়তো বিপুল সম্ভাবনা জাগিয়ে হারিয়ে যাবে। তারপর আনচেলত্তি আসলেন রিয়ালের কোচ হয়ে। বাকিটা ইতিহাস। আনচেলত্তির আন্ডারে ভিনি হয়ে উঠলেন বিশ্বসেরা উইঙ্গারদের একজন।

এটা বলা যায় যে, ব্রাজিলের জাতীয় দলের বারবার কোচ পরিবর্তন ভিনিচিয়াসের নিজেকে মেলে ধরার জন্য কিছুটা অসুবিধা করছিল। তিতে, দরিভাল জুনিয়র কিংবা কার্লো আনচেলত্তি আসার আগের অন্তর্বর্তীকালীন কোচদের অধীনে এবং নতুন কম্বিনেশনে নিজের সেরা ছন্দ পেতে সময় লেগেছিল ভিনিচিয়াসের। ২০২৫-এর মে মাসে রিয়াল মাদ্রিদের ইতালিয়ান কোচ কার্লো আনচেলত্তি ব্রাজিলের দায়িত্ব নেন। ব্রাজিলের জাতীয় দলে আনচেলত্তিই প্রথম বিদেশি কোচ, যিনি জাতীয় দলের মূল বা প্রধান কোচের দায়িত্ব পালন করছেন। এবং আনচেলত্তি আসার পর থেকেই ভিনি তাঁর রিয়াল মাদ্রিদ বসের অধীনে জাতীয় দলে নিজেকে স্বরূপে মেলে ধরতে শুরু করেন। নেইমারকে ছাড়াও ম্যাচ জেতাকে সহজ করে নিয়ে আসার অভ্যাস তৈরি করাটাই ব্রাজিলের এই বিদেশি কোচের অন্যতম সফলতা বলা যায়। আর এ কাজটি তিনি করছেন ভিনিদের ওপর আস্থা রেখেই।

এবারের বিশ্বকাপে তিন ম্যাচে ৪ গোল করা ভিনিচিয়াসের ওপরে আছেন একজনই—লিওনেল মেসি। এখন পর্যন্ত তিনি করেছেন ৫ গোল। আর সমান সমান গোল করে ভিনির সঙ্গে গোল্ডেন বুটের দাবির একই কাতারে আছেন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে ও নরওয়ের ইয়াং স্টার আর্লিং হালান্ড। যদিও বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের সব ম্যাচই বাকি। দেখা যাক, কে কতদূর যেতে পারে।

এখানে একটি মজার ব্যাপার উল্লেখ করা যায়। অতীত বলে, যখনই কোনো ব্রাজিলীয় খেলোয়াড় টুর্নামেন্টের গ্রুপ পর্বের প্রতিটি ম্যাচে গোল করেছেন, তখনই বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে সফল দেশটি শেষ পর্যন্ত শিরোপা জিতেছে। ১৯৭০-এ জারজিনিও গ্রুপ পর্বের প্রতিটি ম্যাচে গোল করেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন হয়। ১৯৯৪ সালে রোমারিও গ্রুপ পর্বের সব ম্যাচে গোল করে দলকে শিরোপা জেতাতে বড় ভূমিকা রাখেন। ২০০২ সালের বিশ্বকাপে রোনালদো ও রিভালদো—এই দুই কিংবদন্তি খেলোয়াড়ই গ্রুপ পর্বের প্রতিটি ম্যাচে গোল করেছিলেন এবং ব্রাজিল তাদের পঞ্চম শিরোপাটি সে বছর ঘরে তুলেছিল।

ব্রাজিল ইতোমধ্যে পাঁচটি বিশ্বকাপ জিতেছে। ২০০২ সালের পর থেকে তারা আছে হেক্সা মিশনে। ‘হেক্সা’ একটি গ্রিক শব্দ, যার অর্থ হলো ছয়। ফুটবল বিশ্বে, বিশেষ করে ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এটি অত্যন্ত সুপরিচিত একটি শব্দ, যা মূলত ব্রাজিল ফুটবল দলের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের অভিযানকে চিহ্নিত করে। যদিও এবারের ব্রাজিল দলটিকে ঘিরে ফুটবল বোদ্ধারা আশা করছেন কমই।

কয়েকটি সহজ প্রশ্নে শেষ করা যায়। নকআউট পর্বের ম্যাচেও কি ভিনি কি ধরে রাখতে পারবেন তার গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচের পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা? স্বভাবসুলভ নিঃশব্দ শিকারির দক্ষতায় বলকে বারংবার ঠেলে পাঠাতে পারবেন প্রতিপক্ষের জালে? আরও আরও গোল করে গোল্ডেন বুটের দাবিকে আরও পোক্ত করতে পারবেন? প্রথম বিদেশি কোচ ও তাঁর প্রিয় ক্লাবশিষ্য ভিনিদের হাত ধরেই ব্রাজিলও কি এবারই হেক্সা মিশনের চূড়ায় ওঠার গৌরব স্পর্শ করে ফেলতে পারবে? তাই দেখার অপেক্ষায় এখন ব্রাজিলের সমর্থক ও গোটা বিশ্বের ফুটবল দর্শকরা।

লেখক: মোজাব্বীর হাসান, সংবাদকর্মী।

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.