আপনি পড়ছেন

ক্ষমতায় আসার পর প্রথম বিদেশ সফরেই মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছয় দিনের এ সফরকে সরকার ‘অভূতপূর্ব সাফল্য’ হিসেবে মূল্যায়ন করলেও বিশ্লেষকদের মতে, সফরের সবচেয়ে বড় অর্জন তাৎক্ষণিক কোনো চুক্তি নয়; বরং বাংলাদেশকে ঘিরে নতুন কূটনৈতিক আস্থা, অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তি এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হওয়া।

মালয়েশিয়া ও চীন সফর: কী অর্জন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান?
তারেক রহমান

গত ২১ থেকে ২৬ জুন মালয়েশিয়া ও চীন সফর শেষে শনিবার জাতীয় সংসদে সফরের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাব গৃহীত হয়। আলোচনায় সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, চীনের সঙ্গে ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। পাশাপাশি বিনিয়োগ, বাণিজ্য, অবকাঠামো, রোহিঙ্গা সংকট, কৃষি, প্রযুক্তি ও কৌশলগত সহযোগিতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন অগ্রগতির ভিত্তি তৈরি হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদে বলেন, দেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষাই ছিল তাঁর সফরের মূল লক্ষ্য। তিনি বলেন, যদি কোনো অর্জন হয়ে থাকে, সেটি বাংলাদেশের অর্জন; দেশের মানুষের অর্জন।

সফরের প্রথম গন্তব্য ছিল মালয়েশিয়া। দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগ, অনিয়মিত কর্মীদের বৈধকরণ, আটক বাংলাদেশিদের দেশে ফেরানো এবং দ্রুত শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে শ্রমবাজার ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষা, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সেমিকন্ডাক্টর শিল্প এবং বৈশ্বিক হালাল শিল্পে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে একমত হওয়ার কথা জানানো হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম শিল্পোন্নত দেশ মালয়েশিয়ার সঙ্গে প্রযুক্তি ও শিল্প সহযোগিতা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।

মালয়েশিয়া সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে যান। বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়।

সফরে ১৩টি সমঝোতা স্মারক এবং চারটি অতিরিক্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পাশাপাশি দুই দেশের ভবিষ্যৎ সহযোগিতার রূপরেখা তুলে ধরে ১৬ দফার যৌথ ঘোষণাও প্রকাশ করা হয়।

চীন বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীনের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য অর্থনৈতিক করিডর গড়ে তোলার প্রস্তাব দেয়। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের উন্নয়ন, শিল্প বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং চীনের শিল্প স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশকে যুক্ত করার আগ্রহ প্রকাশ করে।

সফরের আগে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল তিস্তা মহাপরিকল্পনা।

যদিও এ বিষয়ে আলাদা কোনো চুক্তি হয়নি, তবে যৌথ ঘোষণায় চীন জানিয়েছে, তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে (টিআরসিএমআরপি) সহায়তা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা দ্রুত সম্পন্ন করতে দুই দেশের বিশেষজ্ঞরা যৌথভাবে কাজ করবেন।

এ কারণে বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের পথ অন্তত কূটনৈতিকভাবে আরও এগিয়ে গেল।

সফরের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে প্রথমবারের মতো পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা খাতে ‘টু প্লাস টু’ কৌশলগত সংলাপ চালুর সিদ্ধান্ত।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি দুই দেশের নিরাপত্তা ও কৌশলগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
চীনের সঙ্গে বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান নিয়েও আলোচনা হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশকে ব্রিকসে যোগদানের বিষয়ে সহায়তা এবং আসিয়ান সদস্যপদের ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার সমর্থনের আশ্বাস পাওয়া যায়।

চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমদের মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের সঙ্গে চীন ও মালয়েশিয়ার সর্বোচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হওয়াটাই বড় অর্জন।

তার ভাষ্য, এ সফরের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে—দুই দেশই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে আগ্রহী।

অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক মো. ফরিদ হোসেন মনে করেন, সফরে যেসব প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার এসেছে, সেগুলো বাস্তবায়নই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

তার মতে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাস্তবে কতটা উন্মুক্ত হয়, চীনের বিনিয়োগ কতটা বাড়ে, তিস্তা প্রকল্প কত দ্রুত এগোয় এবং অর্থনৈতিক করিডর কতটা বাস্তব রূপ পায়—এসবের ওপরই নির্ভর করবে সফরের প্রকৃত সফলতা।

কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সফরের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য তাৎক্ষণিক আর্থিক লাভ নয়; বরং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করা। শ্রমবাজার, অবকাঠামো, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা সংলাপ, তিস্তা প্রকল্প এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগ—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের জন্য একাধিক সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে।

তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তব অর্জনে রূপ দিতে হলে দ্রুত চুক্তিগুলোর বাস্তবায়ন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার ওপরই নির্ভর করবে সরকারের সাফল্য।

সব মিলিয়ে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরকে তাৎক্ষণিক চুক্তির চেয়ে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক, কৌশলগত ও কূটনৈতিক অংশীদারিত্বের ভিত্তি নির্মাণের সফর বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.