ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় ট্রাম্প-সৌদি যুবরাজের সম্পর্কে ফাটল
- Details
- by আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেই বদলে দেয়নি, দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সম্পর্কেও নতুন টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছে। একসময় নিরাপত্তা ও কৌশলগত সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা ওয়াশিংটন-রিয়াদ সম্পর্ক এখন পারস্পরিক আস্থার সংকটে পড়েছে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। খবর দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস।

যুদ্ধ চলাকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের একাধিক সিদ্ধান্ত এবং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ভিন্ন অবস্থান দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্যকে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন সামরিক মিশন নিয়ে বিরোধ, ইরান ইস্যুতে কৌশলগত ভিন্নতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য এখন দুই মিত্রের সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ইরান যুদ্ধের শুরুতে হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে একটি সামরিক মিশন শুরু করার উদ্যোগ নেয়। পরিকল্পনা ছিল, যুদ্ধবিরতির সময় মার্কিন নৌ ও বিমানবাহিনী ওই অঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং ইরানের সম্ভাব্য হামলা প্রতিহত করবে।
কিন্তু এই পরিকল্পনায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় সৌদি আরব। রিয়াদ স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, এই অভিযানের জন্য মার্কিন বাহিনী সৌদি আকাশসীমা ব্যবহার করতে পারবে না। সৌদি কর্মকর্তাদের অভিযোগ ছিল, এত বড় সামরিক উদ্যোগ নেওয়ার আগে ওয়াশিংটন তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের পরামর্শ করেনি। মার্কিন সামরিক মহলের জন্য এটি ছিল অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত।
সৌদি অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই। মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, অভিযানের প্রথম দিন থেকে টানা কয়েকদিন যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন ট্রাম্প।
পৃথকভাবে যোগাযোগ করেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারও।
তবে কোনো চাপেই নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি সৌদি যুবরাজ। তার আশঙ্কা ছিল, মার্কিন সামরিক উপস্থিতি আবারও যুদ্ধকে উসকে দিতে পারে এবং সৌদি আরব সরাসরি ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।
পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ কার্যত বন্ধ করতে বাধ্য হয় যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের এই অবস্থানের পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা।
২০১৯ সালে সৌদি তেল স্থাপনায় বড় ধরনের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। সেই ঘটনার পর থেকেই রিয়াদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। সাম্প্রতিক যুদ্ধ সেই সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ওয়াশিংটনের আরব উপসাগরীয় রাষ্ট্রসমূহ ইনস্টিটিউটের গবেষক হুসেইন ইবিশ বলেন, সৌদি নেতৃত্বের ধারণা ছিল, যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক সুবিধা দিলে ইরান তাদের ওপর আরও বড় হামলা চালাতে পারে। ফলে তারা ঝুঁকি নিতে চায়নি।
যুদ্ধের পুরো সময় জুড়েই ইরানকে মোকাবিলার কৌশল নিয়ে ওয়াশিংটন ও রিয়াদের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে সামরিক চাপ ও পারমাণবিক কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, সেখানে সৌদি আরবের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে—হরমুজ প্রণালীতে ইরানের প্রভাব, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তেহরানের সমর্থন। সৌদি নেতৃত্ব মনে করছে, এসব বিষয়ই তাদের নিরাপত্তার জন্য পারমাণবিক ইস্যুর চেয়েও বড় হুমকি।
যুদ্ধের পর সৌদি আরব নিজস্ব কূটনৈতিক পরিসরও বিস্তৃত করছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রিয়াদ এখন চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করছে।
২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় ইরান ও সৌদি আরবের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের পর দুই দেশের যোগাযোগ নিয়মিত বেড়েছে। বর্তমানে সৌদি কর্মকর্তারা সরাসরি ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করছেন।
এই পরিবর্তন মধ্যপ্রাচ্যে চীনের প্রভাব বৃদ্ধিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
যুদ্ধের সময় সৌদি যুবরাজ একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছেন, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতও এড়িয়ে চলেছেন।
মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে তিনি ট্রাম্পকে সংঘাতের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। পরে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে যুদ্ধ থামিয়ে সমঝোতার পথেও জোর দেন।
অন্যদিকে কাতার ও ওমান যেখানে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় ছিল, সেখানে সৌদি আরব কিছুটা কঠোর অবস্থান নিলেও পূর্ণাঙ্গ সংঘাত চায়নি।
দুই দেশের সম্পর্কে অস্বস্তির আরেকটি দিক সামনে আসে ট্রাম্পের প্রকাশ্য মন্তব্যে।
গত মার্চে এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে বলেন, সৌদি যুবরাজ মনে করেছিলেন তাকে আর তোষামোদ করতে হবে না।
কূটনৈতিক মহলে এই মন্তব্যও সম্পর্কের টানাপোড়েনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়। মতবিরোধ বাড়লেও দুই দেশের সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি।
দুই দেশ এখনও সৌদি আরবের বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। হরমুজ প্রণালির বিকল্প জ্বালানি ও বাণিজ্যপথ তৈরির বিষয়েও সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।
এছাড়া সৌদি আরব এখনও যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় অস্ত্র ক্রেতা এবং দুই দেশের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বহাল আছে।
বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে একটি দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার চেষ্টা করছে। একই সময়ে সৌদি আরব এমন একটি নিরাপত্তা কাঠামো চায়, যা ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল কিংবা ইরানের মধ্যে নতুন সংঘাত শুরু হলেও উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
তবে যুদ্ধের অভিজ্ঞতার পর রিয়াদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই—পরবর্তী কোনো আঞ্চলিক সংকটে যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই তাদের পাশে দাঁড়াবে?
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.