বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের একটা অদ্ভুত জাদু আছে। পুরোনো সব অতীত, ইতিহাস আর আবেগের কঙ্কালগুলোকে কেমন যেন এক ফুঁৎকারে জ্যান্ত করে তোলে! মেটলাইফ স্টেডিয়ামের বাতাসও এখন ঠিক তেমনই এক রোমাঞ্চ আর নস্টালজিয়ায় ভারী হয়ে আছে। ব্রাজিল বনাম নরওয়ে। ফুটবল রোমান্টিকদের মনে নিশ্চিতভাবেই ভেসে উঠছে ১৯৯৮ সালের মার্সেইর সেই রাত, যেখানে শেষ মুহূর্তের পেনাল্টিতে সেলেসাওদের ২-১ গোলে স্তব্ধ করে দিয়েছিল নরওয়েজিয়ানরা। কিন্তু আজ রোমাঞ্চের সুরটা একটু ভিন্ন। চেনা ইতিহাসের চেয়েও এখানে বেশি উত্তাপ ছড়াচ্ছে একেবারে আধুনিক, খাঁটি ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের এক চরম ব্যক্তিগত শত্রুতা।

ব্রাজিল বনাম নরওয়ে: স্রেফ ফুটবল ম্যাচ, নাকি এক চরম ব্যক্তিগত যুদ্ধ?
ব্রাজিল ও নরওয়ের ফুটবলার

সোজা কথায়—আর্সেনাল আর ম্যানচেস্টার সিটির সেই আগুনে লড়াই এবার রূপ নিচ্ছে বিশ্বযুদ্ধে!

বিশ্বফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে আজ মুখোমুখি নরওয়ের ‘অদম্য শক্তি’ আর্লিং হালান্দ আর ব্রাজিলের ‘দুর্ভেদ্য প্রাচীর’ গ্যাব্রিয়েল মাগালেস। ইংলিশ ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে এই দুজনকে আমরা বহুবার একে অপরের ওপর চড়াও হতে দেখেছি। সেই রেষারেষি, মাঠের ভেতর স্রেফ অপছন্দ থেকে জন্ম নেওয়া এক চরম অ্যানিমোসিটি এবার নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে নতুন মাত্রা পাচ্ছে। আজ যে হারবে, তাকে বিদায় নিতে হবে। আর যে জিতবে, কোয়ার্টার ফাইনালে তার জন্য অপেক্ষা করছে ইংল্যান্ড অথবা মেক্সিকো।

বল মাথায় মারার সেই গল্প:

এই দুই মল্লবীরের ভেতরের তপ্ত আগুনটা বুঝতে হলে একটু ফ্ল্যাশব্যাকে যেতে হবে। সময়টা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর। ইত্তিহাদে ম্যান সিটির জন স্টোন্সের শেষ মুহূর্তের সমতাসূচক গোলের পর, চরম হতাশায় জার্সি দিয়ে মুখ ঢেকে রাখা গ্যাব্রিয়েলের মাথায় পেছন থেকে সজোরে বল ছুঁড়ে মেরেছিলেন হালান্দ। আর্সেনাল ডিফেন্ডার সেই অপমান আজো ভোলেননি। ম্যাচ শেষে গানারদের ম্যানেজার মিকেল আর্তেতার মুখে মুখ লাগিয়ে হালান্দ দুবার আউড়েছিলেন সেই কুখ্যাত বাক্য—"স্টে হাম্বল, স্টে হাম্বল" (বিনয়ী হও)।

প্রতিশোধের আগুন কীভাবে জ্বলতে হয়, গ্যাব্রিয়েল তা দেখিয়েছিলেন ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে। সিটিকে ৫-১ গোলে চূর্ণ করার পর হালান্দের মুখের ওপর গিয়ে চিৎকার করেছিলেন এই ব্রাজিলিয়ান। দুই মাস পর ইত্তিহাদে তো হালান্দকে হেডবাটই করতে গিয়েছিলেন, অ্যান্থনি টেলরের দয়ায় সেবার লাল কার্ড থেকে বেঁচে যান। আর মে মাসে যখন দীর্ঘ ২৪ বছর পর আর্সেনাল প্রিমিয়ার লিগ জিতল, গ্যাব্রিয়েল ট্রফি উঁচিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক দিলেন ফ্লো রিডার সেই গান—যে গান গেয়ে কিছুদিন আগে হালান্দ তাঁকে খোঁচাতে চেয়েছিলেন।

সাবেক ইংলিশ স্ট্রাইকার ক্রিস সাটন বিবিসি-কে বলছিলেন, "লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপ্পে বা হ্যারি কেইনদের গোল্ডেন বুটের লড়াই আমরা দেখেছি। কিন্তু এমন তীব্র ব্যক্তিগত দ্বৈরথ বিশ্বকাপে ইদানীং দেখাই যায় না। কোনো ভুল নেই, তারা একে অপরকে একদমই সহ্য করতে পারে না। মাঠে আজ স্ফুলিঙ্গ উড়বেই।"

কিংবদন্তি অ্যালান শিয়ারও যেন জিভে জল এনে অপেক্ষা করছেন এই নাটকের জন্য, "তাদের মধ্যে এক ধরণের খাঁটি খুঁটখাঁটি আছে। কেউ কাউকে পছন্দ করে না, আর এটাই তো ম্যাচের আসল মশলা!"

এক অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যান আর আনচেলত্তির প্রাগম্যাটিজম:

ব্রাজিলিয়ানদের জন্য ম্যাচটা কিন্তু এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক জুজুও বটে। একটা অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যান শুনবেন? পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল আজ পর্যন্ত ফুটবল ইতিহাসে নরওয়েকে হারাতে পারেনি! চারবারের দেখায় দুবার ড্র, দুবার হার। ফুটবল মানচিত্রের একমাত্র এই দলটির বিপক্ষেই সেলেসাওদের জয়ের খাতা শূন্য।

তবে ব্রাজিলের ডাগআউটে এবার আছেন এমন একজন মানুষ, যাঁর মাথায় সবসময় বরফ জমে থাকে—কার্লো আনচেলত্তি। ২০০২ সালের পর ব্রাজিলের ঘরে হেক্সা (ষষ্ঠ বিশ্বকাপ) আনার দায়িত্বটা এই ইতালিয়ানের কাঁধে। ডন কার্লো স্বভাবসুলভ শান্ত মেজাজে সংবাদ সম্মেলনে উড়িয়ে দিয়েছেন হালান্দকে আটকানোর কোনো ‘বিশেষ পরিকল্পনা’র গুঞ্জন। তিনি ভরসা রাখছেন গ্যাব্রিয়েল আর মার্কুইনসের অভিজ্ঞ জুটির ওপরই। যদিও পরিসংখ্যান হালান্দের পক্ষে—গ্যাব্রিয়েলের বিপক্ষে ১১ ম্যাচে ৬ গোল করেছেন এই গোলমেশিন, আর এই বিশ্বকাপেও তাঁর নামের পাশে অলরেডি ৫ গোল।

কৌশল বনাম মুহূর্তের জাদুকর:

কাগজে-কলমে এই ম্যাচের ট্যাকটিক্যাল লড়াইটা বেশ চেনা। আনচেলত্তির এই ব্রাজিল কিন্তু সেই পুরোনো ধাঁচের সাম্বা ফুটবলের দল নয়, যারা প্রতিপক্ষকে টোটাল ফুটবলে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দেবে। বিশ্লেষকদের চোখ বলছে, এই ব্রাজিল অনেক বেশি বাস্তববাদী, সতর্ক ফুটবল খেলে। তারা নিজেদের ডিফেন্সিভ স্ট্রাকচার ঠিক রেখে অপেক্ষা করে রিয়াল মাদ্রিদ তারকা ভিনিসিউস জুনিয়র কিংবা তরুণ তুর্কি রায়ানের পায়ের জাদুর জন্য।

অন্যপক্ষে নরওয়ে খেলবে একটা সুশৃঙ্খল ‘লো ব্লক’ ডিফেন্স নিয়ে, যেখানে ট্রানজিশনে বল বাড়িয়ে দেওয়ার মূল কারিগর থাকবেন মার্টিন ওডেগার্ড। আর সামনে তো ওত পেতে আছেন হালান্দ নামের সেই গোল-ক্ষুধার্ত বাঘ।

গভীরতা, ইতিহাস আর শক্তিতে ব্রাজিলই ফেবারিট। কিন্তু আনচেলত্তির দল যদি গ্রুপ পর্বের মরক্কো ম্যাচের মতো রক্ষণভাগে সামান্যতম ঢিলেমি দেখায়, নরওয়ের কাছে কিন্তু শাস্তি দেওয়ার জন্য বিশ্বসেরা অস্ত্রটা মজুদ আছে। আজ মাঠের রেফারিকে ফুটবলীয় ট্যাকটিকসের চেয়েও বক্সের ভেতরের কুস্তিটা বেশি নজরে রাখতে হবে। হালান্দ যখন গ্যাব্রিয়েলের জার্সি টানবেন, আর গ্যাব্রিয়েল যখন হালান্দকে কনুইয়ের গুঁতো মারবেন—বিশ্বমঞ্চ তখন দেখবে প্রিমিয়ার লিগের সেই পুরোনো বারুদে কীভাবে নতুন করে আগুন লাগে!

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.