সার্বভৌমত্বহীন প্রশাসন ফিলিস্তিনকে স্বাধীন করতে পারবে না
- Details
- by আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রায় তিন বছর ধরে ইসরায়েল ও তার পশ্চিমা মিত্ররা দাবি করে আসছিল, ফিলিস্তিনে শান্তির পথে প্রধান বাধা গাজায় হামাসের শাসন। তবে এবার গাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ভেঙে দিয়ে বেসামরিক প্রশাসনের দায়িত্ব একটি টেকনোক্র্যাট বা পেশাজীবী কমিটির কাছে হস্তান্তরের ঘোষণা দিয়েছে হামাস। এর মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের প্রকৃত সার্বভৌমত্ব ছাড়া শুধু প্রশাসন পরিবর্তন গাজা সংকটের সমাধান করতে পারবে কি না, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট বোর্ড অব পিস কাঠামোর আওতায় প্রস্তাবিত ফিলিস্তিনি সংস্থা ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা’ বা এনসিএজির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে হামাস। এই ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। আলোচনা বেশ জটিল এবং অনেক বিষয় এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। তবে এই ঘোষণার ফলে বিতর্কের মোড় ঘুরে গেছে। গাজার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে হামাসের বেসামরিক শাসনই যদি মূল বাধা হয়ে থাকে, তবে হামাসবিহীন একটি ফিলিস্তিনি সংস্থার মাধ্যমে সেই দাবির সত্যতা প্রমাণিত হওয়া উচিত।
প্রস্তাবিত এই টেকনোক্র্যাট সরকার ইসরায়েল ও তার মিত্রদের বারবার তোলা অনেক আপত্তির সমাধান করবে বলে মনে করা হচ্ছে। এতে দলীয় রাজনীতিকদের বদলে ফিলিস্তিনি পেশাজীবীরা থাকবেন। প্রকৌশলী, অর্থনীতিবিদ, আইনজীবী ও প্রশাসকদের নিয়ে গঠিত এই কমিটি স্কুল, হাসপাতাল, সরকারি পরিষেবা এবং পুনর্গঠনের কাজ পরিচালনা করবে। এর সদস্যরা হামাসের কোনো কর্মকর্তা হবেন না এবং তারা কোনো দলীয় পরিচয়ে নির্বাচিতও হবেন না। বৃহত্তর রাজনৈতিক বিষয়গুলো অমীমাংসিত থাকলেও বেসামরিক জীবনযাত্রা পরিচালনা করাই হবে তাদের মূল কাজ।
তবে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই নতুন আপত্তি উঠতে শুরু করেছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা, তদারকি এবং চূড়ান্তভাবে কারা এই প্রশাসনের অনুমোদন দেবে—এসব প্রশ্নের পাশাপাশি এখন অস্ত্র সমর্পণের অমীমাংসিত বিষয়টিকে গ্রহণযোগ্যতার পরবর্তী পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই প্রশ্নগুলো রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু এগুলো আরও একটি মৌলিক বিষয়কে সামনে নিয়ে আসে। আর তা হলো, ফিলিস্তিনিরা যখনই কোনো রাজনৈতিক সমাধানের কাছাকাছি পৌঁছায়, তখনই তা গ্রহণযোগ্য হওয়ার আগে নতুন কোনো শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়।
এই পরিস্থিতি বেশ পরিচিত। ২০০৬ সালে ফিলিস্তিনিরা যখন গণতান্ত্রিক নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল, তখন হামাস পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করার পর সেই ফলাফল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে অগ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়। নির্বাচিত ফিলিস্তিনি নেতৃত্বকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার বদলে তাদের ওপর রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা, সহায়তা স্থগিত এবং ইসরায়েলি বিধিনিষেধ চাপিয়ে দেওয়া হয়। এরপর থেকে ফিলিস্তিনিদের বারবার বিকল্প নেতৃত্ব তৈরির জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে, কিন্তু প্রতিটি বিকল্পকেই প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক মানদণ্ডে যাচাই করা হয়েছে।
তাই এখন প্রশ্নটি হামাসের গণ্ডি পেরিয়ে আরও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফিলিস্তিনিদের প্রতিনিধিত্ব করার প্রকৃত অধিকার আসলে কার আছে? নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যদি অগ্রহণযোগ্য হন, আপস-মীমাংসা বা জাতীয় ঐক্য সরকারগুলোকে যদি হুমকি হিসেবে দেখা হয় এবং টেকনোক্র্যাট প্রশাসনগুলো যদি বিদেশি অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল থাকে, তবে ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক বৈধতা আসলে কোথা থেকে আসবে?
প্রতিটি জাতিই তাদের নিজস্ব রাজনীতি নিয়ে বিতর্ক করে। সরকার গঠিত হয় এবং পতন ঘটে। নির্বাচনে জয়-পরাজয় থাকে। রাজনৈতিক দলগুলোর জনসমর্থন বাড়ে ও কমে। ফিলিস্তিনিরাও এর ব্যতিক্রম নয়। অন্য যেকোনো জাতির মতো তারাও নেতৃত্ব, শাসনব্যবস্থা ও কৌশল নিয়ে দ্বিমত পোষণ করে।
তবে ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রে পার্থক্য হলো, এই বিতর্কগুলো খুব কম সময়ই তাদের নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। উল্টো ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈধতা বারবার বাইরের শক্তিগুলো দ্বারা নির্ধারিত হয়েছে। ফিলিস্তিনিদের এমন যেকোনো রাজনৈতিক উদ্যোগকে ধারাবাহিকভাবে বাধাগ্রস্ত করেছে একের পর এক ইসরায়েলি সরকার, যা তাদের জন্য অর্থবহ সার্বভৌমত্ব বয়ে আনতে পারত। ফিলিস্তিনি নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করা, অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করা বা গাজায় দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জোর দাবি—সব ক্ষেত্রেই ফিলিস্তিনিদের স্বশাসনকে সক্ষম করার বদলে সীমিত করার প্রবণতা দেখা গেছে।
এই বিষয়টি যে সহজ, এমন ভান করার কোনো সুযোগ নেই। হামাস এখনো একটি সশস্ত্র আন্দোলনকারী গোষ্ঠী হিসেবেই টিকে আছে। গাজায় ব্যাপক সামরিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার যৌক্তিকতা হিসেবে ইসরায়েল এখনো নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে যাচ্ছে। নেতৃত্ব ও শাসনব্যবস্থার প্রশ্নে ফিলিস্তিনিরাও নিজেদের মধ্যে বিভক্ত। হামাস বেসামরিক প্রশাসন থেকে সরে দাঁড়ানোর প্রস্তাব দিলেই এই বাস্তবতাগুলো মুছে যাবে না। কিন্তু গাজার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার কার—এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তরও এর মাধ্যমে পাওয়া যায় না।
এই প্রশ্নটি শুধু প্রতিনিধিত্বের নয়, এটি ক্ষমতারও বিষয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনার বড় অংশ জুড়েই ধরে নেওয়া হয় যে, গাজার শাসনভার কার হাতে থাকছে, তা পরিবর্তন হলে ইসরায়েলের আচরণেও মৌলিক পরিবর্তন আসবে। তবে সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা থেকে এমন আত্মবিশ্বাসের কোনো ভিত্তি পাওয়া যায় না। আলোচনা ও ঘোষিত যুদ্ধবিরতি চলাকালেও গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর বর্বরোচিত হামলা অব্যাহত ছিল এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরেও সহিংসতা বেড়েছে। ফিলিস্তিনিদের হত্যা করা হচ্ছে, তাদের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং বাস্তুচ্যুতি অব্যাহত রয়েছে। গাজার মানবিক বিপর্যয় কখনোই শুধু সেখানকার শাসনব্যবস্থার ওপর নির্ভর করেনি। ফিলিস্তিনিদের জীবনের ওপর ইসরায়েলের নিরঙ্কুশ সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণও এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী।
এটি কোনো তাত্ত্বিক উদ্বেগ নয়। ইসরায়েলি বাহিনী এখনো গাজার বড় একটি অংশ দখল করে আছে, সেখানে সামরিক অঞ্চল তৈরি করেছে এবং ঘোষিত যুদ্ধবিরতির পরও তারা বর্বরোচিত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। তাই ফিলিস্তিনিদের একটি টেকনোক্র্যাট প্রশাসন এমন একটি অঞ্চলে কাজ শুরু করবে, যেখানে ক্ষমতার সবচেয়ে নির্ধারক রূপগুলো ফিলিস্তিনিদের হাতের বাইরেই থেকে যাবে।
এমন পরিস্থিতিতে একটি টেকনোক্র্যাট প্রশাসন ত্রাণ বিতরণ, হাসপাতাল পুনর্নির্মাণ, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সচল করা এবং বেসামরিক বিষয়গুলো পরিচালনার দায়িত্ব পেলেও, যে শর্তগুলোর কারণে মানবিক সংকট তৈরি হচ্ছে, তার ওপর তাদের কোনোই কর্তৃত্ব থাকবে না। ইসরায়েল গাজার সীমান্ত, আকাশসীমা ও উপকূলের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারবে। মানুষ ও পণ্য চলাচলের বিষয়টি ইসরায়েলি অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল থাকতে পারে। পুনর্গঠন সামগ্রী প্রবেশে বিধিনিষেধ থাকতে পারে এবং ইসরায়েল যখনই প্রয়োজন মনে করবে, তখনই সামরিক অভিযান চালাতে পারবে।
ফিলিস্তিনিদের একটি পরিচালনা পর্ষদ থাকবে, কিন্তু প্রকৃত কোনো স্বশাসন থাকবে না। ধ্বংসযজ্ঞ ঠেকানোর মতো রাজনৈতিক ক্ষমতা না থাকলেও, ধ্বংসের পরিণতিগুলো তাদেরই সামলাতে হবে। এর ফলে গাজার ভবিষ্যৎ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে, যেখানে সার্বভৌমত্ব ছাড়া প্রশাসন, ক্ষমতা ছাড়া দায়িত্ব এবং স্বাধীনতা ছাড়া শাসনব্যবস্থা টিকে থাকবে।
এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্বশাসন এবং নিয়ন্ত্রিত স্বায়ত্তশাসনের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। একটি ব্যবস্থা মানুষকে তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ দেয়, আর অন্যটি তাদের নিজেদের পরাধীনতাকে পরিচালনা করতে বলে। একটি টেকনোক্র্যাট সরকার হয়তো দক্ষতার সঙ্গে ত্রাণ বিতরণ, পুনর্গঠন কাজের সমন্বয় এবং জরুরি সরকারি পরিষেবাগুলো পুনরায় চালু করতে পারবে। কিন্তু এটি যদি সীমান্ত, নিরাপত্তা, পুনর্গঠন বা রাজনৈতিক জীবনের ওপর কোনো অর্থবহ কর্তৃত্ব ছাড়াই স্থায়ীভাবে বিদেশি নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়, তবে তা ফিলিস্তিনিদের প্রতিনিধিত্ব করবে না। বরং এটি ফিলিস্তিনিদের পরাধীনতাকেই পরিচালনা করবে।
কয়েক দশক ধরে ফিলিস্তিনিদের বলা হয়েছে যে, শান্তির জন্য ভিন্ন নেতৃত্ব, ভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা ভিন্ন রাজনৈতিক কাঠামো প্রয়োজন। হয়তো এবার সেই কাঠামোগুলো বদলাতে শুরু করেছে। যদি তা-ই হয়, তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এখন নিজেদের ধারাবাহিকতা প্রমাণের পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হবে।
হামাসের শাসনই যদি সত্যিই প্রধান বাধা হয়ে থাকে, তবে একটি গ্রহণযোগ্য ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট প্রশাসনের মাধ্যমে পুনর্গঠন, রাজনৈতিক নবায়ন এবং চূড়ান্তভাবে ফিলিস্তিনি নির্বাচনের পথ তৈরি হওয়া উচিত। এর মাধ্যমে ফিলিস্তিনিরা শুধু তাদের বাড়িঘরই নয়, বরং তাদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও পুনর্গঠন শুরু করার সুযোগ পাবে।
তবে যদি পুরোনো শর্তের জায়গায় কেবল নতুন শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়, সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকে, পুনর্গঠন কাজে বাধা দেওয়া হয় এবং প্রতিটি ফিলিস্তিনি প্রশাসন বাইরের নিয়ন্ত্রণের অধীন থাকে, তাহলে হামাসই যে মূল সমস্যা ছিল—এমন দাবি করা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়বে।
গাজার ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত এক দলের বদলে অন্য দলের শাসনের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। বিশ্বের অন্য সব জায়গার মানুষ যেটিকে নিজেদের অধিকার বলে মনে করে, ফিলিস্তিনিদেরও সেই অধিকার—অর্থাৎ কে তাদের শাসন করবে তা নির্ধারণের অধিকার দেওয়ার মাধ্যমেই এটি নির্ধারিত হওয়া উচিত।
যতদিন পর্যন্ত সেই অধিকার স্বীকৃতি না পাচ্ছে, সরকারি দপ্তরের দরজায় নামের পরিবর্তন হয়তো গাজার প্রশাসনে বদল আনবে, কিন্তু এর মূলে থাকা রাজনৈতিক সংঘাতের কোনো সমাধান করবে না।
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.