সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে ভাবনায় ইসরায়েল
- Details
- by আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত নতুন একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি ইসরায়েল। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই চুক্তিটি ওই অঞ্চলে ইসরায়েলি সম্প্রসারণবাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মক্কায় শুক্রবার পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তান, ইসরায়েলের সম্ভাব্য পরবর্তী শত্রু তুরস্ক এবং সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে আগ্রহী সৌদি আরবের মধ্যে এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়।

এই নতুন সামরিক জোটের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো একটি বিশেষ শর্ত। চুক্তির শর্তে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘এই তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে তা তিন দেশের ওপরই হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে।’
বিশ্লেষক ও সরকারি সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, শনিবারের ছুটির দিনটিকে কাজে লাগিয়ে ইসরায়েলি নেতৃত্ব এই নতুন আঞ্চলিক জোটের পূর্ণাঙ্গ প্রভাব নিয়ে চিন্তাভাবনা করবে। সাধারণত এই দিনে ইসরায়েলি রাজনীতিকরা বিশ্রাম নেন।
সব পক্ষের ইসরায়েলি রাজনীতিকরাই তুরস্ককে একটি হুমকি হিসেবে দেখেন। গত মাসে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেছিলেন, ইসরায়েল এমন একটি বোঝা যা মানবতা আর বইতে পারছে না। তার এই মন্তব্যকে লুফে নেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিওন সারসহ অন্যান্য ইসরায়েলি রাজনীতিকরা। গিডিওন সার একে ‘গণহত্যার পাঠ্যপুস্তকীয় উসকানি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। গাজায় ইসরায়েলের বর্বরোচিত যুদ্ধের তীব্র সমালোচনা করে আসছে তুরস্ক। এই যুদ্ধে অন্তত ৭২ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার গোষ্ঠী ও বিশ্লেষকরা গণহত্যা হিসেবে বিবেচনা করেন।
অন্যদিকে, গত জুনে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান জানিয়েছিলেন সিরিয়া ও লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসন আঙ্কারার জন্য সরাসরি হুমকি। তিনি বলেন, ‘তুরস্কের নিরাপত্তা কেবল হাতায় থেকে শুরু হয় না, বরং আলেপ্পো, দামেস্ক এবং বৈরুত থেকেও শুরু হয়।’ এর প্রতিক্রিয়ায় নেতানিয়াহু এরদোয়ানকে ‘ইহুদিবিদ্বেষী স্বৈরশাসক’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ইসরায়েলকে নীতিবাক্য শোনানোর যোগ্যতা তার নেই।
ইসরায়েলকে স্বীকৃতি না দেওয়া পাকিস্তানও ইসরায়েলি ক্ষোভের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এপ্রিলে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ লেবাননে ইসরায়েলের ভয়াবহ হামলাকে ‘শয়তানি’ আখ্যা দেন এবং দেশটিকে ‘মানবতার জন্য অভিশাপ’ বলে উল্লেখ করেন।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় দাবি করে, পরবর্তীতে মুছে ফেলা ওই সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টটি ছিল ‘ইসরায়েলকে ধ্বংস করার ডাক’।
ইসরায়েল সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে বলে খবর রয়েছে। তবে রিয়াদকে ইসরায়েল কম উদ্বেগের কারণ হিসেবেই দেখে।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উভয়েই সৌদি আরবকে আব্রাহাম অ্যাকর্ডস-এ অন্তর্ভুক্ত করার জন্য জোরালো চাপ দিয়েছেন।
কিন্তু ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের বর্বরোচিত যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে রিয়াদ এই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন এই প্রক্রিয়ার অংশ ছিল।
২০২৩ সাল থেকে ওই অঞ্চলের অন্তত ছয়টি দেশের ওপর নেতানিয়াহুর হামলা সৌদি আরবের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। এর মধ্যে ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলাও রয়েছে। মার্কিন বাহিনী মোতায়েন থাকার অজুহাতে ইরান বারবার সৌদি আরবকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।
লন্ডনের কিংস কলেজের স্কুল অব সিকিউরিটি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ আল জাজিরাকে জানান বর্তমান যুদ্ধের অভিজ্ঞতা রিয়াদের জন্য একটি অস্বস্তিকর উপসংহার টেনেছে। তিনি বলেন, ‘মার্কিন সামরিক শক্তি অপরিহার্য হলেও, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক হামলার হাত থেকে রেহাই পাওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না এবং এর মানে এই নয় যে ওয়াশিংটন সৌদি অগ্রাধিকার অনুযায়ী কাজ করবে। তাই সৌদি আরব আরও বেশি কৌশলগত গভীরতা এবং বিকল্প চায়।’
এটি সবসময় ইসরায়েলকে ঘিরে নয়
অনেকেই মনে করেন, সম্প্রতি ঘোষিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিটি মূলত ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া। এটি এমন এক সময়ে হলো যখন ওই অঞ্চলে বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটছে।
নেতানিয়াহু নিজে ইসরায়েল, গ্রিস, সাইপ্রাস এবং পাকিস্তানের শত্রু ভারতের সঙ্গে অন্যান্য নাম না জানা আরব, আফ্রিকান ও এশীয় রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে একটি ‘ষড়ভুজ জোট’ গঠনের চেষ্টা চালিয়েছেন।
সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্ক চুক্তি নিঃসন্দেহে এসব ঘটনাপ্রবাহ দ্বারা প্রভাবিত হলেও এর পেছনে আরও কিছু কারণ রয়েছে।
ব্রেগম্যান আল জাজিরাকে জানান এই প্রতিরক্ষা চুক্তিটি মূলত যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যে তার মিত্রদের রক্ষা করার ক্ষেত্রে তাদের সক্ষমতা বা সদিচ্ছার ওপর আস্থার অভাবকে প্রতিফলিত করে।
তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি যে এই চুক্তিটি ইসরায়েলের চেয়ে ইরানের মোকাবিলা করার জন্যই বেশি। তবে আমি সন্দেহ করি, যদি ইরান কোনো সৌদি ট্যাংকারে হামলা চালায়, তবে এই দেশগুলো একে অপরের সাহায্যে এগিয়ে আসবে কি না। ইসরায়েলি দৃষ্টিকোণ থেকে এই চুক্তির প্রধান নেতিবাচক দিক হলো তুরস্ক এর অংশ, যা ইসরায়েলের জন্য একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।’
নেতানিয়াহুর জন্য তুরস্ক কিছুদিন ধরেই একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে, বিশেষ করে যখন অক্টোবরে ইসরায়েলিরা দেশের পরবর্তী সরকার নির্বাচনের জন্য ভোট দিতে যাচ্ছে। আঙ্কারার কাছে মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রি আটকাতে নেতানিয়াহু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে একের পর এক সাক্ষাৎকার, ফোনালাপ ও বিবৃতি দিয়েছেন।
হারেৎজ-এর বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, সাধারণ নির্বাচনের আগে নিজের নিরাপত্তা সংক্রান্ত ভাবমূর্তি মজবুত করতে নেতানিয়াহু তুরস্ককে একটি ‘উপযোগী নতুন কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী’ হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, নেতানিয়াহু তার প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটের সঙ্গে সমানে সমান লড়ছেন।
অক্টোবরের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর প্রতিদ্বন্দ্বী এবং সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ফেব্রুয়ারিতে তুরস্ককে ‘নতুন ইরান’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি আঙ্কারা পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তানের সঙ্গে একটি ‘বৈরী সুন্নি অক্ষ’ তৈরি করছে বলে সতর্ক করেন।
তার সমর্থকরা শুক্রবার ঘোষিত এই চুক্তিটিকে বেনেটের আগের নিরাপত্তা মূল্যায়নের প্রমাণ হিসেবে দেখবেন। এটি লেবানন, সিরিয়া ও ইসরায়েলে ইসরায়েলের কাজ করার ক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
আপাতত, তুরস্ক-সৌদি-পাকিস্তান নিরাপত্তা চুক্তিটি অক্টোবরের সাধারণ নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহু এবং তার বিরোধীদের প্রচারণার একটি মূল অংশ হতে পারে।
সাবেক ইসরায়েলি সরকারি উপদেষ্টা এবং বর্তমান সমালোচক ড্যানিয়েল লেভি আল জাজিরাকে জানান নির্বাচনের মৌসুমে সবকিছুই অতিরঞ্জিত হয়।
তিনি বলেন, ‘নেতানিয়াহু তুরস্কের তীব্র সমালোচনা করেছেন, তবে বেনেট এই ইস্যুতে আরও চরমপন্থী। তিনি এটিকে এই অঞ্চলে নতুন ইরানি-শৈলীর চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার ধারণা, তারা এটিকে নেতানিয়াহুর সমালোচনা করার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করবে এবং বিশেষ করে সৌদি আরবের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টিকে কূটনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে তুলে ধরবে। অন্যদিকে, নেতানিয়াহু এটিকে ছোট করে দেখার চেষ্টা করতে পারেন। তিনি দাবি করতে পারেন যে ভারতের নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সম্পর্কটি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যা তিনি নিজে গড়ে তুলেছেন।’
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.