আপনি পড়ছেন

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গণহত্যার শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ ৯ বছরেও প্রত্যাবাসন সম্ভব হয়নি। উল্টো গত দেড় বছরে নতুন করে আরও দেড় লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার সুযোগ নিয়ে উখিয়া ও টেকনাফের ক্যাম্পগুলো এখন খুন, অপহরণ ও মাদক চোরাচালানসহ ভয়ংকর সব অপরাধের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

৯ বছরেও ফেরেনি কোনো রোহিঙ্গা, বাড়ছে অপরাধ
রোহিঙ্গা ক্যাম্প

২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পরের কয়েক সপ্তাহে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে ১৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রোহিঙ্গা নেতারা জানান, পাহাড়ঘেরা ঘনবসতিপূর্ণ এসব ক্যাম্প এখন আর কেবল বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়কেন্দ্র নেই। বেকারত্ব ও হতাশার সুযোগ নিয়ে এগুলো গুরুতর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের আখড়ায় পরিণত হয়েছে।

গত ৯ বছরে ক্যাম্পগুলোতে মোট ২৯২টি বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আধিপত্য বিস্তার, টার্গেট কিলিং, অপহরণ, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান এবং মুক্তিপণের জন্য জিম্মি করার মতো ঘৃণ্য অপরাধের মাধ্যমে ১০টির বেশি রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী স্থানীয়দেরও কোণঠাসা করে ফেলেছে। এসব অপরাধী চক্রের লাগামহীন কর্মকাণ্ডের কারণে উখিয়া ও টেকনাফের সাধারণ বাসিন্দাদের জীবন চরম নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছে। রাতে ক্যাম্পের আশপাশের সড়কগুলোতে যাতায়াত করাও স্থানীয়দের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শরণার্থী সেবায় যুক্ত দেশি-বিদেশি এনজিওর ৫০ জনের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীও চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। চাঁদাবাজদের প্রাণনাশের হুমকির মুখে এনজিও কর্মীরা বিকেল ৪টার আগেই ক্যাম্প এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) কার্যালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, মিয়ানমার থেকে আসা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে ক্যাম্পে টার্গেট কিলিং ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বেড়েছে।

যৌথ বাহিনী জঙ্গিদের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত অভিযান পরিচালনা করছে এবং প্রায় প্রতিদিনই অস্ত্রসহ সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘রাখাইনে রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক প্রত্যাবাসন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এই সংকটের পুরোপুরি সমাধান সম্ভব নয়।’

বর্তমানে ক্যাম্পে মিয়ানমারের চারটি বড় সশস্ত্র গোষ্ঠীর পাশাপাশি আরও পাঁচ-ছয়টি ছোট গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। তাদের মূল লক্ষ্য হলো ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা, ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথামফেটামিনের (আইস) চোরাচালান রুট সচল রাখা এবং আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ৯ বছরে ক্যাম্পগুলোতে দায়ের করা ৫ হাজার ৬০৩টি মামলায় ১৫ হাজার ১৩৭ জন রোহিঙ্গাকে আসামি করা হয়েছে। মামলার সংখ্যা বাড়লেও রক্তপাত থামছে না। পুলিশ ও রোহিঙ্গা নেতারা জানান, আধিপত্য বিস্তার ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে গত দুই বছরে অন্তত ১৯টি বড় সংঘর্ষে উভয় পক্ষের কমান্ডারসহ অন্তত ২৩ জন নিহত হয়েছে।

২০১৭ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ক্যাম্পের অপরাধের ধরন বিশ্লেষণ করলে এক ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে। ২০১৭ সালের আগস্টে রোহিঙ্গা ঢলের প্রথম বছর পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও, পরের বছর সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ২৩ জন নিহত হয়। ২০১৯ সালে মাদক চোরাচালান ও আধিপত্য বিস্তারের লড়াই তীব্র হলে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩২-এ দাঁড়ায়।

২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যেও অপরাধ থামেনি, সে বছর ১৬ জন খুন হয়। ২০২১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস-এর (এআরএসপিএইচ) চেয়ারম্যান ও শীর্ষ রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহকে গুলি করে হত্যা করে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) সদস্যরা। পরদিন একটি মাদ্রাসার ছয় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে হত্যা করা হয়। ওই বছর মোট ৩০ জন নিহত হয়।

২০২২ সালে চাঁদাবাজি ও অপহরণ ব্যাপক আকার ধারণ করলে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৪৪ হয়। ক্যাম্পের ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী বছর ছিল ২০২৩ সাল। সে বছর ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আরসা এবং রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) মধ্যে নজিরবিহীন সংঘর্ষে ৮৩ জন নিহত হয়।

২০২৪ সালে ২২ জন, পরের বছর ৩০ জন এবং চলতি বছরের ২০ আগস্ট পর্যন্ত ১২ জন নিহত হয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত ৯ বছরে মোট নিহতের সংখ্যা ২৯২ জন। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রোহিঙ্গা নেতারা জানান, লাশ গুম করা বা দুর্গম পাহাড়ে ফেলে রাখার কারণে অনেক অপহরণ ও খুনের ঘটনা আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা পর্যন্ত গড়ায় না। তাদের ধারণা, গত ৯ বছরে প্রকৃত নিহতের সংখ্যা ৩২৫ ছাড়িয়ে যেতে পারে।

অপরাধ তদন্ত ও বিশ্লেষণ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানায়, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ধরনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এটি এখন আর কেবল চাঁদাবাজিতে সীমাবদ্ধ নেই; বিকাশ ও নগদের মতো আধুনিক মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ব্যবহার করে শিশু অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনাও বেড়েছে।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার্স ফোরামের কক্সবাজার শাখার সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আবদুল শুক্কুর জানান, গত ৯ বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও প্রত্যাবাসন করতে না পারায় চরম হতাশার সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘এই হতাশা থেকে গড়ে ওঠা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অপরাধ সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দেওয়া না হলে কক্সবাজার অঞ্চল দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির মুখে পড়বে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কঠোর প্রশাসনিক ও সামরিক অভিযানের পাশাপাশি দ্রুততম সময়ের মধ্যে টেকসই প্রত্যাবাসনের পথ খুলতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে। রক্তপাত ও অপরাধের চক্র থেকে বেরিয়ে আসার এটাই একমাত্র পথ।’

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.