আপনি পড়ছেন

তেল রাজস্ব, বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় তেহরানের প্রবেশাধিকার বন্ধ করতে অর্থনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে ইরানের অর্থনীতি চরম চাপের মুখে পড়েছে। তেহরানকে আর্থিকভাবে একঘরে করতে এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতা বাড়াতে চলতি সপ্তাহে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামের একটি প্রচারাভিযান শুরু করেছে ওয়াশিংটন।

বিশ্লেষণ: ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আর কী অর্থনৈতিক চাপ রয়েছে?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের ভবনের একাংশ

মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এই পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়ে জানান, তেহরান একঘরে না হওয়া পর্যন্ত এই স্বৈরাচারী শাসনকে টিকিয়ে রাখা প্রতিটি অর্থনৈতিক পথ বন্ধ করাই বিশ্বজুড়ে তাদের লক্ষ্য।

আগে থেকেই চরম অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছে ইরান। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, তাদের তেল রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে এবং রিয়ালের মান রেকর্ড পরিমাণ কমেছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) চলতি বছর ইরানের অর্থনীতি ৬ দশমিক ১ শতাংশ সংকুচিত হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে।

ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক চাপের মূল কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের তেল বাণিজ্য, যা তেহরানের রপ্তানি আয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোলনাসের হেম্মাতি গত সপ্তাহে জানান, যুদ্ধ এবং নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের তেল রপ্তানি শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘তেল রপ্তানিতে আমরা যে বিধিনিষেধের মুখে পড়েছি, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমরা যে তেল রপ্তানি করছি না, তা একটি বাস্তব সত্য।’

সাময়িক শিথিলতার পর ১৪ জুলাই ইরানি বন্দরগুলোতে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর ওপর নৌ অবরোধ পুনর্বহাল করে যুক্তরাষ্ট্র। পণ্যবিষয়ক গোয়েন্দা সংস্থা কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে ইরানের অপরিশোধিত তেল সরবরাহের পরিমাণ ছিল গড়ে ৮ লাখ ৯৩ হাজার ব্যারেল, যা ১৭ আগস্ট পর্যন্ত কমে মাত্র ১ লাখ ৫৬ হাজার ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। হেম্মাতির বক্তব্য অনুযায়ী, রপ্তানি শূন্যের কোঠায় নেমে আসার অর্থ হলো তেহরানের তেল রাজস্বের ওপর চাপ আরও তীব্র হয়েছে।

ইউনিভার্সিটি অব মিসৌরি-সেন্ট লুইসের অর্থনৈতিক ইতিহাসের অধ্যাপক ম্যাক্স গিলম্যান আনাদোলুকে জানান, নৌ অবরোধই সম্ভবত ওয়াশিংটনের প্রধান অর্থনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে থেকে যাবে এবং এটি অনির্দিষ্টকালের জন্য চলতে পারে। তিনি বলেন, ‘অব্যাহত এই অবরোধ ইরানের শাসকগোষ্ঠীর হাতে থাকা অর্থনৈতিক সম্পদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে কাজ করছে।’

তেল বিক্রির ক্ষমতা সীমিত করা ওয়াশিংটনের কৌশলের একটি দিক মাত্র। তেহরানের উপার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের পথও কঠিন করে তুলতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। হেম্মাতি জানান, সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক রাজস্ব হারানোর জন্য প্রস্তুত ছিল, তবে ওয়াশিংটন তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আটকে রাখায় ইরান অতিরিক্ত বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমেরিকানরা আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আটকে রেখেছে এবং সেগুলো আমাদের তুলতে দিচ্ছে না।’

জুন মাসে ওয়াশিংটনের সঙ্গে হওয়া ‘ইসলামাবাদ মেমোরেন্ডাম’ চুক্তির অধীনে যে তহবিল ছাড়ের কথা ছিল, তা এখনও মুক্ত করা হয়নি বলেও তিনি জানান।

নিষেধাজ্ঞার কারণে রপ্তানি আয় স্থানান্তর করতে ইরান ক্রমশ বিকল্প লেনদেন ব্যবস্থা, শ্যাডো ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক, ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং তৃতীয় দেশের মধ্যস্থতাকারীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তবে মার্কিন কর্তৃপক্ষ বারবার এসব মাধ্যমেও বাধা দিচ্ছে। চলতি সপ্তাহে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ডিজিটাল সম্পদ, প্রযুক্তি, স্বর্ণ, বিমান পরিবহন এবং নৌপরিবহনসহ ইরানের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের নতুন কিছু খাত ঘোষণা করেছে, যার মাধ্যমে বিদেশি কোম্পানি এবং ব্যক্তিরাও নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারে। ট্রেজারি বিভাগ আরও জানায়, তারা বিশ্বজুড়ে ৬০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি এবং জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কাজ করছে, যারা ইরানকে সাহায্য করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ট্রেজারি, স্টেট ডিপার্টমেন্ট এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীর দলগুলো বিদেশি সমকক্ষদের সঙ্গে বৈঠক করছে এবং ওয়াশিংটনের চিহ্নিত কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য তাদের সময়সীমা বেঁধে দিচ্ছে। স্কট বেসেন্ট বলেন, ‘আমাদের চিহ্নিত কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য প্রতিটি দেশের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা রয়েছে। তারা ব্যবস্থা না নিলে আমরা ট্রেজারি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে একতরফাভাবে তা করব।’

তিনি ইরানের ব্যাংক মেল্লির কথা উল্লেখ করে বলেন, এর প্রতিটি শাখা বন্ধ করতে হবে। তিনি বলেন, ‘ইরানের পক্ষে অর্থ পাচারে সহায়তাকারী যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে মার্কিন ডলার ব্যবস্থা থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। সময় কিন্তু ফুরিয়ে আসছে।’

ইরানের অর্থনীতির এক কঠিন মুহূর্তে ওয়াশিংটন এই বিধিনিষেধ কঠোর করছে। আইএমএফ ২০২৬ সালে দেশটির অর্থনীতি ৬ দশমিক ১ শতাংশ সংকুচিত হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে এবং গড় মূল্যস্ফীতি ২০২৫ সালের ৫০ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬৮ দশমিক ৯ শতাংশ হবে বলে ধারণা করছে। শ্রমবাজারের অবস্থাও খারাপ হয়েছে। বসন্তকালে ইরানের আনুষ্ঠানিক বেকারত্বের হার বেড়ে ৯ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়ায়। সোমবার অনানুষ্ঠানিক বাজারে মার্কিন ডলারের বিপরীতে রিয়ালের মান রেকর্ড পরিমাণ কমে প্রায় ২০ লাখে নেমে আসে। জুলাই মাসে ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ৮৭ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছায়।

ওয়াশিংটনের এই অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের একটি সীমা রয়েছে। অবিলম্বে শাস্তি না দিয়ে কেন ইরানের ব্যবসায়িক অংশীদারদের কার্যক্রম বন্ধ করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে বেসেন্ট বলেন, ‘আমরা সবাইকে খারাপ আচরণ সংশোধনের সুযোগ দিচ্ছি। আমি কেন বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা ধ্বংস করতে চাইব?’

গিলম্যান জানান, অপরিশোধিত তেলের দাম ৭০-৮০ ডলারের মধ্যে রাখলে তা ব্যাপক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করবে। তবে বড় প্রশ্ন হলো, এই তীব্র অর্থনৈতিক চাপ ওয়াশিংটনের কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ছাড় আদায় করতে পারবে কি না। কয়েক দশক ধরে ইরান মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যেই টিকে আছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন মনে করে, কঠোর প্রয়োগ তেহরানের হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিতে পারে।

বেসেন্ট সরাসরি ইরানি সৈন্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘এই শাসনব্যবস্থাকে সমর্থনকারী সাধারণ সৈন্যদের বলছি, যখন আপনাদের বেতন বন্ধ হয়ে যাবে বা দেরি হবে, তখন ভেবে দেখবেন আপনাদের কমান্ডাররা দেশকে বিজয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন নাকি ধ্বংসের দিকে।’

ইরানের ওপর চরম অর্থনৈতিক চাপ এবং প্রায় ছয় মাসের যুদ্ধ সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত কোনো স্থায়ী সমাধান আসেনি। ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক ত্যাগ এবং বিদেশি চাপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধকে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের নীতি রক্ষার অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি বলেছিলেন, ‘আমরা সস্তা তরমুজের জন্য বিপ্লব করিনি, আমরা ইসলামের জন্য বিপ্লব করেছি।’

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.