আইসল্যান্ডের ইইউ গণভোট: সামনে কী ঘটতে যাচ্ছে
- Details
- by আন্তর্জাতিক ডেস্ক
এক দশকের বেশি সময় স্থগিত থাকার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) যোগদানের আলোচনা পুনরায় শুরু করা হবে কি না, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে আইসল্যান্ড। মৎস্যসম্পদ, অর্থনৈতিক উদ্বেগ এবং আর্কটিক অঞ্চলের পরিবর্তনশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। শনিবার প্রায় চার লাখ আইসল্যান্ডীয় নাগরিক এই বিষয়ে ভোট দেবেন।

এই গণভোট সরাসরি ইইউ সদস্যপদের জন্য নয়। হ্যাঁ জয়যুক্ত হলে সরকার কেবল আলোচনা পুনরায় শুরু করার অনুমতি পাবে। অন্যদিকে সদস্যপদ সংক্রান্ত যেকোনো চূড়ান্ত চুক্তির জন্য দ্বিতীয়বার গণভোটের প্রয়োজন হবে। এই পার্থক্যটি নির্ধারক প্রমাণিত হতে পারে, কারণ সদস্যপদ নিয়ে সন্দিহান কিছু আইসল্যান্ডীয় নাগরিক দেখতে চান ব্রাসেলস তাদের কী ধরনের শর্ত দেয়।
চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত মাসকিনার একটি জরিপে দেখা গেছে, হ্যাঁ ভোট ৫১ দশমিক ৩ শতাংশ নিয়ে সামান্য এগিয়ে আছে এবং ৪৮ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ এর বিপক্ষে। এর আগে গ্যালাপের একটি জরিপে উভয় পক্ষের সমর্থন ৪৬ শতাংশ ছিল এবং ৮ শতাংশ মানুষ সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলেন। তবে ইউরোপিয়ান পলিসি সেন্টারের (ইপিসি) উদ্ধৃত অন্য একটি জরিপে দেখা যায়, ৫৪ শতাংশ মানুষ ইইউতে যোগদানের বিপক্ষে এবং ৪৬ শতাংশ পক্ষে।
বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের সময় ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর ২০০৯ সালে ইইউ সদস্যপদের জন্য আবেদন করেছিল আইসল্যান্ড। ২০১০ সালে আলোচনা শুরু হলেও তিন বছর পর ইইউ-বিরোধী সরকার ক্ষমতায় এলে তা স্থগিত করা হয়। এরপর ২০১৫ সালে রেইকিয়াভিক ব্রাসেলসকে জানায় যে তারা আর প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হতে চায় না। ইপিসির একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউরোপীয় কমিশন মনে করে আইসল্যান্ডের আবেদন এখনও আইনগতভাবে বৈধ এবং আলোচনা কেবল স্থগিত রয়েছে।
আইসল্যান্ডিক ইইউ বিষয়ক থিংক ট্যাংক এভ্রোপ্রুস্ট্রাউমারের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক হলগ্রিমুর ওডসন আনাদোলুকে জানান, আইসল্যান্ড বর্তমানে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি অবস্থান থেকে বিষয়টি বিবেচনা করছে। তিনি বলেন, ‘সেই সময় আইসল্যান্ডের ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল, আমাদের মূলধন নিয়ন্ত্রণ ছিল এবং আমরা আইএমএফের ঋণ পুনর্গঠন কর্মসূচির অধীনে ছিলাম।’
মাথাপিছু জিডিপির দিক থেকে আইসল্যান্ড এখন ইউরোপের অন্যতম ধনী দেশ হলেও সেখানে ঋণ ও জীবনযাত্রার ব্যয় এখনও অনেক বেশি। আইসল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, সুদের হার ৮ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশের ওপরে রয়েছে। সমর্থকদের যুক্তি, ইউরো মুদ্রা গ্রহণ করলে ঋণের খরচ কমতে পারে এবং মূল্যের স্থিতিশীলতা আসতে পারে।
আইসল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকদের ইউনিয়ন ভিসকার একটি বিশ্লেষণে ২০২৬ সালে দেশটিকে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল দেশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ২৭টি ইউরোপীয় দেশের গড়ের তুলনায় সেখানে জিনিসপত্রের দাম ৮৪ শতাংশ বেশি ছিল, যা গত ৩০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ব্যবধান।
ইপিসির জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা টোবিয়াস এতজোল্ড জানান, নতুন করে শুরু হওয়া এই বিতর্ক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উদ্বেগের প্রতিফলন। তিনি বলেন, ‘ইইউ এবং ইউরোজোনে যোগ দিলে একটি ছোট রপ্তানি ও আমদানি-নির্ভর অর্থনীতির বৈশ্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা সহজ হতে পারে, যার মধ্যে উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়ও অন্তর্ভুক্ত।’ তিনি আরও বলেন, ‘নিরাপত্তার দিক থেকে ইইউর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা এবং এমনকি সদস্যপদ আইসল্যান্ডের নিরাপত্তা, কৌশলগত বিকল্প এবং স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে পারে।’
স্ট্যাটিস্টিকস আইসল্যান্ডের তথ্য অনুযায়ী, আইসল্যান্ডের রপ্তানির প্রায় ৪০ শতাংশই মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক পণ্য। ইইউর সাধারণ মৎস্য নীতি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মাছ ধরার সুযোগ ও কোটা নিয়ন্ত্রণ করে। বিরোধীদের আশঙ্কা, সদস্যপদ পেলে স্বাধীনভাবে মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষমতা হারাবে আইসল্যান্ড এবং ইউরোপের অন্যান্য নৌবহর তাদের মাছ ধরার অঞ্চলে প্রবেশের সুযোগ পাবে। আইসল্যান্ড সরকার জানিয়েছে, তারা মৎস্য ও কৃষির ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যবস্থা বা ছাড় চাইবে।
ইইউর সম্প্রসারণ বিষয়ক কমিশনার মার্টা কোস জানান, সৃজনশীল সমাধান খুঁজে বের করা সম্ভব। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘আলোচনা সবসময় প্রতিটি প্রার্থী দেশের নির্দিষ্ট বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে।’ ওডসন জানান, ইইউ কর্মকর্তারা বিশেষ করে মৎস্য খাতে নমনীয়তার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে ইউরোপীয় কমিশন এবং ২৭টি সদস্য রাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় সেই নমনীয়তা টিকবে কি না, তা অনিশ্চিত।
পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যেও এই গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আইসল্যান্ড গ্রিনল্যান্ড-আইসল্যান্ড-যুক্তরাজ্য গ্যাপের কাছাকাছি অবস্থিত, যা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ এবং এখান থেকে ন্যাটো রাশিয়ার সামুদ্রিক ও সাবমেরিন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে। ১৯৪৯ সাল থেকে ন্যাটোর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য আইসল্যান্ডের কোনো স্থায়ী সেনাবাহিনী নেই এবং তারা প্রতিরক্ষার জন্য জোট ও ১৯৫১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ওপর নির্ভরশীল।
আধা-স্বায়ত্তশাসিত ডেনিশ ভূখণ্ড গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রচারণা বৃহত্তর নর্ডিক অঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি করেছে। জানুয়ারিতে দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে দেওয়া ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার আইসল্যান্ডের সঙ্গে গ্রিনল্যান্ডকে গুলিয়ে ফেলেন বলে মনে হয়েছিল। গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তার পরিকল্পনার ইউরোপীয় বিরোধিতার বিষয়ে আলোচনা করার সময় তিনি বলেন, ‘তারা আইসল্যান্ডে আমাদের জন্য নেই, তা আমি আপনাদের বলতে পারি।’
আইসল্যান্ডে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের জন্য মনোনীত বিলি লং রসিকতা করে বলেছিলেন যে আইসল্যান্ড আমেরিকার ৫২তম অঙ্গরাজ্য হতে পারে। পরে তিনি ক্ষমা চান। দ্য বুলওয়ার্ক এবং মার্কিন বিচার বিভাগের একটি নথির বরাত দিয়ে দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট জানিয়েছে, ওয়াশিংটনে নিযুক্ত আইসল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়ে রেইকিয়াভিককে পরামর্শ দেওয়ার জন্য মাসে ২৫ হাজার ডলারে একটি লবিং ফার্ম নিয়োগ করেছেন।
মার্চ মাসে গ্রিনল্যান্ড সংযুক্ত করার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি হুমকির পর আইসল্যান্ড এই গণভোটের ডাক দেয়। দেশটির আরও শক্তিশালী ইউরোপীয় সমর্থন প্রয়োজন কি না, তা নিয়ে বিতর্কে নতুন করে তাগিদ তৈরি হয়। মার্চ মাসে আইসল্যান্ড ও ইইউ একটি নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব চুক্তিও স্বাক্ষর করেছে।
এতসব কিছুর পরও প্রচারণায় মূলত গৃহস্থালি খরচ, মাছ ধরা এবং সার্বভৌমত্বের বিষয়টিই প্রাধান্য পেয়েছে। এতজোল্ড বলেন, ‘অনেকের কাছেই ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা তাদের দৈনন্দিন জীবন থেকে অনেক দূরের বিষয় বলে মনে হয়। তারা চারপাশের নিরাপত্তা পরিস্থিতির চেয়ে নিজেদের অর্থনৈতিক কল্যাণ নিয়েই বেশি ব্যস্ত।’
ওডসনও একইভাবে জানান, ভূ-রাজনীতি ভোটারদের আলোচ্যসূচিতে অনেকের ধারণার চেয়েও নিচে রয়েছে। কোনো বিশেষজ্ঞই মনে করেন না যে হ্যাঁ ভোট ওয়াশিংটনের সঙ্গে আইসল্যান্ডের সম্পর্ককে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এতজোল্ড বলেন, ‘এখন পর্যন্ত নিরাপত্তা রক্ষাকারী হিসেবে ইইউ যথেষ্ট শক্তিশালী নয়, তাই ইইউর সদস্য হলেও আইসল্যান্ডকে আপাতত নিরাপত্তার নিশ্চয়তার জন্য ন্যাটো এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করতে হবে।’
আইসল্যান্ড ইতোমধ্যে নরওয়ে এবং লিচেনস্টাইনের পাশাপাশি ইউরোপিয়ান ইকোনমিক এরিয়ার মাধ্যমে ইইউর একক বাজারে অংশগ্রহণ করছে। এটি পাসপোর্টমুক্ত সেনজেন অঞ্চলেরও অংশ এবং ব্লকের একক বাজারের বেশিরভাগ আইন নিজেদের জাতীয় আইনে অন্তর্ভুক্ত করেছে। ফিনান্সিয়াল টাইমসের মতে, সমর্থকদের যুক্তি হলো আইসল্যান্ড ব্রাসেলসে তৈরি করা নিয়মগুলো বাস্তবায়ন করে, কিন্তু সেখানে তাদের কোনো ভোটাধিকার নেই। বিরোধীরা বলছেন, বর্তমান ব্যবস্থা আইসল্যান্ডকে একক বাজারে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি মৎস্য, কৃষি, বাণিজ্য নীতি এবং নিজস্ব মুদ্রার ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার সুযোগ দেয়।
ইইউর জন্য আইসল্যান্ড তুলনামূলকভাবে একটি সহজ প্রার্থী হতে পারে, কারণ এটি একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক দেশ এবং ইতোমধ্যে ইইউর বেশিরভাগ আইন প্রয়োগ করে। মার্টা কোস জানান, আইসল্যান্ড এক বা দুই বছরের মধ্যে যোগদানের আলোচনা শেষ করতে পারে। হ্যাঁ জয়যুক্ত হলে সরকার ব্রাসেলসকে কয়েক মাসের মধ্যে আলোচনা পুনরায় শুরু করার অনুরোধ করার ম্যান্ডেট পাবে।
চুক্তি হয়ে গেলে আইসল্যান্ডীয়রা শর্তগুলো মেনে নিয়ে ইইউতে যোগ দেবে কি না, তা নিয়ে আবারও ভোট দেবে। সার্বভৌম ক্ষমতা হস্তান্তরের অনুমতি দেওয়ার জন্য সাংবিধানিক সংশোধনীরও প্রয়োজন হতে পারে। আইসল্যান্ডের সফল আবেদন ইইউর সম্প্রসারণকে ত্বরান্বিত করবে, কারণ ২০১৩ সালে ক্রোয়েশিয়ার পর আর কোনো দেশ ব্লকে যোগ দেয়নি। এটি নরওয়েতেও বিতর্ক পুনরুজ্জীবিত করতে পারে, যারা ১৯৭২ এবং ১৯৯৪ সালের গণভোটে ইইউ সদস্যপদ প্রত্যাখ্যান করেছিল।
আর না জয়যুক্ত হলে যোগদানের আলোচনা স্থগিত হয়ে যাবে এবং বর্তমান সম্পর্ক বজায় থাকবে। আইসল্যান্ড ইউরোপিয়ান ইকোনমিক এরিয়া, সেনজেন এবং ন্যাটোতে থাকবে এবং পররাষ্ট্র নীতি, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার বিষয়ে ইইউর সঙ্গে সহযোগিতা আরও গভীর করার সম্ভাবনা থাকবে। এতজোল্ড জানান, ব্রাসেলস ফলাফল মেনে নেবে এবং সম্পর্ক কমবেশি আগের মতোই চলবে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘ভবিষ্যতে আইসল্যান্ডের কোনো সরকার আবার আলোচনা স্থগিত করার জন্য যদি এখন আলোচনা শুরু করে, তবে তা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের আরও বেশি ক্ষতি করতে পারে।’
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.