আপনি পড়ছেন

তীব্র গরম এখন আর কেবল আবহাওয়াজনিত কোনো দুর্যোগ নয়, বরং এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি, উৎপাদনশীলতা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য এক মারাত্মক হুমকিতে পরিণত হয়েছে। বৈশ্বিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে দেশের শ্রমজীবী মানুষের আয় কমার পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকি চরম আকার ধারণ করছে। চলতি বছর কেবল উৎপাদনশীলতা কমার কারণেই বাংলাদেশের শত শত কোটি ডলারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

তীব্র গরমে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যে চরম ঝুঁকি
তীব্র গরমে কাজ করছেন বাংলাদেশের এক শ্রমজীবী মানুষ

গত জুলাই মাসে ইউরোপ তীব্র দাবদাহের শিকার হওয়ার পর থেকে বিশ্বজুড়ে এই সতর্কতা আরও জোরালো হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে তীব্র গরমের কারণে বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতায় ১৩০ কোটি থেকে ১৮০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) শূন্য দশমিক ৩ থেকে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশের সমান।

জার্মানির বার্লিনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যাডেলফি গ্লোবালের এক গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও নাইজেরিয়ার কৃষি এবং নির্মাণ খাতের শ্রমিকরা তীব্র গরমের কারণে বছরে প্রায় ২০ কর্মদিবস হারাচ্ছেন। এতে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আয় কমার পাশাপাশি চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় বিপুল সংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে বলে গবেষণায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

তাপমাত্রা বৃদ্ধির স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। জুলাইয়ে প্রকাশিত দ্য ল্যানসেট প্ল্যানেটারি হেলথ-এর এক গবেষণায় বলা হয়, বৈশ্বিক তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলোতে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়বে। এছাড়া ব্রাসেলসভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় ভিইউবি-এর নেতৃত্বে পরিচালিত এবং ২৭ আগস্ট সায়েন্স অ্যাডভান্সেস সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে বাংলাদেশের ২ কোটি ৩০ লাখ শিশু প্রতি বছর অন্তত এক মাস অতিরিক্ত গরমের ঝুঁকিতে পড়বে।

বিশ্বব্যাংকের ‘এ লিভেবল ফিউচার’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দিনের তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেলে উৎপাদনশীলতা ব্যাপকভাবে কমে যায়। কেবল ঢাকাতেই তীব্র গরমের কারণে বার্ষিক কর্মঘণ্টার প্রায় ৩ শতাংশ কাজ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে, যা প্রায় ৪ লাখ ৬৫ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমান। এছাড়া আইএলও, আইএফসি এবং কর্নেল ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল লেবার ইনস্টিটিউটের যৌথ বিশ্লেষণের বরাত দিয়ে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে তীব্র গরমের কারণে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার পোশাক শিল্পে রপ্তানি আয় ৬ হাজার ৫৮০ কোটি ডলার পর্যন্ত কমতে পারে।

অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কর্মঘণ্টা সমন্বয়, স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘প্রথমত অনানুষ্ঠানিক খাতকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে এবং নিয়োগকর্তাদের শ্রম আইনের আওতায় আনতে হবে।’

এর মাধ্যমে কর্মস্থলের পরিবেশ উন্নত হবে এবং শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমবে বলে তিনি মনে করেন।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাক-শিল্প যুগের তুলনায় বাংলাদেশের তাপমাত্রা ইতোমধ্যে ১ দশমিক ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ-এর তথ্যমতে, ২০০০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে গরমজনিত মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ ড. শফিউন নাহিন শিমুল জানান, তীব্র গরমের কারণে স্বাস্থ্যগত প্রভাবের আর্থিক ক্ষতি নিয়ে বাংলাদেশে খুব কমই গবেষণা হয়েছে। তিনি বলেন, রোদে কাজ করা মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর তীব্র গরমের প্রভাব স্পষ্ট হলেও এর ফলে ব্যক্তি ও পরিবারের ওপর যে আর্থিক চাপ তৈরি হয়, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ নেই। এছাড়া নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য স্বাস্থ্য বীমা চালু করা কঠিন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এফবিসিসিআই-এর প্রশাসক ও পোশাক রপ্তানিকারক মো. ফজলুল হক জানান, ভবিষ্যতে কারখানার উৎপাদন ব্যবস্থায় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ একটি বাধ্যতামূলক বিষয় হয়ে উঠতে পারে। বৃহস্পতিবার টিবিএস জিরো-সাম গেম টকশোতে তিনি বলেন, ‘বাইরের তাপমাত্রা কমানো সম্ভব নয়। তবে বছরে ১৫ থেকে ২০ দিন যখন গরম অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন কারখানার ভেতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে।’

তিনি শ্রমিকদের জন্য সান্ধ্যকালীন শিফট চালু এবং হারানো কর্মঘণ্টার জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও পরামর্শ দেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তীব্র গরমকে এখন আর কেবল পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটিকে জনস্বাস্থ্য, শ্রমবাজার ও অর্থনৈতিক নীতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

টিবিএস অবলম্বনে

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.