ইসরায়েলি হামলায় স্বপ্নের বাড়ি ছাড়তে বাধ্য ফিলিস্তিনি পরিবার
- Details
- by আন্তর্জাতিক ডেস্ক
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি দখলদারদের অব্যাহত সহিংসতা ও হামলার মুখে নিজের স্বপ্নের বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন এক ফিলিস্তিনি খ্রিষ্টান নাগরিক। বহু অর্থ ব্যয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নির্মিত ওই বাড়িটিতে মাত্র কয়েক দিন বসবাসের পরই তিনি পরিবার নিয়ে সেখান থেকে চলে যেতে বাধ্য হন।

স্থানীয় চার্চের যাজক বাশার ফাওয়াদলেহ জানান, দখলদারদের অব্যাহত হামলার কারণে গত তিন বছরে তাইবেহ এলাকা ছেড়ে চলে গেছে ১৬টিরও বেশি পরিবার। এছাড়া আরও কয়েক ডজন পরিবার বর্তমানে এলাকা ছেড়ে অন্য দেশে পাড়ি জমানোর কথা বিবেচনা করছে।
সাত বছর আগে রামাল্লার পূর্বে অবস্থিত প্রধান খ্রিষ্টান অধ্যুষিত এলাকা তাইবেহতে নিজের স্বপ্নের বাড়ি নির্মাণ শুরু করেন বশির নাঈম। তিনি আশা করেছিলেন, নিজের সন্তান ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে সেখানে বসবাস করবেন। অধিকৃত পশ্চিম তীরের এই অঞ্চলে প্রায় ৪২১ বর্গমিটারের বাড়িটি তৈরিতে তিনি ২ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলারেরও বেশি ব্যয় করেন।
পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি বাড়ির চারপাশে বেড়া দেন এবং নজরদারি ক্যামেরা বসান। তবে নাঈম জানান, দখলদারদের বারবার হামলার কারণে শেষ পর্যন্ত বাড়িটি একটি ‘কারাগারের’ মতো রূপ নেয়।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই শহরে বাড়িঘর, কৃষিজমি এবং জীবিকার ওপর দখলদারদের হামলার ঘটনা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। স্থানীয় ও চার্চের কর্মকর্তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, এ ধরনের অব্যাহত সহিংসতার কারণে আরও অনেক পরিবার ও তরুণরা এলাকা ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবছে।
নিজের স্বপ্নের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে নাঈম জানান, বাড়িটি মূলত তার নিজের, স্ত্রী, দুই ছেলে এবং তাদের পরিবারের ভবিষ্যৎ বাসস্থান হিসেবে নকশা করা হয়েছিল।
নাঈম বলেন, ‘আমি চেয়েছিলাম এই বাড়িটি আমার, আমার স্ত্রী, আমার ছেলে ও নাতি-নাতনিদের জন্য হোক।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার দুই ছেলে রয়েছে, যাদের বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা ছিল এবং আমরা সবাই এখানে একসঙ্গে বসবাস করতে চেয়েছিলাম।’
রেফ্রিজারেটর এবং ওয়াশিং মেশিন মেরামতের কাজের জন্য নাঈম ওই সম্পত্তির একটি অংশ আলাদা করে রেখেছিলেন। কিন্তু বাড়িতে ওঠার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় তিনি দেখতে পান, দখলদাররা বারবার তাদের সম্পত্তির আশপাশে অবস্থান নিতে শুরু করেছে। প্রথমে দিনের বেলা হয়রানি করা হলেও পরে তা রাতের হামলায় রূপ নেয়।
নাঈমের দেওয়া তথ্যমতে, দখলদাররা শুধু বাড়ির কাছাকাছি আসত তা-ই নয়, বরং নিরাপত্তার জন্য যেসব সরঞ্জাম বসানো হয়েছিল সেগুলোতেও হামলা চালাত। নাঈম বলেন, ‘তারা রাতে এসে নজরদারি ক্যামেরা চুরি করত এবং ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিত।’
এরপর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দখলদাররা নাঈম ও তার ছেলেকে অনুসরণ করে তাদের ওপর হামলার চেষ্টা চালায়। এ প্রসঙ্গে নাঈম বলেন, ‘আমরা যতবারই বাড়ির দিকে যেতাম, তারা আমাদের পিছু নিত এবং আক্রমণের চেষ্টা করত। একপর্যায়ে আমি ও আমার ছেলে ভেতরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হতাম।’
সহিংসতা অব্যাহত থাকায় নাঈম বাড়ির চারপাশে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেন। তবে পরিবারকে রক্ষা করার এই সতর্কতাগুলো উল্টো তাকে এমন অনুভূতি দিতে শুরু করে যে, তিনি বছরের পর বছর ধরে গড়া নিজের বাড়ির বদলে কোনো বাধার আড়ালে বন্দি জীবনযাপন করছেন। বাড়ির চারপাশের বেড়া দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি যেসব সতর্কতা নিয়েছি তা দেখুন। আমার বাড়িটি একটি কারাগারে পরিণত হয়েছে।’
শেষ পর্যন্ত নাঈম আর সেখানে থাকতে পারেননি। কিছু আসবাবপত্র বাড়িতে তোলার পর তিনি এবং তার ছেলে সেখানে মাত্র চার থেকে পাঁচ রাত কাটিয়েছিলেন। এরপরই তারা বাড়িটি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন।
নিজের তৈরি বাড়িতে নতুন জীবন শুরুর পরিবর্তে নাঈম তাইবেহতে তার বাবার পুরনো ভিটায় ফিরে যান। তবে শুধু বাড়ি ছাড়া নয়, ফিলিস্তিনে তার পরিবারের ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
নাঈম জানান, পশ্চিম তীরের বিরজেইত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করা তার দুই ছেলে এখন দেশত্যাগের কথা ভাবছে। তারা বাবার কাছে পাসপোর্ট সংগ্রহের অনুরোধ জানিয়েছে যাতে তারা সবাই একসঙ্গে দেশ ছেড়ে যেতে পারেন। নাঈম আরও জানান, পরিবারের ওপর হামলার ঘটনার পর তার বড় মেয়ে ইতিমধ্যে ফ্রান্সে চলে গেছেন এবং সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছেন।
নাঈম বলেন, ‘আমার সন্তানেরা এখন দেশ ছাড়ার কথা ভাবছে এবং আমার ওপর চাপ দিচ্ছে যেন আমি ফিলিস্তিনি পাসপোর্ট সংগ্রহ করে তাদের সঙ্গে চলে যাই।’
পরিবারটির বাস্তুচ্যুতির ঘটনার পর ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্সিয়াল হাই কমিটি ফর চার্চ অ্যাফেয়ার্স তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। কমিটি জানায়, দখলদারদের ধারাবাহিক ‘হুমকি ও হামলার’ কারণে নাঈমের পরিবার বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।
তাইবেহ অঞ্চলের ল্যাটিন চার্চ অব দ্য রিডিমারের যাজক বাশার ফাওয়াদলেহ জানান, নাঈমের ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। চলাচলে বিধিনিষেধ এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতির পাশাপাশি দখলদারদের অব্যাহত হামলার কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা যে চাপের মুখে পড়ছেন এটি তারই প্রতিফলন।
ফাওয়াদলেহ বলেন, ‘এই নাগরিক সেই ফিলিস্তিনির প্রতিনিধিত্ব করছেন, যিনি নিজের মাটিতে থাকতে চান এবং নিজের ঘরে বাঁচতে চান।’
ফাওয়াদলেহ জানান, গত তিন বছরে তাইবেহ থেকে ১৬টিরও বেশি পরিবার চলে গেছে এবং আরও বহু পরিবার ও তরুণ বর্তমানে দেশ ছাড়ার কথা ভাবছে। এর আগে আগস্টে ফাওয়াদলেহ সতর্ক করেছিলেন যে দখলদারদের হামলা তাইবেহের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ছে এবং তারা বাড়িঘর, কৃষিজমি ও আয়ের উৎসের ওপর আঘাত হানছে।
এই হামলাগুলো কেবল খ্রিষ্টানদের লক্ষ্য করেই হচ্ছে কি না জানতে চাইলে তিনি জানান, বিষয়টি ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়েও অনেক বড়। ফাওয়াদলেহ বলেন, ‘যারা নিজেদের মাটিতে টিকে থাকতে চায় এবং সেখানে জীবনযাপন চালিয়ে যেতে চায়, মূলত সেই ফিলিস্তিনিদেরই সুপরিকল্পিতভাবে নিশানা করা হচ্ছে।’
ফাওয়াদলেহ আরও উল্লেখ করেন, নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক বাসিন্দা রাতের বেলা তাদের বাড়িঘর, জমিজমা ও এলাকা পাহারা দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.