ধ্বংসস্তূপে পরিণত গাজা: স্যাটেলাইট চিত্রে ভয়াবহ বাস্তবতা
- Details
- by আন্তর্জাতিক ডেস্ক
অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের প্রায় তিন বছরব্যাপী আগ্রাসনে সৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে নতুন গুগল ম্যাপসের স্যাটেলাইট চিত্রে। এতে দেখা যায়, একের পর এক এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং প্রধান সড়কগুলোর অস্পষ্ট রেখা ছাড়া আর প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই। ফলে গাজার এক এলাকা থেকে অন্য এলাকার পার্থক্য করা এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ ফসলি জমি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে এবং শতবর্ষ পুরোনো উপাসনালয়গুলো ক্ষতিগ্রস্ত বা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের স্যাটেলাইট সেন্টারের (ইউএনওস্যাট) সাম্প্রতিক এক মূল্যায়নে জানা গেছে, প্রায় এক বছর আগে একটি তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর হওয়ার পরও পুরো গাজাজুড়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত কাঠামোর সংখ্যা ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘের সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএর তথ্যমতে, গাজার প্রায় ৮২ শতাংশ স্থাপনা বা প্রায় ২ লাখ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।
গুগল ম্যাপসে সম্প্রতি প্রকাশিত স্যাটেলাইট চিত্র ব্যবহার করে আল জাজিরা যুদ্ধপূর্ব গাজার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেছে। এতে দক্ষিণের রাফাহ থেকে শুরু করে উত্তর গাজা পর্যন্ত পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। রাফাহর চিত্রগুলো চলতি বছরের হলেও উত্তর গাজার চিত্রগুলো ২০২৪ ও ২০২৫ সালের।
গাজার সর্বদক্ষিণের শহর রাফাহ পুরো উপত্যকা থেকে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের প্রধান আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের মে মাসে সেখানে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর প্রায় ১০ লাখ মানুষ এলাকা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। তাদের বেশিরভাগই বারবার বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন এবং রাফাহতে ইউএনআরডব্লিউএর আশ্রয়কেন্দ্রগুলো খালি হয়ে যাওয়ায় তারা মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ ও রাফাহর ঠিক উত্তরে অবস্থিত খান ইউনিসের দিকে সরে যেতে বাধ্য হন। পশ্চিম রাফাহর একসময়ের ঘনবসতিপূর্ণ তাল আস-সুলতান এলাকাটি প্রায় পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, যেখানে একসময় ঘরবাড়ি ছিল, সেখানে এখন বালুর স্তূপ ছাড়া আর কিছুই নেই।
রাফাহ ও খান ইউনিস অঞ্চলের উপকূলজুড়ে বিস্তৃত আল-মাওয়াসি একসময় কৃষিজমি ও বালুকাময় জনবিরল এলাকা ছিল। যুদ্ধের শুরুর দিকে ইসরায়েল এটিকে ‘মানবিক অঞ্চল’ হিসেবে ঘোষণা করে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের সেখানে আশ্রয় নেওয়ার নির্দেশ দেয়। ২০২৪ সালের মে মাসে ইসরায়েল রাফাহ শহরে আগ্রাসনের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘যদি তারা রাফাহতে প্রবেশ করে, তবে আমি অস্ত্র সরবরাহ করব না।’ তবে ইসরায়েল সেই অভিযান অব্যাহত রাখে এবং আরও লাখ লাখ মানুষকে আল-মাওয়াসিতে ঠেলে দেয়। এরপর থেকে এলাকাটিতেও বারবার বোমাবর্ষণ করা হয়েছে। সর্বশেষ স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, একসময়ের ফাঁকা এলাকাটি এখন তাঁবুতে ঢেকে গেছে এবং অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গা না থাকা পরিবারগুলোতে উপচে পড়ছে।
ইউএনওস্যাটের ২০২৫ সালের অক্টোবরের মূল্যায়ন অনুযায়ী, খান ইউনিস জেলায় সবচেয়ে বেশি ৫১ হাজার ৮৮৫টি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই জেলাটি গাজার অন্যতম প্রধান কৃষি কেন্দ্র ছিল এবং গাজা উপত্যকার মধ্যে এখানেই সবচেয়ে বেশি ফসলি জমি নষ্ট হয়েছে। খান ইউনিসের মা’আন এলাকার ইন্দোনেশিয়ান ইস্তিকলাল মসজিদটি পুনরায় চালুর দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে যুদ্ধের সময় ধ্বংস করে দেওয়া হয়।
ইউএনওস্যাটের তথ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে গাজা জেলা, যেখানে ৫১ হাজার ৫৩০টি কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এর মধ্যে কেবল গাজা সিটিতেই রয়েছে ৪১ হাজার ৬৬৩টি। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে গাজা সিটির বন্দর, যা একসময় প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার মানুষের মৎস্য শিল্পের প্রধান কেন্দ্র ছিল। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা জানিয়েছে, বন্দরটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এর বেশিরভাগ মাছ ধরার নৌকা ধ্বংস হয়ে গেছে।
জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর গাজা জেলায় ফসলি জমির সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে, যার পরিমাণ ২০২৫ সালের জুলাই নাগাদ ৯৪ শতাংশ। যুদ্ধ চলাকালে বেইত লাহিয়া, জাবালিয়া ও উত্তরের অন্যান্য জনপদগুলো বারবার ইসরায়েলি সামরিক অভিযান, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এবং মানবিক সহায়তার ওপর কঠোর বিধিনিষেধের মুখে পড়ে। গাজার আটটি শিবিরের মধ্যে সবচেয়ে বড় জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরটি ধ্বংস হয়ে গেছে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, এই শিবিরের পুরো ব্লকগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে গাজায় ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও বহু মানুষ নিখোঁজ থাকায় প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। গত বছরের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পর থেকেও ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং প্রায় ৫ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন।
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.