আপনি পড়ছেন

হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি তেলবাহী জাহাজের চলাচল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। ফলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সাত মাসের সংঘাত বন্ধে মধ্যস্থতাকারীদের প্রচেষ্টার মধ্যেই কৌশলগত এই জলপথের ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

হরমুজ প্রণালীতে কি নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে ইরান?
হরমুজ প্রণালী

ট্যাঙ্কার ট্র্যাকিং ওয়েবসাইটগুলোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল ক্রমাগত বাড়ছে। কয়েকটি হিসাব অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল ও পেট্রোলিয়াম প্রবাহ এখন প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের মুখে থাকা ইরানের অর্থনীতি আগে থেকেই তীব্র নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত। চলমান লড়াই বন্ধ করে নিজেদের অনুকূলে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে তেল প্রবাহের এই পুনরুদ্ধার তেহরানের দরকষাকষির সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালীতে এখনই পূর্ণ স্বাভাবিকতা ফিরে আসবে বা ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকটের মুখে ইরান সহজে নতি স্বীকার করবে—এমনটি ভাবা ভুল হবে।

ওয়েলথ ক্লাবের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ সুজানা স্ট্রিটার আল জাজিরাকে বলেন, ‘হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন শুরু হওয়া উৎসাহব্যঞ্জক হলেও এই প্রবাহ এখনও পুরোপুরি নিরাপদ বা নিশ্চিত বলে বিবেচিত হচ্ছে না, বিশেষ করে বিস্তৃত সংঘাতের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত।’

এছাড়া বিশ্ববাজারের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রেও জ্বালানি তেলের দাম এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। সেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের মুখোমুখি, যা কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই তার দলের অবস্থানকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। একই সঙ্গে তেলবাহী জাহাজের বীমা খরচও এখনও অনেক বেশি এবং হরমুজ দিয়ে জ্বালানি পরিবহন পুরোপুরি নিরাপদ নয়। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের দরকষাকষির ক্ষমতা পুরোপুরি শেষ না হয়ে বরং কিছুটা দুর্বল হচ্ছে।

পণ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের সর্বশেষ তথ্য মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানিতে বড় ধরনের পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, সেপ্টেম্বর মাসে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি দৈনিক আনুমানিক ১ কোটি ৬৩ লাখ ২৮ হাজার ব্যারেলে পৌঁছেছে, যা যুদ্ধ শুরুর পর সর্বোচ্চ।

চলতি মাসে হরমুজ প্রণালী দিয়ে দৈনিক তেল প্রবাহ প্রায় ৯৭ লাখ ১৯ হাজার ব্যারেলে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। সৌদি আরবের কারণে এই বৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি হয়েছে; দেশটির তেল রপ্তানি আগস্টের দৈনিক ২৪ লাখ ৪৬ হাজার ব্যারেল থেকে সেপ্টেম্বরে প্রায় ৫৪ লাখ ব্যারেলে উন্নীত হয়েছে।

কেপলার জানায়, মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশ পুনরুদ্ধার হয়েছে। তবে এই পরিমাণ এখনও ফেব্রুয়ারিতে রপ্তানি হওয়া দৈনিক ১ কোটি ৯৫ লাখ ১৩ হাজার ব্যারেলের চেয়ে প্রায় ৩২ লাখ ব্যারেল কম।

এই তথ্যে ট্র্যাকিং সিস্টেম বন্ধ রেখে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করা জাহাজগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে প্রকৃত জাহাজ চলাচলের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন আনুমানিক ১২০ থেকে ১৪০টি নৌযান এই জলপথ দিয়ে চলাচল করত, যার প্রায় অর্ধেকই ছিল দৈনিক প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল বহনকারী ট্যাঙ্কার। কিন্তু সংঘাতের চূড়ান্ত পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান প্রণালীটি কার্যত বন্ধ করে দিলে দৈনিক ট্যাঙ্কার চলাচলের সংখ্যা কমে মাত্র দুটিতে নেমে আসে।

তেল প্রবাহের এই পুনরুদ্ধার তেহরানের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ওয়াশিংটনের সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে বিশ্বের অন্যতম প্রধান এই জ্বালানি প্রবেশদ্বারকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল ইরান। তবে মার্কিন নৌ অবরোধ বজায় থাকা সত্ত্বেও যদি বিপুল পরিমাণ তেল এই প্রণালী দিয়ে যেতে পারে, তবে তেহরানের দরকষাকষির শক্তি অনেকটাই হ্রাস পেতে পারে।

তবে হরমুজ প্রণালীতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হওয়ার দাবি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। বুধবার আধা-সরকারি ফারস বার্তা সংস্থাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের মুখপাত্র হোসেন মোহেব্বি জানান, হরমুজ প্রণালীতে বর্তমানে সামরিক সংঘাত চলছে।

হোসেন মোহেব্বি বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে ছোট আকারের জাহাজে আঘাত হানছি এবং সেগুলোর চলাচল প্রতিহত করছি, কিন্তু আমেরিকা কোনো জবাব দিচ্ছে না।’

এদিকে যুক্তরাজ্য মেরিটাইম ট্রেড অপারেশন্স (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, মঙ্গলবার এই জলপথে একটি অপরিশোধিত তেলের ট্যাঙ্কারসহ তিনটি জাহাজে অজ্ঞাত প্রজেক্টাইল আঘাত হেনেছে।

বিশ্ববাজারে তেলের দামও ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইরানের দরকষাকষির সক্ষমতা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। মধ্যপ্রাচ্যের রপ্তানি স্বাভাবিক হওয়ার খবরে মঙ্গলবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২.৬ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ১০২.৫৯ ডলারে নেমে আসে। তবুও সেপ্টেম্বর মাসে তেলের দাম প্রায় ১৩ শতাংশ বৃদ্ধির পথেই রয়েছে।

আইজি-র বিশ্লেষক ক্রিস বোচ্যাম্প বলেন, ‘বাজারে বাস্তব তথ্য পৌঁছাতে সময় লাগে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হতে থাকায় গতকাল তেলের দাম কিছুটা কমেছে এবং এটি আরও কমা উচিত।’

তবে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের নতুন আক্রমণ যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের সুরক্ষা ব্যবস্থা কতটা প্রতিহত করতে পারবে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েই গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ওয়েলথ ক্লাবের স্ট্রিটার বলেন, তেল প্রবাহ কিছুটা উন্নত হলেও অপরিশোধিত তেলের মূল্যে এখনও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির প্রভাব রয়ে গেছে।

তিনি আরও বলেন, ‘অঞ্চলে সম্ভাব্য ঝুঁকির কারণে তেলবাহী ট্যাঙ্কারের বীমা খরচ এখনও অনেক বেশি, যা এই জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল বাড়লেও তেল পরিবহনের সামগ্রিক ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।’

এছাড়া স্ট্রিটার সতর্ক করে উল্লেখ করেন, অপরিশোধিত তেলের পরিসংখ্যান বাস্তব পরিস্থিতির একটি অংশ মাত্র; পরিশোধিত জ্বালানি, বিশেষ করে ডিজেলের প্রবাহ এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক নয়।

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.