আপনি পড়ছেন

ইসরায়েলি বাহিনীর বর্বরোচিত হামলায় পা হারানো এক ফিলিস্তিনি বৃদ্ধের কৃত্রিম পা কেড়ে নিয়েছে দেশটির সেনারা। দীর্ঘ চিকিৎসার পর মিশর থেকে ফেরার পথে এই অমানবিক আচরণের শিকার হন তিনি। তবে তুর্কি রেড ক্রিসেন্টের সহায়তায় ফের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর নতুন স্বপ্ন দেখছেন ৬৪ বছর বয়সী মাহমুদ ফুয়াদ আল-দাহশান।

গাজার বৃদ্ধকে কৃত্রিম পা দিয়ে হাঁটতে সহায়তা তুর্কি রেড ক্রিসেন্টের
গাজায় তুর্কি রেড ক্রিসেন্টের সহায়তায় কৃত্রিম পা সংযোজনের মাপ দিচ্ছেন এক ফিলিস্তিনি বৃদ্ধ

গাজা উপত্যকায় তিন বছর ধরে চলা ইসরায়েলি আগ্রাসনে বাঁ পা হারান দাহশান। চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হতে তিনি মিশরে যান এবং সেখানে দীর্ঘ চিকিৎসার পর কৃত্রিম পা সংযোজন করিয়ে আবার হাঁটার আশা নিয়ে গাজায় ফেরেন। কিন্তু ইসরায়েলি সেনারা তার সেই কৃত্রিম অঙ্গটি কেড়ে নিলে আশার প্রদীপ নিভে যায়। পরবর্তীতে তুর্কি রেড ক্রিসেন্ট তাকে ফের হাঁটার স্বপ্ন দেখায়।

২০২৩ সালের নভেম্বরের শুরুর দিকে গাজা সিটির জাইতুন এলাকায় নিজেদের পারিবারিক বাড়িতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় গুরুতর আহত হন দাহশান। আনাদোলুকে তিনি জানান, মে মাসে মিশর থেকে ফেরার পথে ইসরায়েলি সেনারা তাকে একটি শর্ত দেয়—হয় কৃত্রিম পা অথবা তার হুইলচেয়ারের মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিতে হবে। বাধ্য হয়ে তিনি হুইলচেয়ারটি বেছে নেন এবং কৃত্রিম পা ছাড়াই গাজায় ফিরে আসেন।

দাহশান বলেন, ‘ইসরায়েলি সেনাবাহিনী কোনো কারণ না দর্শিয়েই বা এটি তাদের জন্য কীভাবে হুমকি সৃষ্টি করেছিল তা ব্যাখ্যা না করেই স্বেচ্ছাচারীভাবে কৃত্রিম পা-টি জব্দ করে।’

দাহশানের আঘাত এতটাই মারাত্মক ছিল যে চিকিৎসকদের তার বাঁ পা কেটে ফেলতে হয়। ইসরায়েলি অবরোধের কারণে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও সরবরাহের ঘাটতি থাকায় চিকিৎসকরা তাকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে পারেননি। এরপর থেকে প্রায় তিন বছর ধরে তিনি এই পরিণতি ভোগ করছেন। সেই সময় চিকিৎসার জন্য তিনি মিশরে যান এবং সেখানে তার কাটা পায়ের ক্ষতি অন্তত আংশিকভাবে পূরণ করতে একটি কৃত্রিম পা লাগানো হয়। দাহশানের কাছে কৃত্রিম পা শুধু একটি চিকিৎসাসামগ্রী ছিল না, বরং এটি ছিল তার চলাচলের সক্ষমতা ফিরে পাওয়ার এবং অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর একটি মাধ্যম। কিন্তু গাজায় ফেরার পথে সেটি ফেলে আসতে বাধ্য হওয়ায় তার সেই আশা হারিয়ে যায়। তিনি জানান, তার সঙ্গে থাকা এক আহত নারীর কৃত্রিম পা-ও একইভাবে কেড়ে নেওয়া হয় এবং তা কখনোই ফেরত দেওয়া হয়নি। ফলে তিনি যেভাবে গাজা ছেড়েছিলেন, সেভাবেই তাকে ফিরতে হয়েছে।

গাজা পৌরসভার অধীনস্থ প্রস্থেটিক্স অ্যান্ড অর্থোটিক্স সেন্টারে তুর্কি রেড ক্রিসেন্টের সহায়তায় হারানো সক্ষমতা ফিরে পাওয়ার এক নতুন যাত্রা শুরু করেছেন দাহশান। সেখানে নতুন কৃত্রিম পা তৈরির প্রস্তুতি হিসেবে কারিগররা তার পায়ের মাপ নিচ্ছিলেন। সে সময় দাহশান একটি সাধারণ অথচ গভীর অর্থপূর্ণ স্বপ্ন বুকে ধারণ করেছিলেন—হুইলচেয়ার ছাড়াই আবার দাঁড়ানো ও হাঁটা এবং আঘাতের কারণে হারানো আত্মনির্ভরশীলতা কিছুটা হলেও ফিরে পাওয়া।

তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলি দখলদার বাহিনী আমার কাছ থেকে যা কেড়ে নিয়েছিল, তার বদলে একটি নতুন কৃত্রিম পা লাগাতে এবং হুইলচেয়ারের ওপর নির্ভর না করে হাঁটাচলা করতে সহায়তার জন্য একটি নতুন চিকিৎসার যাত্রা শুরু করার আশায় আমি এখানে এসেছি।’

গাজা উপত্যকার আহত ও অঙ্গচ্ছেদ হওয়া ব্যক্তিদের কৃত্রিম অঙ্গ প্রদানের এই প্রকল্পে সহায়তা করার জন্য দাহশান তুর্কি রেড ক্রিসেন্টকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ‘গাজা উপত্যকার আহতদের সহায়তায় এই প্রকল্পে অবদান রাখার জন্য আমি তুর্কি রেড ক্রিসেন্টের ভাইদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি এবং তাদের উত্তম প্রতিদান দেওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি।’

গাজায় তুর্কি রেড ক্রিসেন্টের কার্যালয়ের পরিচালক সাদি দাবুর আনাদোলুকে জানান, এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো অঙ্গ হারানো মানুষদের চলাচলের সক্ষমতা ফিরে পেতে এবং তাদের দৈনন্দিন কাজ সম্পন্ন করতে সহায়তা করা।

দাবুর জানান, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ১০ জন আহত ব্যক্তির শরীরে কৃত্রিম অঙ্গ সংযোজন করা হয়েছে এবং পরের মাসে আরও ১০ জনের জন্য দ্বিতীয় ধাপের কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। তবে কৃত্রিম অঙ্গ লাগানোই একমাত্র চ্যালেঞ্জ নয়। দাবুর জানান, প্রকল্পটি গাজা উপত্যকায় কৃত্রিম অঙ্গ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশের চরম ঘাটতির সম্মুখীন হচ্ছে।

এই ঘাটতিকে তিনি হাজার হাজার অঙ্গচ্ছেদ হওয়া ব্যক্তির জন্য ‘বড় বাধা’ হিসেবে বর্ণনা করেন, যাদের পুনর্বাসন ও কৃত্রিম অঙ্গের সেবার প্রয়োজন, এমন এক সময়ে যখন এই ধরনের সেবার চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব চাহিদার কিছু অংশ মেটাতে গাজার প্রস্থেটিক্স অ্যান্ড অর্থোটিক্স সেন্টার তুর্কি রেড ক্রিসেন্টের সঙ্গে অংশীদারিত্বে একটি মানবিক প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যার লক্ষ্য অঙ্গচ্ছেদ হওয়া ব্যক্তিদের চলাচলের সক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া এবং তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে সাহায্য করা।

এই প্রকল্পের আওতায় থাকা ঘটনাগুলো গাজায় অঙ্গচ্ছেদ হওয়া ব্যক্তিদের সামগ্রিক সংকটের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। গাজা পৌরসভার অধীনস্থ প্রস্থেটিক্স অ্যান্ড অর্থোটিক্স সেন্টারের জনসংযোগ পরিচালক হুসনি মুহান্না জানান, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজা উপত্যকার চরম প্রতিকূল পরিস্থিতি সত্ত্বেও কেন্দ্রটি আহত ও অঙ্গচ্ছেদ হওয়া ব্যক্তিদের সেবা প্রদান অব্যাহত রেখেছে।

মুহান্না আনাদোলুকে জানান, যুদ্ধ চলাকালে ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির অধীনস্থ ‘সেহহাতি’ (Sehhaty) ব্যবস্থায় ৬ হাজারের বেশি মানুষের অঙ্গচ্ছেদের তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। তিনি জানান, প্লাস্টার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপাদানসহ গাজায় পণ্য আমদানির ওপর ইসরায়েলি নিষেধাজ্ঞার কারণে কেন্দ্রটি কৃত্রিম অঙ্গ তৈরি এবং সেবা প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের সংকটে পড়েছে।

মুহান্না বলেন, ‘অবরোধ ও সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে চ্যালেঞ্জগুলো অনেক বড়, তবে কেন্দ্রের কর্মীরা সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন যাতে যত বেশি সম্ভব আহত ও অঙ্গচ্ছেদ হওয়া ব্যক্তির কাছে পৌঁছানো যায়।’

তিনি জানান, এই অংশীদারিত্বের মাধ্যমে প্রায় ২০ জন অঙ্গচ্ছেদ হওয়া ব্যক্তিকে কৃত্রিম অঙ্গ সরবরাহ করে সহায়তা করা হবে।

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.