এলপিজির দাম বাড়ল, এবার কি কাটবে সরবরাহ সংকট?
- Details
- by ২৪ ডেস্ক
একদিকে বাজারে এলপিজির সরবরাহ সংকট, অন্যদিকে নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েক শ টাকা বেশি দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের। এর মধ্যেই বাড়ানো হয়েছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সরকারি নির্ধারিত দাম। ফলে সংকটে থাকা বাজারে ভোক্তাদের ওপর বাড়তি খরচের চাপ আরও বেড়েছে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গতকাল রোববার ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছে। এর আগে সেপ্টেম্বরে একই সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। তবে নতুন দাম ঘোষণার আগেই রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। অর্থাৎ নির্ধারিত দামের তুলনায় ভোক্তাকে দিতে হয়েছে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি।
এখন প্রশ্ন উঠেছে—দাম বাড়ানোর পর কি বাজারে এলপিজির সরবরাহও বাড়বে? ব্যবসায়ীদের একটি অংশ বলছে, আমদানি স্বাভাবিক রয়েছে। ফলে সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ আছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণে বাজারে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, সেটি পুরোপুরি কাটাতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
এলপিজি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হিসাবে, দেশে প্রায় এক কোটি মানুষ জ্বালানি হিসেবে এলপিজি ব্যবহার করেন। এর প্রায় ৮০ শতাংশই যায় রান্নার কাজে। বাকি অংশ ব্যবহৃত হয় শিল্প ও পরিবহন খাতে। দেশে ব্যবহৃত এলপিজির প্রায় ৯৯ শতাংশই আমদানি করে বেসরকারি খাত।
কিন্তু চলতি সংকটের সঙ্গে আমদানি কমে যাওয়ার সরাসরি সম্পর্ক খুঁজে পাচ্ছেন না খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। এলপিজি আমদানিকারক ও সরবরাহকারীদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) জানিয়েছে, আগস্টে দেশে ১ লাখ ৫৮ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি এসেছে। সেপ্টেম্বরে আমদানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫৬ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ গত দুই মাসে আমদানিতে বড় ধরনের পতন হয়নি।
এলপিজি আমদানি ও সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত তিন ব্যবসায়ী জানান, প্রয়োজনীয় পরিমাণ আমদানি হওয়ার পরও বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার যৌক্তিক কারণ নেই। কোন কোম্পানি কত পরিমাণ এলপিজি আমদানি করেছে এবং বাজারে কতটা সরবরাহ করেছে—এই হিসাব মিলিয়ে দেখলেই ঘাটতির প্রকৃত কারণ বের করা সম্ভব।
এলপিজি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ সেপ্টেম্বরের পর থেকেই বাজারে সরবরাহ কমতে শুরু করে। প্রথম দিকে বিভিন্ন কোম্পানি প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সরবরাহ কমিয়ে দেয়। পরে কোথাও কোথাও এই ঘাটতি ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, বিভিন্ন কোম্পানির ডিপোর সামনে ডিলারদের ট্রাক দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে থাকে। এতে পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যায়। ব্যবসায়ীদের দাবি, বাড়তি পরিবহন খরচের কারণে নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে বিইআরসি নতুন দাম ঘোষণার পর কয়েকটি কোম্পানি সরবরাহ বাড়াতে শুরু করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ফলে বাজার স্বাভাবিক হতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
লোয়াবের সভাপতি আমিরুল হক বলেন, এলপিজি আমদানি কমেনি। তাই কেউ যাতে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি করতে না পারে, সে বিষয়ে সংগঠনের পক্ষ থেকে আগেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখন বাজারে সরবরাহ বাড়বে বলে আশা করছেন তিনি।
সরবরাহ সংকটের মধ্যে কোনো কোনো কোম্পানি বা ব্যবসায়ী এলপিজি মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছে বিইআরসি।
এ জন্য গত শনিবার ১২টি এলপিজি আমদানিকারক কোম্পানিকে চিঠি দিয়ে পুরো মাসের আমদানি ও প্রতিদিনের সরবরাহের তথ্য চেয়েছে কমিশন। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে তথ্য জমা দিয়েছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠান এলপিজি মজুত করেছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে প্রতিদিনের সরবরাহের তথ্য নেওয়া হচ্ছে। পরে মাঠপর্যায়ে গিয়ে সেই তথ্য যাচাই করা হবে।
তার মতে, মাসের মাঝামাঝি দাম বাড়ানোর দাবি সাধারণ পরিস্থিতিতে যৌক্তিক নয়। তবে জরুরি পরিস্থিতিতে এর আগে এপ্রিলেও এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তিনি আশা করছেন, সামনের দিনগুলোতে বাজারের সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
এলপিজি আমদানিকারকদের দুজন জানান, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের কারণে এলপিজি পরিবহনকারী জাহাজের ভাড়া বেড়েছে। এ কারণে আমদানির খরচও বেড়েছে। তবে বিইআরসি নতুন মূল্য নির্ধারণের সময় এই বাড়তি ব্যয় বিবেচনায় নিয়েছে।
তাদের দাবি, নতুন দামের কারণে আমদানিকারকদের জন্য পরবর্তী চালান আনার ক্ষেত্রে আগের তুলনায় সুবিধা তৈরি হয়েছে। ফলে যেসব প্রতিষ্ঠান আমদানি নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তায় ছিল, তারাও এখন সরবরাহ বাড়াতে পারবে। তবে এরই মধ্যে কিছু ব্যবসায়ী পণ্য মজুত করায় বাজারে সাময়িক ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন তারা।
১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম চলতি বছরও কয়েক দফা পরিবর্তন হয়েছে। জানুয়ারিতে এর নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ২৫৩ টাকা। ফেব্রুয়ারিতে ১০৩ টাকা বাড়ানো হলেও মার্চে দাম অপরিবর্তিত ছিল।
এরপর যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে এপ্রিলে দুই দফায় মোট ৫৯৯ টাকা দাম বাড়ানো হয়। জুনে ৫৫ টাকা এবং জুলাইয়ে ৩৫৭ টাকা কমানো হয়। আগস্টে আবার ৭০ টাকা বাড়ানোর পর সেপ্টেম্বরে ১৩ টাকা কমানো হয়েছিল। এবার এক লাফে দাম বাড়ানো হলো ২৫২ টাকা।
এর আগেও সরবরাহ সংকটের আশঙ্কাকে কেন্দ্র করে এলপিজির দাম বাড়ানোর অভিযোগ উঠেছিল। গত বছরের ডিসেম্বর ও চলতি বছরের জানুয়ারিতেও বাজারে বড় ধরনের সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছিল।
বিইআরসির নতুন নির্ধারিত দাম গতকাল সন্ধ্যা ৬টা থেকে কার্যকর হয়েছে। এখন প্রতি কেজি এলপিজির দাম ১৫৩ টাকা ৬ পয়সা। সেই হিসাবে বিভিন্ন আকারের সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হবে।
অন্যদিকে যানবাহনে ব্যবহৃত এলপিজি বা অটো গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি কেজি ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা।
তবে সরকারি দাম নির্ধারণের পরও বাজারে নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি না হওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সরবরাহ সংকট তৈরি হলেই অনেক ক্ষেত্রে সিলিন্ডারের দাম বেড়ে যায়। আবার বাড়তি দাম দিয়েও অনেক সময় প্রয়োজনীয় সিলিন্ডার পাওয়া যায় না।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন করে এলপিজি আমদানি করে রাতারাতি বাজারের ঘাটতি পূরণ করার প্রয়োজন নেই। কারণ এরই মধ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণ এলপিজি আমদানি হয়েছে।
তার অভিযোগ, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর সুযোগ নেওয়া হয়েছে। কারা এলপিজি মজুত করেছে, তা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির লাইসেন্স বাতিল করা উচিত।
এখন নজর থাকবে, নতুন দাম কার্যকরের পর আমদানিকারক ও সরবরাহকারীরা কত দ্রুত বাজারে সরবরাহ বাড়াতে পারে। পাশাপাশি বিইআরসির তদন্তে মজুত বা কৃত্রিম সংকটের কোনো প্রমাণ মেলে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ আমদানি স্বাভাবিক থাকার পরও যদি বাজারে সরবরাহ ঘাটতি থেকে যায়, তাহলে সংকটের প্রকৃত কারণ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.