আকাশছোঁয়া জীবনযাত্রার ব্যয়ে দিশেহারা ইয়েমেনের জনগণ
সরকারি বাহিনী ও হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ার প্রেক্ষাপটে ইয়েমেনে লাখ লাখ মানুষ যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে আরও এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর বড় অংশের বেতন বকেয়া বা অনিয়মিত হয়ে পড়া এবং পণ্য ও সেবার মূল্য ক্রমাগত বাড়ায় দেশটির অর্থনৈতিক দুর্দশা চরম আকার ধারণ করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিভক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা, যা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মধ্যে অর্থ লেনদেনকে ক্রমশ জটিল করে তুলেছে।

দক্ষিণাঞ্চলের এডেন থেকে শুরু করে মারিবের বাস্তুচ্যুত পরিবার কিংবা সানার বেতনহীন সরকারি চাকরিজীবী—সবাইকে এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচের ক্ষেত্রে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। আয়ের তুলনায় ব্যয় মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ মৌলিক চাহিদা পূরণেও হিমশিম খাচ্ছে।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের অন্তর্বর্তীকালীন রাজধানী এডেনে বাজারে পণ্যের অভাব না থাকলেও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। খাদ্য, বাসাভাড়া, স্বাস্থ্যসেবা ও যাতায়াত খরচের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না কর্মীদের বেতন। ফলে মাসের শেষে তাদের হাতে প্রায় কোনো অর্থই অবশিষ্ট থাকে না। এর প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে ক্রেতাদের ক্রয়তালিকায়; তারা এখন তুলনামূলক সস্তা ও অল্প পরিমাণের পণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
এডেনের সরকারি কর্মচারী বুশরা আব্দুল্লাহ আব্দুলওয়ারিশ জানান, খোলাবাজারের বিনিময় হার অনুযায়ী তিনি মাসে ৭৮ হাজার ইয়েমেনি রিয়াল (৫০ মার্কিন ডলার) আয় করেন। অথচ ইয়েমেন ইকোনমিক ট্র্যাকিং ইনিশিয়েটিভের হিসাব অনুযায়ী, সরকার নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে একটি সাধারণ পরিবারের শুধু খাবারের খরচই প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার ৩৬৬ রিয়াল (৮৩ মার্কিন ডলার)। এর সঙ্গে বাসাভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসাসহ অন্যান্য পারিবারিক ব্যয় যোগ করলে পরিস্থিতি আরও শোচনীয় হয়ে ওঠে।
বুশরার মতো সাধারণ মানুষের এই অর্থনৈতিক সংকট স্পষ্ট করে দেয় যে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধ দেশটির অর্থনীতিকে কীভাবে ধ্বংস করেছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকে দেশটিতে প্রকৃত মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রায় ৫৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
২০১৪ সালে রাজধানী সানা দখলের পর থেকে হুতিরা নিজস্ব আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে। এর ফলে সরকার ও হুতিদের মধ্যে দেশের আর্থিক ব্যবস্থার বিভাজন, তেল রপ্তানি ব্যাহত হওয়া এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার পরিমাণ কমে যাওয়া সামগ্রিক অর্থনীতির এই পতনে ভূমিকা রেখেছে।
আল জাজিরাকে বুশরা বলেন, ‘উচ্চমূল্যের কারণে বহু পরিবার অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা প্রায় পুরোপুরি বাদ দিতে এবং মাংসের মতো ব্যয়বহুল পুষ্টিকর খাবার কেনা কমাতে বাধ্য হয়েছে।’ তিনি আরও জানান, অনেক পরিবার অল্প পরিমাণে খাবার কিনছে এবং অনেকেই ধারদেনা বা বাকিতে কেনাকাটা করে দিনাতিপাত করছে।
মূল্যবৃদ্ধির এই প্রভাব কেবল অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানেই নয়, মানুষের কেনাকাটার ধরনেও স্পষ্ট ফুটে উঠছে। এডেনের মনসুরা জেলার একটি শপিং সেন্টারের কর্মী আয়মান আল-মাকতারি জানান, তার দোকানে আসা ক্রেতারা এখন অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র খুব কমই কেনেন।
চাল, চিনি, ময়দা ও ভোজ্যতেলের মতো অতি প্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রেও ক্রেতারা পণ্যটি নেওয়ার আগে কয়েক দফা দাম যাচাই করেন। আয়মান লক্ষ্য করেছেন, ক্রেতারা এখন কম পরিমাণে পণ্য কিনছেন; উদাহরণস্বরূপ, ৪০ কেজির চালের বস্তার বদলে তারা ৫ কেজির প্যাকেট বেছে নিচ্ছেন।
আয়মান আল জাজিরাকে বলেন, ‘অনেকেই এখন দিন এনে দিন খাওয়া বা সপ্তাহভিত্তিক হিসাবে জীবনযাপন করতে শুরু করেছেন।’ মাসের শেষ হওয়ার আগেই টাকা ফুরিয়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার বাকিতে পণ্য কিনছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় সার্বিক বাণিজ্যিক কার্যক্রমেও ভাটা পড়েছে। ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে এবং বিক্রি বাড়াতে এডেনের বিভিন্ন সড়ক ও শপিং সেন্টারের দোকানগুলোর কাচে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মূল্যছাড়ের নানা বিজ্ঞাপন দেখা যাচ্ছে। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, পোশাক ও গৃহস্থালি সামগ্রীর মতো পণ্যগুলোর চাহিদা সবচেয়ে বেশি কমেছে, কারণ পরিবারগুলো এসব কেনাকাটা পিছিয়ে দিতে পারে। আয়ের সিংহভাগই চলে যাচ্ছে খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও যাতায়াত খাতে।
দ্রব্যমূল্যের চাপ কিছুটা কমাতে মে মাসে সরকারি কর্মচারীদের জন্য ২০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা অনুমোদন করে ইয়েমেন সরকার। তবে এই ভাতা মোট বেতনের পরিবর্তে মূল বেতনের ভিত্তিতে হিসাব করায় অনেকের ক্ষেত্রে প্রকৃত বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল খুবই সামান্য।
সরকারি কর্মচারী বুশরা জানান, এই ভাতা বৃদ্ধি তার পরিবারের আর্থিক অবস্থার কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নতি করতে পারেনি। তিনি এই ভাতাকে ‘একটি সাময়িক ব্যথানাশক ওষুধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন, যা মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তব সংকটের প্রতিফলন ঘটায় না।
বুশরার এই অভিজ্ঞতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। অক্টোবরের শুরুর দিকে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি জানায়, তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী সরকার নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর ৭৪ শতাংশ পরিবার তাদের মৌলিক খাদ্য চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে।
সানার পূর্বে অবস্থিত সরকার নিয়ন্ত্রিত মারিব শহরেও এই সংকটের তীব্রতা স্পষ্ট। শহরটিতে লাখ লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। যুদ্ধ চলাকালে জনসংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় পূর্বে তুলনামূলক শান্ত থাকা এ শহরের আবাসন, কর্মসংস্থান ও নাগরিক সেবার ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছে। সেখানকার সরকারি কর্মচারীদের বেতন পাওয়ার প্রথম কয়েক দিনের মধ্যেই তা শেষ হয়ে যায়।
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.