আপনি পড়ছেন

ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়ানোর যে সিদ্ধান্ত হিজবুল্লাহ নিয়েছিল, তা লেবাননের রাজনীতিকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলা এবং গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক আগ্রাসন শুরুর পরদিনই এ সংঘাতে যোগ দেয় লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠীটি। বিশ্লেষকদের মতে, তৎকালীন ওই সিদ্ধান্তের পরিণতিতেই দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।

যেভাবে বদলে গেল লেবানন ও হিজবুল্লাহর রাজনীতি
হিজবুল্লাহর প্রয়াত নেতা হাসান নাসরাল্লাহর ছবি সংবলিত ব্যানারের সামনে সমর্থকদের সমাবেশ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধের আগে ইসরায়েলের গোয়েন্দা তৎপরতা কতটা গভীরে পৌঁছেছিল, তা হিজবুল্লাহ সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারেনি। এর চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসের রক্তক্ষয়ী পেজার বিস্ফোরণ এবং হিজবুল্লাহর মহাসচিব হাসান নাসরাল্লাহসহ শীর্ষ নেতৃত্বের বড় একটি অংশের হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের অনাবাসিক জ্যেষ্ঠ ফেলো ও হিজবুল্লাহ বিষয়ক একটি বইয়ের লেখক নিকোলাস ব্ল্যানফোর্ড আল জাজিরাকে বলেন, ‘হিজবুল্লাহ এমন এক ঘূর্ণিপাকে পড়েছিল যার সমাপ্তি ঘটে তাদের শীর্ষ নেতৃত্বের অবসান এবং দক্ষিণ লেবাননে আগ্রাসনের মাধ্যমে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘এটি হিজবুল্লাহর জনসমর্থনে বড় ধাক্কা দেয় এবং জোসেফ আউনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া ছাড়াও একটি নতুন সরকার গঠনে ভূমিকা রাখে, যা এই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তুলনামূলক কঠোর অবস্থান নিয়েছে।’

এসব সিদ্ধান্তের ফলে হিজবুল্লাহ রাজনৈতিকভাবে বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। সমালোচকদের দাবি অনুযায়ী গোষ্ঠীটি পুরোপুরি পরাজিত না হলেও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, লেবাননে পূর্বে তাদের যে একচ্ছত্র রাজনৈতিক ও সামরিক আধিপত্য ছিল, তা আর বজায় নেই।

লেবাননের বড় শিয়া সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী হিজবুল্লাহ ৭ অক্টোবরের আগে দেশটির সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামরিক পক্ষ হিসেবে বিবেচিত হতো। ইরান-সমর্থিত এই দলটির প্রভাব পুরো অঞ্চলেই বিস্তৃত ছিল। সিরিয়ার আল-আসাদ সরকারের অন্যতম প্রধান মিত্র হিসেবে তারা সরকারবিরোধীদের কাছ থেকে অঞ্চল পুনরুদ্ধারে বড় ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি ইরাক ও ইয়েমেনের মতো দেশগুলোর বিভিন্ন মিত্রদের সঙ্গেও তাদের দৃঢ় যোগাযোগ ছিল।

লেবাননের নির্বাচনী রাজনীতিতেও হিজবুল্লাহর বড় নিয়ন্ত্রণ ছিল। দেশটির সরকার গঠন কিংবা পতনেও গোষ্ঠীটি প্রভাব বিস্তার করত। বিরোধীদের আন্দোলন দমন করতে তারা সমর্থকদের মাঠে নামাতেও পিছপা হয়নি। ১৯৯০ সালে লেবাননের ১৫ বছরের গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকেই তারা রাজনৈতিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান পক্ষ হয়ে ওঠে। ২০১৯ সালে দেশটির সাম্প্রদায়িক ব্যবস্থার সংস্কার চেয়ে সাধারণ মানুষ বিক্ষোভে নামলে বৈরুতের রাস্তায় তাদের প্রতিহত করতে দলটির সমর্থকদের নামানো হয়েছিল।

২০২৩ সালের অক্টোবরের আগের মাসগুলোতে হিজবুল্লাহর আত্মবিশ্বাস স্পষ্ট দেখা যায়। ব্ল্যানফোর্ড উল্লেখ করেন, দক্ষিণ লেবাননে তাদের সামরিক কুচকাওয়াজ এবং শেবা ফার্মসে তাবু খাটানোর ঘটনাগুলো ছিল এর প্রমাণ। ওই অঞ্চলটিকে লেবানন তাদের ভূখণ্ড হিসেবে বিবেচনা করে, যা বর্তমানে ইসরায়েলের দখলে রয়েছে।

সে সময় ইসরায়েল সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অস্থির ছিল এবং নাসরাল্লাহ তার বিভিন্ন ভাষণে ইসরায়েলের দ্রুত পতনের ভবিষ্যদ্বাণী করছিলেন। পরবর্তী সময়ে লেবাননে ‘সমর্থন যুদ্ধ’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া এই সংঘাতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি আনুষ্ঠানিকভাবে আসে ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর।

দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়েহ অঞ্চলের রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাদ দিলাতি আল জাজিরাকে বলেন, ‘৭ অক্টোবরের ঘটনা এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল যা সামলানোর প্রস্তুতি লেবাননের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ছিল না।’ তিনি আরও বলেন, ‘কোনো মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত বা সরকারি ঐকমত্য ছাড়াই হিজবুল্লাহ ৮ অক্টোবর গাজার সমর্থনে ফ্রন্ট খোলে। এমনকি দক্ষিণ লেবাননের যেসব বাসিন্দা এই পদক্ষেপে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং এখনও হচ্ছেন, তাদের অবস্থানের কথাও বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।’

দিলাতি আরও বলেন, ‘হিজবুল্লাহ ৮ অক্টোবর সমর্থনের ফ্রন্ট খুলেছিল সম্পূর্ণভাবে নিজেদের শক্তির জায়গা থেকে পরিচালনার বিশ্বাস নিয়ে। দীর্ঘ বছর ধরে নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, জটিল সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক এবং তেল আবিবের প্রতিটি ভবনে আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করায় দক্ষিণাঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষও তাদের এই শক্তির ওপর আস্থা রেখেছিল।’

পরবর্তী ১১ মাস ধরে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ একে অপরের ওপর হামলা চালায়। তবে হিজবুল্লাহর প্রতিটি হামলার বিপরীতে ইসরায়েল লেবাননে পাঁচগুণেরও বেশি আক্রমণ চালিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দক্ষিণ লেবানন ও উত্তর ইসরায়েল থেকে হাজার হাজার মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যায়।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েল একতরফাভাবে হামলার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এরপর ইসরায়েলি হত্যাযজ্ঞ ভয়াবহ রূপ নেয় এবং শুধু ২৩ সেপ্টেম্বরই প্রায় ৫০০ মানুষ প্রাণ হারান। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে লেবাননের কর্মকর্তাদের বরাতে বলা হয়, নাসরাল্লাহ যখন যুদ্ধবিরতি মেনে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ঠিক তখনই ইসরায়েল তাকে হত্যার নির্দেশ দেয় এবং বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলি খালি করার নির্দেশ জারি করে।

ব্ল্যানফোর্ড এ বিষয়ে বলেন, ‘নাসরাল্লাহ যখন যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হচ্ছিলেন, তখন ইসরায়েল তীব্র আক্রমণাত্মক অবস্থানে ছিল এবং তারা আগের স্থিতাবস্থায় ফিরে যেতে রাজি ছিল না।’

পরবর্তীতে ২০২৪ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে আগ্রাসন চালায়। নভেম্বরে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও তারা লেবাননের অভ্যন্তরে দুই মাসেরও বেশি সময় অবস্থান করে। যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে বাড়িঘর ও অবকাঠামো ধ্বংস অব্যাহত রাখে এবং দেশটির পাঁচটি স্থান থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে অস্বীকৃতি জানায়। একই সময়ে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রতিবেশী সিরিয়ায় আল-আসাদ সরকারের পতন ঘটে, যা হিজবুল্লাহর জন্য আরেকটি বড় ধাক্কা ছিল। এর ফলে ইরান থেকে অস্ত্র ও অর্থ পাওয়ার স্থলপথগুলো বন্ধ হয়ে যায়।

পরবর্তী ১৪ মাসে ইসরায়েল ১০ হাজারেরও বেশি বার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে। এরপর ২০২৬ সালের মার্চে তারা আবারও লেবাননে আক্রমণ জোরদার করে। টানা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জবাবে এক বছরেরও বেশি সময় পর হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে রকেট নিক্ষেপ করলে এই নতুন দফার হামলাগুলো শুরু হয়।

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.