‘নাজা’ তথ্যচিত্রে ইসরায়েলি সেনাদের ভাষ্যে ফ্রান্সে তীব্র ক্ষোভ
গাজায় ইসরায়েলের বেসামরিক মানুষ হত্যার নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরা ‘নাজা’ নামের একটি প্রামাণ্যচিত্র দেখে গভীর মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ হয়েছেন ফরাসি দর্শকেরা। এতে ফিলিস্তিনি ভুক্তভোগীদের মানুষ হিসেবে বিবেচনা না করে স্রেফ সংখ্যায় নামিয়ে আনার বিষয়ে ইসরায়েলি সেনাদের খোলামেলা স্বীকারোক্তি প্রদর্শন করা হয়।

ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ানের প্রযোজনায় এবং অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র নির্মাতা ইউভাল আব্রাহাম ও র্যাচেল জোরের যৌথ পরিচালনায় নির্মিত এই প্রামাণ্যচিত্রটি ১২ ও ১৩ অক্টোবর ফ্রান্সের প্রেক্ষাগৃহগুলোতে প্রদর্শিত হয়। মুক্তির প্রথম দিনেই প্যারিসে এটি দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করে এবং প্রদর্শনীর অধিকাংশ টিকিট বিক্রি হয়ে যায়। রাজধানীর দুটি প্রেক্ষাগৃহে ‘নাজা’ দেখা ফরাসি দর্শকেরা আনাদোলুর কাছে তাদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।
কেনজি নামের এক ফরাসি দর্শক বলেন, প্রামাণ্যচিত্রটিতে বেসামরিক হতাহত বোঝাতে ব্যবহৃত সামরিক পরিভাষা ‘নাজা’র অর্থ ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যা তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। তিনি জানান, ইসরায়েলি সেনারা বারবার এমন সব সংখ্যা ও হিসাবের কথা বলছিল, যার প্রায় প্রতিটিই ছিল গাজায় নিহত বেসামরিক মানুষের সংখ্যা।
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে কেনজি বলেন, ‘আমরা জানি সেখানে কী ঘটছে, আমরা এ নিয়ে কথা বলি এবং তা দেখি, কিন্তু বিষয়টি এই মাত্রার তা জানা ছিল না। আর সেখানে খোদ ইসরায়েলি সেনাদের এমন বিষয়ে কথা বলতে দেখা সত্যিই অত্যন্ত বেদনাদায়ক ছিল। কখনো কখনো তাদের মধ্যে অনুশোচনা টের পাওয়া যাচ্ছিল, আবার কখনো একেবারেই নির্লিপ্ততা দেখা গেছে। তারা অত্যন্ত শীতলভাবে কথা বলছিল, যা আমাকে গভীরভাবে বিচলিত করেছে। তবে আমার মনে হয় এটি খুব চমৎকারভাবে নির্মিত হয়েছে এবং দ্রুতই শেষ হয়ে গেছে।’
সেনারা গাজায় তাদের কর্মকাণ্ডকে ভিডিও গেমের সঙ্গে তুলনা করেছে উল্লেখ করে কেনজি বলেন, ‘কাদের হত্যা করা হবে তা শনাক্ত করতে তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের কথা বলে। একটা পর্যায়ে দেখা যায়, তারা কতজন মানুষ হত্যা করতে যাচ্ছে, তথাকথিত আনুষঙ্গিক ক্ষতি বা নাজার মাত্রা কতটা—সেই হিসাব করাও বন্ধ করে দেয়।’
তিনি উল্লেখ করেন, সেনারা ঘন ঘন একটি ‘সিস্টেম’ বা কাঠামোর কথা বলছিল। কেনজি বলেন, ‘মনে হচ্ছিল তাদের এমনভাবে ব্রেনওয়াশ করা হয়েছে এবং বিশ্বাস করানো হয়েছে যে তারা সঠিক পক্ষে আছে, যতক্ষণ না তারা নিজেরাই উপলব্ধি করতে পেরেছে যে তারা যা করছিল তা ছিল অত্যন্ত জঘন্য।’
কেনজি স্মরণ করেন, সেনারা বারবার বলছিল তারা ‘কেবল শত্রুকে নির্মূল করতে চেয়েছিল।’ এ প্রসঙ্গে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘তারা স্পষ্টভাবে বলেছে যে তাদের সেই শত্রু ছিল ৩ থেকে ৬ বছর বয়সী শিশু ও নারীরা, যারা এই নৃশংসতার কোনোটিরই যোগ্য ছিল না। প্রায়ই তারা কোনো শত্রু নেতাকে নির্মূল করতে চেয়েছিল, অথচ শেষ পর্যন্ত সেই ব্যক্তিকে ছাড়া তার পুরো পরিবারকেই নির্মমভাবে হত্যা করেছে।’ ইসরায়েলি পরিচালকদের সাহসের প্রশংসা করে তিনি আরও বলেন, ‘আমার মনে হয় এ ধরনের একটি সাহসী প্রকল্প শুরু করার জন্য নির্মাতারা প্রশংসার দাবিদার।’
ইওনা নামের ২৩ বছর বয়সী এক ফরাসি দর্শক বলেন, ‘আমার মনে হয় এই চলচ্চিত্রটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই দৃষ্টিকোণটি তুলে ধরা খুব জরুরি ছিল, কারণ আমরা প্রায়ই ভুক্তভোগীদের জবানবন্দি শুনি, কিন্তু এখানে আক্রমণকারীদের প্রত্যক্ষ বক্তব্য পাওয়া গেছে, যারা পুরো পরিস্থিতিটিকে বাস্তব শব্দে রূপ দিয়েছে।’
তিনি মনে করেন, এই প্রামাণ্যচিত্র মানুষকে প্রকৃত ঘটনা বুঝতে এবং ইতিহাসের সঠিক পক্ষে অবস্থান নিতে সহায়তা করবে। চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত ভাষা ও প্রশ্নগুলো তাকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী “গণহত্যা” শব্দটি ব্যবহার করতে দ্বিধা করেননি। তিনি সরাসরি জানতে চেয়েছিলেন এটি গণহত্যা কি না, আর সেনারা জবাবে হ্যাঁ বলেছিল।’
সেনারা ভুক্তভোগীদের মানুষ হিসেবে গণ্য না করায় চরম হতাশা প্রকাশ করেন ইওনা। গাজায় মানুষের মৃত্যুর বিপরীতে তেল আবিবে স্বাভাবিক জীবনযাপনের দৃশ্যগুলো প্রামাণ্যচিত্রে তুলে ধরা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রতিটি বিষয়ই ছিল অত্যন্ত হৃদয়বিদারক।’
এ ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং সত্য তুলে ধরার সুযোগ দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ‘প্রেক্ষাগৃহে তরুণ থেকে শুরু করে প্রবীণ—সব বয়সের দর্শক উপস্থিত ছিলেন। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, এটি প্রেক্ষাগৃহের প্রত্যেককে আলোড়িত করেছে। প্রদর্শনী শেষে সেখানে এক স্তব্ধ নীরবতা নেমে আসে, যা ছিল অত্যন্ত আবেগঘন।’ তিনি সবাইকে প্রামাণ্যচিত্রটি দেখার আহ্বান জানিয়ে ‘মুক্ত ফিলিস্তিন’ স্লোগানের মাধ্যমে নিজের বক্তব্য শেষ করেন।
অ্যাডাম নামের ২৭ বছর বয়সী আরেক দর্শক জানান, পুরো প্রদর্শনী চলাকালে তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে বসেছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি এর পেছনের ইতিহাস, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং ফিলিস্তিনে চলমান বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ ও গণহত্যা সম্পর্কে অবগত ছিলাম।’ তবে ব্যবস্থার ভেতরের মানুষের মুখ থেকে এমন স্বীকারোক্তি শোনা অত্যন্ত মর্মান্তিক এবং তা এই নৃশংসতার ভয়াবহ বাস্তব রূপ উন্মোচন করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, ‘সার্বিকভাবে আমার মনে হয় প্রামাণ্যচিত্রটি খুব সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কারণ এটি বেশ কিছু গুরুতর প্রশ্ন তোলে, বিশেষ করে “নাজা” শব্দের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের চরম অমানবিকীকরণ করার বিষয়টি। পরিশেষে, ভুক্তভোগীরা কেবল একটি সংখ্যায় পরিণত হয়, যাকে তারা নিজেদের ভাষায় “আনুষঙ্গিক ক্ষতি” বলতে পছন্দ করে। মানুষকে নিছক সংখ্যায় নামিয়ে আনার বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি আঘাত করেছে।’ ফিলিস্তিনে এই আগ্রাসন ও হত্যাযজ্ঞ কেবল ২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হয়নি উল্লেখ করে তিনি ইসরায়েলি সরকারের চাপের মুখেও পরিচালকদের অটল অবস্থানের প্রশংসা করেন।
ইয়াসিন নামের আরেক ফরাসি দর্শক বলেন, বারবার সংখ্যার ওপর জোর দেওয়ার বিষয়টি ছিল এই প্রামাণ্যচিত্রের অন্যতম মর্মান্তিক দিক। আব্রাহামের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তাদের এমন একজন সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী ছিলেন যিনি বস্তুনিষ্ঠ ছিলেন, কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখেছিলেন এবং ফিলিস্তিন ও গাজায় ঘটে যাওয়া বিপর্যয়কর মানবিক পরিস্থিতিকে সঠিকভাবে তুলে ধরেছেন।’
বিপরীতে সাক্ষাৎকার দেওয়া সেনাদের আচরণে যুদ্ধের উগ্র প্রভাব স্পষ্ট ফুটে উঠেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। ইয়াসিন বলেন, ‘তেল আবিবের যে চিত্র আমরা দেখেছি, যেখানে মানুষ নিরাপদ এবং পুরোপুরি স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে—তার সঙ্গে চলচ্চিত্রের শেষের গাজার দৃশ্যের মধ্যে এক আকাশ-পাতাল বৈপরীত্য রয়েছে। গাজার দৃশ্যগুলো ছিল সরাসরি ধ্বংসস্তূপ ও যুদ্ধের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।’ তিনি যোগ করেন, ‘ছবিগুলো দেখলে মনে হবে সেখানে আর কোনো স্বাভাবিক জীবন অবশিষ্ট নেই, মানুষ কেবল বেঁচে থাকার এক চরম লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।’
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.