দাঙ্গায় উত্তাল ফ্রান্স, প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে কারফিউ
ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ থেকে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতা ও দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে রাজধানী প্যারিসসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে রাতের কারফিউ জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে কয়েকটি এলাকায় অনুমতি ছাড়া সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় আড়াই হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সহিংসতায় আহত হয়েছেন প্রায় এক হাজার পুলিশ সদস্য। খবর বিবিসি।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ থেকে এ আন্দোলনের সূত্রপাত। শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের দাবিতে গত মাসে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু হলেও পরে তাতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যুক্ত হন। সপ্তাহান্তে ব্যাপক বিক্ষোভের পাশাপাশি বিভিন্ন শহরে লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
প্যারিস পুলিশ জানিয়েছে, স্থানীয় সময় রাত ১১টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত শহরের প্লাস দ্য লা রিপাবলিক ও লে আল শপিং এলাকায় কারফিউ কার্যকর থাকবে। সপ্তাহান্তে এসব এলাকায় বিক্ষোভকারীদের বড় জমায়েত হয়েছিল। রাজধানীর কেন্দ্রীয় অংশের আরও কয়েকটি এলাকায় অনুমতি ছাড়া সমাবেশও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এ ছাড়া দক্ষিণাঞ্চলের মার্সেই, বোর্দো, নিস ও লিওঁ এবং উত্তরাঞ্চলের লিলসহ কয়েকটি শহরে আংশিক কারফিউ জারি করা হয়েছে। শহরভেদে তরুণদের চলাচল ও জনসমাগমে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
এর আগে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরঁ নুনেজ স্বীকার করেন, কয়েকটি শহরে পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে পুলিশ হিমশিম খেয়েছে এবং কোথাও কোথাও নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। সহিংসতা মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি নিয়ে বিরোধীদের সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি। রোববার পদত্যাগের চেষ্টা করলেও প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ তা গ্রহণ করেননি।
প্রেসিডেন্টের দপ্তর এলিসি প্রাসাদ জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নেতৃত্বে ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রয়োজন বিবেচনায় নুনেজকে দায়িত্বে রাখা হয়েছে। তবে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও পরিস্থিতি আগাম অনুমানের ক্ষেত্রে যেসব ঘাটতির কথা সামনে এসেছে, সেগুলো নিয়ে তাকে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে।
সোমবার সংকট মোকাবিলায় বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী কারফিউ জারির ক্ষমতা স্থানীয় মেয়রদের দেওয়া হচ্ছে। তবে কোন কোন শহরে এ ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট করে কিছু জানাননি। দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি তিনি।
সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পুনর্গঠনে সরকারি অর্থ সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতির জন্য দায়ীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। দাঙ্গা ও লুটপাটের কারণে যেসব কর্মী কাজে যেতে পারেননি, তাদের সহায়তায় আংশিক বেকারত্ব তহবিল গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সহিংসতার ঘটনায় আড়াই হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুলিশের ব্যবহৃত একটি গ্রেনেড বিস্ফোরিত হলে এক বিক্ষোভকারীর হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এ ছাড়া সংঘর্ষে প্রায় এক হাজার পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।
দাঙ্গার পেছনে কারা উসকানি দিয়েছে, তা শনাক্ত করতে তদন্ত জোরদার করেছে সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজ জানিয়েছেন, প্রায় ২০০ তদন্তকারী নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করছেন। তাঁদের লক্ষ্য, সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা।
এদিকে ফ্রান্সের চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি জানিয়েছে, সপ্তাহান্তের সহিংসতায় দেশজুড়ে দুই হাজারের বেশি দোকান ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংগঠনটির প্রধান আলাঁ দি ক্রেসেনজোর ধারণা, ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ কয়েক শ মিলিয়ন ইউরো হতে পারে।
মার্সেইয়ের ব্যবসায়ীরাও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। শহরটির চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি জ্যঁ-লুক শোভাঁ বিবিসিকে বলেন, অনেক দোকানমালিক ব্যবসা টিকিয়ে রাখা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
লুট হওয়া পণ্য অনলাইন বিক্রয় প্ল্যাটফর্মে বিক্রির জন্য তোলা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। ফ্রান্সের দুই মন্ত্রী বিষয়টি সামনে এনেছেন। অনলাইন মার্কেটপ্লেস ভিন্টেড জানিয়েছে, চুরি করা পণ্য বিক্রি বা বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া তাদের নীতিমালায় নিষিদ্ধ। এ ধরনের বিজ্ঞাপন শনাক্ত করে সরিয়ে ফেলতে এবং সন্দেহজনক পণ্যের ওপর নজরদারি বাড়াতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে।
সপ্তাহান্তে ফ্রান্সজুড়ে প্রায় পাঁচ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে। প্যারিস, মার্সেইসহ বড় শহর এবং ছোট জনপদগুলোতেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। কিছু স্থানে কালো পোশাক ও মুখোশ পরা ব্যক্তিদের গাড়ি ও ভবনে আগুন দেওয়া এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাট চালাতে দেখা যায়।
মধ্য ফ্রান্সের লিমোজ শহরে শনিবার অগ্নিসংযোগের ঘটনায় উনিশ শতকে নির্মিত ঐতিহাসিক টাউন হলটি পুড়ে যায়। আগুনে ভবনটির ঘড়ির টাওয়ার ও ছাদের অংশ ধসে পড়ে।
এ ঘটনায় বামপন্থী দল লা ফ্রঁস ইনসুমিজের ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন রাজনীতিবিদ। প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু অভিযোগ করেন, কিছু গোষ্ঠী আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পর্যন্ত দেশে অস্থিরতা জিইয়ে রাখতে চায়। তবে দলটির নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ এ অভিযোগের প্রতিবাদ জানিয়ে প্রমাণ উপস্থাপনের দাবি করেছেন। প্রমাণ দিতে না পারলে অভিযোগ প্রত্যাহার করে দুঃখ প্রকাশ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বিক্ষোভের সূত্রপাত শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের দাবিতে হলেও পরে জ্বালানির দাম, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারি সেবার অবনতি নিয়ে মানুষের ক্ষোভ আন্দোলনকে বিস্তৃত করে। শ্রমিক সংগঠন ও বিভিন্ন প্রতিবাদী গোষ্ঠী যুক্ত হওয়ায় সপ্তাহান্তে বিক্ষোভের ব্যাপ্তি আরও বাড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং কারফিউ কতটা কার্যকর হয়, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে।
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.