রুশ বাহিনীর রেকর্ড ক্ষয়ক্ষতি, অস্ত্র উৎপাদনে ইউক্রেন
চলমান যুদ্ধে রুশ বাহিনীর ওপর তীব্র আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে ইউক্রেন। দেশটির সামরিক বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, অক্টোবর মাসে রেকর্ড ৪৯ হাজার ৪০ জন রুশ সেনা হতাহত হয়েছে। ২০২৬ সালের মধ্যে প্রতি মাসে অন্তত ৫০ হাজার শত্রু সেনা নিষ্ক্রিয় করার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, কিয়েভ প্রায় তার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

এর আগে সেপ্টেম্বর মাসে সর্বোচ্চ ৪৬ হাজার ২৩০ জন রুশ সেনা হতাহতের হিসাব দিয়েছিল ইউক্রেন। গ্রীষ্ম মৌসুমের পর থেকে নিহতের এই সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, দখলদার বাহিনীকে এমন মাত্রায় ধ্বংস করতে হবে যাতে রাশিয়ার পাঠানো নতুন সেনার চেয়ে তাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেশি হয়। ইউক্রেনের আনম্যানড সিস্টেমস ফোর্সের কমান্ডার রবার্ট ব্রোভদি পরিস্থিতিটিকে ‘ব্যাপক শিল্প পর্যায়ের হত্যাযজ্ঞ’ বলে আখ্যা দেন। তবে এই হতাহতের সংখ্যা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। প্রতিটি হামলার ভিডিও প্রমাণ সংরক্ষিত রয়েছে বলে দাবি করেছে ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী।
ইউক্রেনীয় হামলায় ক্ষয়ক্ষতির বড় অংশই ঘটছে মনুষ্যবিহীন আকাশযান বা ড্রোনের কারণে। আগামী বছর ড্রোন উৎপাদন দ্বিগুণ করে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখে উন্নীত করতে ইউরোপীয় মিত্রদের কাছে অর্থায়নের অনুরোধ জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়েভগেনি খমারা। তিনি জানান, অন্য দেশে ইউক্রেনীয় ড্রোনের যৌথ উৎপাদন বাড়ানোই তাদের লক্ষ্য। পর্যাপ্ত অর্থ পেলে ড্রোন উৎপাদন তিনগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি।
রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে জটিল প্রযুক্তির চেয়ে উৎপাদনের সংখ্যাধিক্যকেই গুরুত্ব দিচ্ছে ইউক্রেন। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সের্হি বেসক্রেস্টনভ বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি যে প্রযুক্তির জটিলতার চেয়ে ব্যাপক মাত্রার উৎপাদনকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। সহজ নকশা এবং বিপুল উৎপাদন শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তিকে ছাড়িয়ে যাবে।’
কিয়েভের এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ২৮ অক্টোবর সহায়তা পদক্ষেপ নিয়েছে নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাজ্য। নেদারল্যান্ডস তাৎক্ষণিক ৫০ কোটি ইউরো মূল্যের অতিরিক্ত সামরিক সহায়তা এবং ১২০ কোটি ইউরোর অতিরিক্ত অর্থায়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম আগামী তিন বছরে তাদের সহায়তা ১ হাজার কোটি পাউন্ডে উন্নীত করেছেন, যার মধ্যে ৩০০ কোটি পাউন্ড ব্যয় হবে সরাসরি সমরাস্ত্র খাতে।
২৪ অক্টোবর ইউক্রেন জানায়, তাদের স্টারলিংক স্যাটেলাইট ব্যবস্থা পুনরায় স্বাভাবিক হয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, প্রতি ঘণ্টায় ৪০০ কিলোমিটারের বেশি গতিতেও যোগাযোগ স্থিতিশীল রয়েছে। এর আগে ১৪ অক্টোবর ইউক্রেন জানিয়েছিল, প্রায় ১৫০ কিলোমিটার গতির ওপরে ড্রোনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাচ্ছিল। ফলে ঘণ্টায় ৫০০ কিলোমিটারেরও বেশি গতিসম্পন্ন রুশ জেটচালিত ড্রোন প্রতিরোধে বিঘ্ন ঘটে। স্টারলিংকের মালিক ইলন মাস্ক প্রথমে বিষয়টি অস্বীকার করলেও ২৪ অক্টোবর জানান, ইউক্রেন যেন আক্রমণাত্মক কাজে স্টারলিংক ব্যবহার করতে না পারে, সেজন্য তিনি একটি কারিগরি ফাঁক বন্ধ করে দিয়েছেন।
তবে ইউক্রেন এখন স্টারলিংক বা পেন্টাগনের স্টারশিল্ড ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প খুঁজছে। ২২ অক্টোবর ইউক্রেন ও ফিনল্যান্ড যৌথভাবে একটি স্বাধীন সার্বভৌম সামরিক স্যাটেলাইট ব্যবস্থা গড়ে তোলার ঘোষণা দেয়। পোল্যান্ডভিত্তিক আইসিইওয়াইই (ICEYE) এবং ফিনিশ নোকিয়া জানিয়েছে, তারা এই ব্যবস্থা বাস্তবায়নে অংশীদার হিসেবে কাজ করছে, যা ২০২৮ সাল থেকে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ শুরু করবে। ২৮ অক্টোবর ডাচ প্রধানমন্ত্রী রব জেতেনের সঙ্গে স্যাটেলাইট প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা করেছেন জেলেনস্কি।
গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার জানায়, স্টারলিংকের গতি নিয়ন্ত্রণে রাখার ১০ দিনে ইউক্রেনের ড্রোন ঠেকানোর হার ৭৭ শতাংশ থেকে কমে ৭৪ শতাংশে নেমেছিল। তবে ২৯ অক্টোবর শেষ হওয়া সপ্তাহে অন্তত ৭৫ শতাংশ জেটচালিত ড্রোন ভূপাতিত করতে সক্ষম হয় ইউক্রেনীয় বিমান বাহিনী। ড্রোন প্রতিরোধ ব্যবস্থার অগ্রগতির মধ্যেই ২৯ অক্টোবর দিনিপ্রো শহরের একটি ট্রেন প্ল্যাটফর্মে রুশ ড্রোন হামলায় অন্তত ১৪ জন নিহত হন।
এদিকে ইউরোপীয় মিত্ররা প্যাট্রিয়ট ও নাসামস ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ব্যয় পরিশোধ করলেও ওয়াশিংটন তা সরবরাহে বিলম্ব করছে বলে অভিযোগ তুলেছে ইউক্রেন। ২৭ অক্টোবর কিয়েভের একটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর জেলেনস্কি বলেন, ‘প্যাট্রিয়ট ও নাসামস ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহে যে কৃত্রিম এবং দীর্ঘস্থায়ী বিলম্ব হচ্ছে, তা সরাসরি রাশিয়ার সন্ত্রাসী অভিযানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে সহায়তা করছে।’ এর আগের দিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী খমারা ইউরোপীয় মিত্রদের কাছে তাদের নিজস্ব মজুত থেকে ১০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র আগাম সরবরাহের আহ্বান জানান।
গত এক সপ্তাহে রাশিয়ার ভেতরেও পাল্টা আঘাত হেনেছে ইউক্রেন। ২৩ অক্টোবর ওরেল শহরে ক্ষেপণাস্ত্র যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা প্রোটন-ইলেক্ট্রোটেক্সের প্রধান মাইক্রোচিপ ভবনটি ইউক্রেনীয় ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ধ্বংস হয়। এ ছাড়া রকেটের কঠিন জ্বালানি প্রস্তুতকারী পাঁচটি রাসায়নিক কারখানা—নাক আজোত, তোলিয়াত্তিকাউচুক, ওমস্কি কাউচুক, এনার্জিয়া এবং ভরনেঝসিনতেজকাউচুক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে যুদ্ধবিমানের কাঠামো তৈরির কারখানা ভরনেঝ এয়ারক্রাফট কোম্পানি এবং ভিএসএমপিও-আভিসমা কারখানাতেও হামলা চালানো হয়।
যুদ্ধক্ষেত্রে নজরদারির বাইরে ইউক্রেন ভূগর্ভস্থ আক্রমণও জোরদার করেছে। ২২ অক্টোবর ইউক্রেনীয় ন্যাশনাল গার্ডের খার্তিয়া কোর একটি পরিত্যক্ত গ্যাস পাইপলাইনে রুশ অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে সফল অভিযান পরিচালনার ঘোষণা দেয়। খারকিভের দখলকৃত এলাকা থেকে সম্মুখসারির কুপিয়ানস্ক শহরে সৈন্য পাঠাতে রুশ বাহিনী পাইপলাইনটি ব্যবহার করছিল। জেলেনস্কি বলেন, ‘রুশরা আমাদের অবস্থান পার হতে ভূগর্ভস্থ গ্যাস পাইপলাইন ব্যবহারের চেষ্টা করেছিল। আমাদের যোদ্ধারা অসাধারণ সাফল্যের সঙ্গে দখলদারদের বিরুদ্ধেই এই কৌশল ব্যবহার করেছে।’
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইহোর ওবোলেনস্কি জানান, ইউক্রেনের ‘অপারেশন ভেলেস’ পাইপলাইন ও সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে ১৫ কিলোমিটার অগ্রসর হয়ে রুশ অবস্থানের পেছনে পৌঁছায়। সমন্বিত এই হামলায় ১০০ রুশ সেনা হতাহত হয় এবং ৩০ জনকে আটক করা হয়। ইউনাইটেড ফোর্সেস গ্রুপের মুখপাত্র ভিক্টর ত্রেগুবভ জানান, রুশ বাহিনী আহতদের সরিয়ে নিতে এই পথ ব্যবহার করত এবং বেসামরিক ইউক্রেনীয়দের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিল। খার্তিয়া কোরের কর্মকর্তা ভ্লাদিমির দেকতিয়ারেভ জানান, পাইপলাইনে প্রায় এক মাসেরও বেশি সময় রুশ সেনাদের অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল এবং খাদ্য শেষ হয়ে যাওয়ার পর তারা আত্মসমর্পণ করে। এটি চলতি বছরে ইউক্রেনীয় বাহিনীর ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের তৃতীয় সফল অভিযান। একই সাথে দক্ষিণাঞ্চলে দোনেৎস্ক-জাপোরিঝিয়া সীমান্তে পেরেদুবোভা, কোমার এবং ফেদোরিভকা নামের তিনটি এলাকা পুনরুদ্ধার করেছে ইউক্রেন।
যুক্তরাষ্ট্র আগামী ১০ নভেম্বর উভয় পক্ষকে সমঝোতা বৈঠকে বসানোর উদ্যোগ নিলেও রাশিয়া এই আলোচনার সম্ভাবনাকে নাকচ করে দিচ্ছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ২২ অক্টোবর ইউক্রেনকে ‘ঐতিহাসিক রাশিয়ার ভূখণ্ড’ আখ্যা দিয়ে ইউক্রেনীয় জনগণের অস্তিত্ব অস্বীকার করেন এবং জ্বালানি অবকাঠামোয় যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নাকচ করেন। পুতিনের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা ভ্যালেরি উশাকভ জানান, এই আলোচনা ফলপ্রসূ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ২৭ অক্টোবর নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস গাহর স্টোরে এবং ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব পুতিনের সঙ্গে ফোনালাপ করেন। তবে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ এই পদক্ষেপকে শান্তি প্রক্রিয়ায় ইউরোপীয়দের অনাহূত প্রবেশ বলে অভিহিত করেন।
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.