আপনি পড়ছেন

সরকারি কলোনিতে অবৈধ ভাড়াটে ও উপভাড়াটেদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান শুরুর আগেই বাসা ছাড়তে শুরু করেছেন বাসিন্দারা। সরকারি নির্দেশনার পর বাসা ছাড়ার আকস্মিক নোটিশে চরম বিপাকে পড়েছেন সেখানে বসবাসরত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী। শনিবার রাজধানীর আজিমপুর সরকারি কলোনিসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে শিক্ষার্থীদের মালপত্র নিয়ে চলে যাওয়ার চিত্র দেখা যায়।

পরিদর্শন শুরুর আগেই সরকারি কলোনি ছাড়ছেন ভাড়াটিয়ারা, বিপাকে শিক্ষার্থীরা
আজিমপুর সরকারি কলোনি থেকে ভ্যানে মালপত্র তুলে চলে যাচ্ছেন এক শিক্ষার্থী, ছবি - সংগৃহীত

ইডেন মহিলা কলেজের তৃতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘২২ অক্টোবর বাড়িওয়ালা হঠাৎ আমাকে ফ্ল্যাট ছাড়ার নোটিশ দেন। তখন আমি দুর্গাপূজার ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে ছিলাম। ২৬ তারিখে ঢাকায় ফিরে আর একদিনও ফ্ল্যাটে থাকার সুযোগ পাইনি। নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে থাকতে হয়েছে। ৩১ অক্টোবরের মধ্যেই সব মালপত্র নিয়ে চলে যাওয়ার জন্য বাড়িওয়ালা কঠোর নির্দেশ দেন।’

শনিবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে আজিমপুর সরকারি কলোনির (বি অঞ্চল) একটি ভবনের সামনে ওই শিক্ষার্থীকে ভ্যানে আসবাব ও অন্যান্য জিনিসপত্র তুলতে দেখা যায়। তিনি জানান, বাসা ছাড়তে বলার অন্তত দুই মাস আগে নোটিশ দেওয়ার চুক্তি ছিল তাদের মধ্যে। একইভাবে ভাড়াটেরাও বাসা ছাড়তে চাইলে দুই মাস আগে নোটিশ দেওয়ার কথা। তবে কোনো শর্তই মানা হয়নি; বরং তাকে আকস্মিকভাবে বাসা ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে।

ক্ষোভ প্রকাশ করে ওই শিক্ষার্থী বলেন, ‘আগামী ডিসেম্বরে আমাদের চূড়ান্ত পরীক্ষা। এই পরিস্থিতিতে কীভাবে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেব তা বুঝতে পারছি না। এই মানসিক ধাক্কা সামলে উঠতেই আমার অন্তত এক মাস সময় লেগে যাবে।’

আজিমপুর সরকারি কলোনিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন মহিলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, গভর্মেন্ট কলেজ অব অ্যাপ্লাইড হিউম্যান সায়েন্স (হোম ইকনোমিক্স কলেজ) ও ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সাবলেটে থাকেন। তাদের বেশিরভাগই ছাত্রী। সরকারি কলোনি নিরাপদ মনে হওয়ায় তারা এখানে ভাড়া থাকেন।

দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা এই শিক্ষার্থীরা আবাসন সংকটের কারণে বাধ্য হয়ে কলোনিতে কক্ষ ভাড়া নেন। কারণ, নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আবাসিক হলে আসন পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। কলোনিতে মোট কতজন শিক্ষার্থী থাকেন তার সঠিক হিসাব নেই। তবে শিক্ষার্থীদের ধারণা, এই সংখ্যা এক হাজারের বেশি হতে পারে।

সরকারি কর্মচারীদের অনেকেই তাদের বরাদ্দ পাওয়া ফ্ল্যাট ভাড়া দেন। কেউ পুরো ফ্ল্যাট ভাড়া দেন, আবার কেউ একটি বা দুটি কক্ষ সাবলেট হিসেবে দেন। পুরো ফ্ল্যাট ভাড়া দেওয়া কর্মচারীদের একটি অংশ অন্যত্র কম খরচে থেকে বাড়তি আয়ের পথ বেছে নেন। আরেকটি অংশের অন্যান্য বাড়তি আয় থাকায় তারা পুরোনো সরকারি ফ্ল্যাটে থাকতে আগ্রহী নন; তাই ভাড়া দিয়ে টাকা আয় করেন। অন্যদিকে যাদের বেতন দিয়ে সংসার চালানো কঠিন, মূলত তারাই একটি বা দুটি কক্ষ সাবলেটে ভাড়া দেন। আজিমপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি কলোনিতে বছরের পর বছর ধরে এভাবে বাসা ভাড়া দেওয়ার রেওয়াজ চলে আসছে।

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সরকারি আবাসন পরিদপ্তর বৃহস্পতিবার একটি জরুরি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ৩১ অক্টোবরের পর কোনো সরকারি ফ্ল্যাটে ভাড়াটে বা উপভাড়াটে পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর বরাদ্দ বাতিল করা হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।

আজিমপুর সরকারি কলোনির বেশ কিছু কর্মচারী নিজেদের ফ্ল্যাট ভাড়া দিতেন। তবে কর্মচারীদের আরেকটি অংশ এই ব্যবস্থার বিরোধী ছিলেন। বিশেষ করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সরকারি বাসা এভাবে ভাড়া দেওয়ার তীব্র বিরোধিতা করে আসছেন।

ভাড়াটেদের সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে আজিমপুর সরকারি কলোনির (বি অঞ্চল) ২২ নম্বর ভবনের ব্যবস্থাপনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মাহবুব আলম বলেন, কিছু বাসিন্দা হয়তো একক কক্ষ ভাড়া দিয়েছিলেন এবং এ বিষয়ে অভিযোগও এসেছে। তিনি আরও বলেন, ‘তবে সবাইকে ইতিমধ্যে চলে যেতে বলা হয়েছে। এখন আর কোনো ভাড়াটে অবশিষ্ট নেই।’

শিক্ষার্থীরা জানান, কয়েক দিনে আজিমপুর ও পলাশী এলাকার সরকারি কলোনি থেকে কয়েক শ শিক্ষার্থী ও অন্যান্য পেশার ভাড়াটেকে বাসা ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। কিন্তু তাদের অনেকেই নতুন বাসা খুঁজে পাননি। সাধারণত নতুন বাসা খুঁজতে অন্তত এক মাস সময় লাগে।

বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের তৃতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমি প্রতিদিন রাত ১১টা বা ১২টা পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বাসা খুঁজেছি। তাও কোথাও কোনো থাকার জায়গা পাইনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা হলে আসন না পাওয়ার কারণেই বাধ্য হয়ে বাইরে বিভিন্ন জায়গায় ভাড়া থাকি।’ উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কলেজ কর্তৃপক্ষকে জরুরি ভিত্তিতে হলে সিটের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান তিনি।

মিরপুর-১ নম্বরের পাইকপাড়ায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক এলাকার চিত্র অবশ্য কিছুটা ভিন্ন ছিল। শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত সেখানে কাউকে বাসা ছেড়ে চলে যেতে দেখা যায়নি। কলোনির ফটকে থাকা নিরাপত্তাকর্মী ও স্থানীয় দোকানিরাও জানান, ওই দিন কাউকে বাসা ছাড়তে দেখেননি তারা।

এদিকে মিরপুর-১ নম্বরের ওয়াক-আপ সরকারি কর্মচারী আবাসিক এলাকার পুরোনো পাঁচতলা ভবনের সামনে কয়েকজন তরুণকে দেখা যায়। তারা জানান, গণপূর্ত অধিদপ্তর খালি ফ্ল্যাটগুলোতে অভিযান চালিয়ে সেগুলো সিলগালা করে দিয়েছে। ওই এলাকার অনেক বাসিন্দা ইতিমধ্যে পাশের নতুন বহুতল ভবনে উঠে গেছেন।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরকারি কলোনি রয়েছে। সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকায় বিভিন্ন শ্রেণির মোট ১৯ হাজার ৯১টি সরকারি ফ্ল্যাট রয়েছে। এর মধ্যে আজিমপুর এলাকায় সরকারি ফ্ল্যাটের সংখ্যা ৩ হাজার ২৫২টি, যেখানে ভাড়া বাসার চাহিদা সবচেয়ে বেশি।

সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের পরিচালক জহিরুল ইসলাম খান বলেন, ভাড়াটে ও উপভাড়াটেদের ৩১ অক্টোবরের মধ্যে বাসা খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরিদপ্তরের কর্মকর্তারা এখন থেকে সরেজমিন পরিদর্শন করবেন। কোনো ফ্ল্যাটে সাবলেট বা ভাড়াটে পাওয়া গেলে যে কর্মচারীর নামে ফ্ল্যাট বরাদ্দ রয়েছে, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জহিরুল ইসলাম আরও জানান, অধিকাংশ ভাড়াটে ইতিমধ্যে বাসা ছেড়ে চলে গেছেন এবং অনেকে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছেন। ভাড়াটেদের বাসা ছাড়ার জন্য মাত্র এক দিন সময় দেওয়া হয়নি; বরং পুরো এক সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া যারা অবৈধভাবে বসবাস করছেন, তাদের কেন বাড়তি সময় দেওয়া হবে—এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি।

শিক্ষার্থীদের বক্তব্য, আজিমপুর সরকারি কলোনিতে যে বাসা ভাড়া দেওয়া হতো, তা সবারই জানা ছিল। কর্তৃপক্ষ ভাড়াটেদের চলে যেতে বলায় তাদের কোনো আপত্তি নেই। তবে এভাবে মানুষকে চরম ভোগান্তির মুখে ফেলার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শিক্ষার্থী বলেন, সাত দিনের মধ্যে নতুন বাসা খুঁজে পাওয়া সম্পূর্ণ অসম্ভব। তিনি অসহায়ভাবে ঘুরেও কোথাও থাকার ব্যবস্থা করতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘আমরাও এই দেশের নাগরিক। আমরা কোনো বড় অপরাধ করিনি। আমাদের নতুন বাসা খোঁজা ও সরে যাওয়ার জন্য অন্তত এক মাস সময় দিলে সরকারের কী ক্ষতি হতো?’

প্রথম আলো অবলম্বনে

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.