প্রতিশ্রুতি কতটা পূরণ করতে পারবেন ডেমোক্র্যাটরা?
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, ইরান যুদ্ধ বন্ধ, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং কঠোর অভিবাসন নীতি নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনে জয় পেয়েছে দলটি। তবে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে ট্রাম্পের ভেটো ক্ষমতা এবং কংগ্রেসে আইন পাসের জটিলতা। ফলে আগামী দুই বছরে ডেমোক্র্যাটরা কতটা পরিবর্তন আনতে পারবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। খবর রয়টার্সের

আগামী জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেসের অধিবেশন শুরু হলে ডেমোক্র্যাটরা আনুষ্ঠানিকভাবে উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেবেন। তবে রিপাবলিকানদের সহযোগিতা ছাড়া তাঁদের পক্ষে সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন সহজ হবে না। সিনেটে অধিকাংশ বিল পাস করতে ৬০টি ভোট প্রয়োজন। এর বাইরে কোনো বিল পাস হলেও ট্রাম্প তাতে ভেটো দিতে পারবেন। সোমবার একটি পডকাস্টে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘আমি সবকিছুতেই ভেটো দেব।’
তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় ডেমোক্র্যাটদের হাতে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টির কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এসেছে। বিশেষ করে সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, বিভিন্ন বিষয়ে তদন্ত এবং সরকারি পদে নিয়োগ অনুমোদনের ক্ষমতা কাজে লাগাতে পারবেন তাঁরা।
জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোই বড় চ্যালেঞ্জ
নির্বাচনের আগে ভোটারদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ ছিল জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়। জ্বালানি, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ডেমোক্র্যাটরা।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড পলিসি রিসার্চের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও অর্থনীতিবিদ ডিন বেকারের মতে, মানুষের ব্যয় কমাতে সবচেয়ে কার্যকর উদ্যোগ হতে পারে ইরান যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। গত ফেব্রুয়ারি থেকে চলা এই যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এতে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে।
কংগ্রেসের তদন্ত ও তদারকির ক্ষমতা ব্যবহার করে যুদ্ধ বন্ধে চাপ দিতে পারেন ডেমোক্র্যাটরা। স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় কমাতেও উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে তাঁদের। ২০২৫ সালে সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা আইনের আওতায় অতিরিক্ত ভর্তুকির মেয়াদ শেষ হওয়ায় অনেক মার্কিন নাগরিকের স্বাস্থ্যবিমার খরচ বেড়েছে। ডেমোক্র্যাটরা ওই ভর্তুকি পুনর্বহাল এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি মেডিকেইডে করা কাটছাঁট বাতিলের চেষ্টা করতে পারেন।
এ ছাড়া নিত্যপণ্য ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কংগ্রেসের কমিটির মাধ্যমে তদন্ত চালাতে পারেন তাঁরা। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেওয়া কিংবা তা পুনর্বিবেচনার চাপ তৈরি হতে পারে।
তবে ট্রাম্পের আরোপ করা শুল্ক প্রত্যাহার করা তুলনামূলক কঠিন হবে। এ জন্য রিপাবলিকানদের সমর্থন নিয়ে প্রেসিডেন্টের ভেটো অগ্রাহ্য করতে হবে। এমনকি শুল্ক প্রত্যাহার হলেও বাজারে পণ্যের দাম কমতে সময় লাগতে পারে।
ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তদন্ত ও অভিশংসনের উদ্যোগ
ডেমোক্র্যাটদের সবচেয়ে বেশি তৎপরতা দেখা যেতে পারে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্তে। জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির গবেষক লরা ব্লেসিংয়ের মতে, কংগ্রেসের নতুন তদন্তক্ষমতা ব্যাপকভাবে ব্যবহার করবেন তাঁরা।
ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পদ ও পরিবারের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড তদন্তের পরিকল্পনা রয়েছে ডেমোক্র্যাটদের। চলতি বছরের শুরুতে প্রকাশিত আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পদ প্রায় ২২০ কোটি ডলার বেড়েছে। তাঁর পরিবারের ব্যবসা ক্রিপ্টোকারেন্সি, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভবিষ্যৎবাণীভিত্তিক বাজারসহ বিভিন্ন খাতে বিস্তৃত হয়েছে।
ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে বলরুম নির্মাণে অনুদান দেওয়া ব্যক্তিরা সরকারি বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন কি না এবং বিচার বিভাগ তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের লক্ষ্যবস্তু করেছে কি না, তা-ও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
তবে তদন্তে বাধা আসার আশঙ্কা রয়েছে। প্রশাসনের কর্মকর্তারা আদালতে সমন চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। আবার তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ মিললেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নিশ্চয়তা নেই। কারণ, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণাধীন বিচার বিভাগকে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের বিরুদ্ধেও অভিশংসনের প্রস্তাব এসেছে। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। তবে কোনো কর্মকর্তাকে অভিশংসন করলেও তাঁকে পদ থেকে সরাতে সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন।
ইরান যুদ্ধ বন্ধে অর্থ বরাদ্দ আটকাতে পারেন ডেমোক্র্যাটরা
নতুন কংগ্রেসের অধিবেশন শুরুর আগের সময়টিকে ট্রাম্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিদায়ী কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে এই সময়ের মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করতে পারেন তিনি।
কুইন্সি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসির মতে, পরাজয়ের মুখে ট্রাম্প আরও বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারেন।
ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া পরিচালিত যুদ্ধ বন্ধে বাধ্যতামূলক প্রস্তাব আনতে পারেন। তবে ট্রাম্পের ভেটো ক্ষমতার কারণে তা কার্যকর করা কঠিন হবে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে সামরিক অভিযানের জন্য নতুন অর্থ বরাদ্দ আটকে দেওয়া।
পারসির মতে, নতুন অর্থ না পেলে দীর্ঘ সময় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। এ ছাড়া সামরিক অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের আইন মেনে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারবেন ডেমোক্র্যাটরা।
তবে সামরিক খাতে অর্থ বরাদ্দ বন্ধ করলে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের দুর্বল করার অভিযোগ উঠতে পারে—এমন আশঙ্কায় ডেমোক্র্যাটরা কতটা এগোবেন, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। পারসির সতর্কতা, যুদ্ধ বন্ধে পদক্ষেপ না নিলে ডেমোক্র্যাটরাও এই সংঘাতের অংশীদার হিসেবে বিবেচিত হবেন।
কঠোর অভিবাসন নীতিও চ্যালেঞ্জের মুখে
ট্রাম্পের গণবহিষ্কার কর্মসূচি ও কঠোর অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধেও অবস্থান নিতে পারেন ডেমোক্র্যাটরা। চলতি বছরের শুরুর দিকে প্রকাশিত এক জরিপে ৬৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা (আইসিই) অভিবাসনবিরোধী অভিযান চালাতে গিয়ে সীমা ছাড়িয়েছে।
আইসিইর আটককেন্দ্রের পরিবেশ, বন্দীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ এবং অভিযানে করদাতাদের অর্থ ব্যয়ের বিষয়গুলো তদন্ত করতে পারে কংগ্রেস। এ ছাড়া গত দুই বছরে অভিবাসন কার্যক্রমের জন্য ট্রাম্প প্রশাসনকে দেওয়া প্রায় ২৪ হাজার কোটি ডলারের বরাদ্দ কমানো বা ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিতে পারেন ডেমোক্র্যাটরা।
ন্যাশনাল ইমিগ্রেশন ল সেন্টারের নীতিবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট হেইডি অল্টম্যানের মতে, আইসিইর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে আনতে সংস্থাটির বাজেট উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো জরুরি।
তবে এ ক্ষেত্রেও আইন পাস করতে হবে, যাতে ট্রাম্প ভেটো দিতে পারেন। সব মিলিয়ে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলেও আগামী দুই বছরে ট্রাম্পের নীতিতে বড় পরিবর্তন আনা সহজ হবে না। তদন্ত, সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে তাঁরা কতটা সফল হন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.