advertisement
আপনি দেখছেন

গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে চীনের উহানে প্রথম শনাক্ত হয় করোনাভাইরাস। এর অল্প দিনের মধ্যে তা দেশটির সব রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ইরান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় ব্যাপকভাবে ছড়ায়। দক্ষিণ কোরিয়া সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলেও ইরানে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে করোনাভাইরাস। একে একে ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে দ্রুত সংক্রমণ ঘটিয়েছে। এসব দেশে এখন মরণঘাতী ভাইরাসটির তাণ্ডব চলছে। কিন্তু বাংলাদেশে এর উল্টো চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

corona virus image

ওয়ার্ল্ডোমিটারের তথ্যা অনুসারে, ইতালিতে এক লক্ষ ১৫ হাজারের বেশি মানুষ ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়েছে। সেইসঙ্গে মারা গেছে ১৩ হাজারের বেশি মানুষ।

বাংলাদেশে প্রথম যাকে করোনা আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত করা হয় তিনি ছিলেন ইতালি ফেরত। কিন্তু যে ইতালিতে ভাইরাসটির প্রভাব এত ভয়াবহ সেই ইতালি থেকে আসা ভাইরাস বাংলাদেশে কী ভিন্ন আচরণ করছে?

অথচ ঘনবসতি, স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সক্ষমতার অভাব এবং সাধারণ মানুষের পরিচ্ছন্নতার অভ্যাসে ঘাটতি অর্থাৎ নানা পারিপার্শ্বিকতার কারণে বাংলাদেশে ভাইরাসটির ব্যাপক সংক্রমণের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।

এ প্রসঙ্গে ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমিও চিন্তা করছি। বাংলাদেশে ভাইরাসটি ইতালি থেকে এসেছে। যেখানে ইতালিতে ভাইরাসটি হ্যাভক (ধ্বংসযজ্ঞ) তৈরি করলো, আর এদেশে এসে কিছুই করছে না- কেমন একটা ব্যাপার। বিষয়টা আমিও বুঝতে পারছি না।’

তিনি বলেন, উহান থেকে যে ভাইরাসটির উৎপত্তি হয় পরবর্তীতে সেটির মিউটেশন হয়েছে। সেই রেশ ধরে কয়েকটি দেশে একইভাবে সংক্রমিত হয়েছে। আবার কিছু দেশে ভাইরাসটির সংক্রমণের ধরন ভিন্ন। বাংলাদেশে করোনাভাইরাস কিন্তু উহান থেকে আসেনি। এক্ষেত্রে শুধু ভাইরাস নয়, যিনি ভাইরাসটি বহন করছেন তার কথাও বিবেচনা করতে হবে।

এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, জিকা ভাইরাস যখন ছড়ায় তখন অনেক দেশেই তা সংক্রমিত হয়েছিল। কিন্তু শুধু ব্রাজিলে ভাইরাসটি মাইক্রোকেফালি হিসেবে দেখা দিয়েছিল। আবার নিপা ভাইরাসের উৎপত্তি হয়েছিল মালয়েশিয়ায়। পরে এটি বাংলাদেশেও ছড়ায়। এ ছাড়া আরেকটা ভাইরাস আছে- সেটা আফ্রিকানদের যখন আক্রান্ত করে তখন তাদের এক ধরনের ক্যান্সার হয়। সেই একই ভাইরাস যখন চীনে ছড়ায় তখন তাদের নেজো-ফেরেঞ্জিয়াল কার্সিনোমা হয়।

এক্ষেত্রে যারা সংক্রমিত হয়, তাদের জীনগত বিষয়টাও বিবেচনা করতে হবে। কারণ একটা দেশের মানুষের সঙ্গে অন্য কোনো দেশের কারো জীনগত বৈশিষ্ট্য নাও মিলতে পারে। এই জীনগত বৈশিষ্টের ওপরও অনেক সময় রোগের প্রাদুর্ভাবের সম্পর্ক থাকে।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম আরো বলেন, গত ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। এরপর ভাইরাসটির প্রথম ইনকিউবেশন পিরিয়ড (লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার কাল) ১৪ দিন। দ্বিতীয় ইনকিউবেশন পিরিয়ড শেষ হবে ৫ এপ্রিল। এই সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ৫ তারিখের পর বলা যাবে বাংলাদেশে ভাইরাসটির সংক্রমণের ধরন একই নাকি ভিন্ন।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেসের এপিডোমোলজি বিভাগের প্রধান ড. প্রদীপ কুমার সেনগুপ্ত বলছেন, যথেষ্ট গবেষণার আগে ভাইরাসটির ভিন্নতা নিয়ে খুব বেশি কিছু বলা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে চান তিনি।

ড. প্রদীপ বলছেন, ‘নতুন এ ভাইরাসটি নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বেও খুব বেশি তথ্য নেই। তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা এর সংক্রমণ হ্রাসে প্রভাব ফেলে বলে হাইপোথিসিস আছে। কিন্তু এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য নেই। সে কারণে এ জাতীয় হাইপোথিসিস যেমন গ্রহণ করতে পারছি না, তেমনি প্রত্যাখ্যানও করতে পারছি না।’

এ প্রসঙ্গে ভারতের হায়দ্রাবাদে অবস্থিত এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব গ্যাস্ট্রোএনটেরোলজির (এআইজি) চেয়ারম্যান ও পদ্মভূষণপ্রাপ্ত জি পি নাগেশ্বর রেড্ডির কথা উল্লেখ করা যায়। ভারতে আসার পর করোনাভাইরাসের চরিত্র বদল হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি।

এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ভাইরাসটি যখন চীনে ছড়ায় তখন এর জীনগত বৈশিষ্ট্য ছিল এক রকম। পরে সেটি যখন ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতে ছড়িয়েছে তখন এর জীনগত কিছু বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হয়েছে। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, চীন ও ভারত এই চারটি দেশে ভাইরাসটির জীনগত বৈশিষ্ট উন্মোচন করা হয়েছে বলেও দাবি তার।