advertisement
আপনি পড়ছেন

নতুন সিল্ক রোডের ধারণা বিক্রির নামে বন্দর, শোধনাগার, ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক, বন্দর নগরী, সড়ক, রেলপথ এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে চীন। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য চীন সংশ্লিষ্ট উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বিশাল অঙ্কের ভর্তুকির সাথে দেশগুলোর সামর্থ্যের তুলনায় অনেক বেশি ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। ধারণা করা হয়, এটি চীনের এক ধরনের রাজনৈতিক কৌশল। এই দেশগুলো ঋণ শোধ দিতে ব্যর্থ হলে চীন জামানত হিসেবে কৌশলগত সম্পদ দখল করতে পারে।

chinas silk road

২০১৩ সালে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তাঁর উচ্চাভিলাষী, বিস্তৃত এবং ব্যয়বহুল স্বপ্নের প্রকল্প- বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী বাজারকে একীভূতকরণের জন্য উন্নততর অবকাঠামো নির্মাণের ধারণাকে উৎসাহিত করেন। এর আওতায়, পূর্ব এশিয়া থেকে ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত উন্নয়নমূলক ও বিনিয়োগ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। চীনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাবকে বিশ্বজুড়ে প্রসারিত করার লক্ষ্যে কমপক্ষে ১৪০টি দেশে ব্যয় করা হবে প্রায় এক থেকে আট ট্রিলিয়ন ডলার। মজার বিষয় হচ্ছে, বিশ্বের মাত্র ১৬টি দেশের জিডিপি এর চেয়ে উপরে।

বিআরআই দুটি উদ্যোগের সম্মিলন: প্রথমত, (স্থল ভিত্তিক) সিল্ক রোড অর্থনৈতিক বেল্ট, ছয়টি উন্নয়ন করিডোর সমন্বিত, যথা: রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে জিলিন, শানডং থেকে ডেনমার্ক, কাজাখস্তান থেকে তুরস্ক, হেনিয়ান থেকে মালয়েশিয়া, গুয়াংডং থেকে বাংলাদেশ, জিনজিয়াং থেকে পাকিস্তান। দ্বিতীয়ত, একবিংশ শতাব্দীর মেরিটাইম সিল্ক রোড বিভিন্ন দেশ ও মহাদেশ জুড়ে সমুদ্রপথগুলোকে সংযুক্ত করে।

ভারতীয় উপমহাদেশে বিআরআই-এর প্রধান প্রকল্প চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি), জিনজিয়াং হয়ে পাকিস্তানের গদার বন্দর পর্যন্ত চলা এই করিডোরের আনুমানিক ব্যয় ৬২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এটি মূলত আরব সাগরে একটি কৌশলগত আউটলেট সরবরাহ করে। সেই সাথে ইসলামাবাদের জন্য পশ্চিম এশিয়ার মাধ্যমে তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য এটি একটি নতুন বিকল্প পথ। এছাড়াও এই প্রকল্পটির লক্ষ্য করাচী বাণিজ্য করিডোর প্রসারিত করা এবং করাচী বন্দর থেকে পিপ্রি পর্যন্ত একটি রেলপথ স্থাপন করে অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্রেরণা দেওয়া। এই অংশের ব্যয় হয়েছে ১৩০ বিলিয়ন পাকিস্তানি রুপি, যা পাকিস্তানের মোট জিডিপি ২৭৮.২২ বিলিয়ন ডলারের ২৫ শতাংশ। এটি লক্ষ্য করা গুরুত্বপূর্ণ যে, এই স্কেলের প্রকল্পগুলো আপাতদৃষ্টিতে প্রগতিশীল মনে হলেও আসলে তা ঋণগ্রহীতা দেশের জন্য বহিরাগত ঋণ বাড়ানোর বোঝা নিয়ে আসে। পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও তাই, সিপিইসি এর ফলে পাকিস্তানের মোট বহিরাগত ঋণ ১১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মতো হয়েছে বলে জানা যায়। আর চীনের এসব চুক্তি অস্বাভাবিক গোপনীয়তায় আবদ্ধ। তাই ঋণের অজানা দিকগুলোর অর্থ যে আসল পরিসংখ্যান আরও বেশি হতে পারে। এ জাতীয় পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের অনিশ্চিত অর্থনৈতিক অবস্থা এবং সিপিসির আওতায় নেওয়া ঋণ পরিশোধে অক্ষমতার কথা কল্পনা করা সহজ। বিশ্ব দেখতে পাচ্ছে যে, পাকিস্তান এরইমধ্যে চল্লিশ বছর ধরে ইজারা দেয়ার জন্য গদার বন্দরকে চীনের কাছে হস্তান্তর করেছে, যেখানে চীন কেবল বন্দরের উপর কৌশলগত নিয়ন্ত্রণই রাখবে না, বন্দর থেকে আয়ের ৯১% ভাগও নেবে।

একইভাবে, বিআরআইয়ের আওতায় নির্মিত শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরটি চীনের কাছে ৯৯ বছরের লিজের অধীনে রয়েছে। ঋণ গ্রহীতা দেশগুলোর কৌশলগত সম্পদ নিয়ে নেওয়ার চীনা নীতির ধারাবাহিকতা প্রতিফলিত হয়েছে এখানে। একটি বিতর্কিত ঋণ-বদলের অংশ হিসেবে শ্রীলঙ্কা এই বন্দরটি চীনের কাছে হস্তান্তর করতে বাধ্য হয়েছিল। এটি ‘মুক্তার তত্ত্ব’র সাথে সামঞ্জস্য রেখে নৌ ফাঁড়ি তৈরির জন্য চীন আগ্রাসী প্রচেষ্টা দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল। তার ওপর, শ্রীলঙ্কা সার্বভৌমত্বের সাথে আপস করে কলম্বো বন্দর নগরীর উন্নয়নে চীনা বিনিয়োগের জন্য নিজের জমি এবং সম্পদ বিক্রি করে দেয়, যা স্পষ্টত শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে গভীর উদ্বেগ তৈরি করে। বেইজিংয়ের ঋণ-মুচলেকা নীতির আরেকটি স্পষ্ট উদাহরণ মালদ্বীপ। বিআরআইয়ের আওতাধীন চীন-মালদ্বীপ মৈত্রী সেতুর জন্য অর্থনৈতিকভাবে অবিশ্বাস্য শর্তে চীনা সহায়তা নিয়েছিল মালদ্বীপ, ফলে এই দেশটিও শ্রীলঙ্কার মতো একই পরিণতির মুখোমুখি হয়েছিল। আজ মালদ্বীপ প্রায় ৩.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার চীনা ঋণের এক বিশাল বোঝা বয়ে চলেছে। যা প্রায় ৪.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার জিডিপি নিয়ে পর্যটন ও মৎস্যসম্পদের উপর নির্ভর করে টিকে থাকা অর্থনীতির জন্য অবিশ্বাস্যরকমের বড় বোঝা।

যদিও চীনের অর্থনৈতিক নীতিগুলো সময়মত মেনে চলার ফলে বাংলাদেশ ঋণে পুরোপুরি জড়িয়ে পড়েনি, তবুও বিআরআইয়ের সদস্য দেশ হিসেবে বাংলাদেশও তহবিল সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে। ২০২১ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং ভারতের নেতৃত্বাধীন জোট কোয়াডের ভবিষ্যত সম্প্রসারণ সম্ভাবনার হুমকি বুঝতে পেরে বাংলাদেশে চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং বাংলাদেশকে কোয়াডে যোগ দেয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন এবং বিআরআইয়ের আওতায় করা বিশাল অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে ঝুঁকির শঙ্কা তুলে ধরেছিলেন। ভারতীয় উপমহাদেশের আরেকটি দেশ নেপাল, যা বিআরআই- এ অংশগ্রহণের সময়ই অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সাথে লড়াই করছে। এখানে, তিব্বত থেকে কাঠমান্ডু যাওয়ার পথটি তৈরির বাধা হিসেবে আছে ঋণ, প্রকল্পের কার্যকারিতা, পরিবেশ এবং ভূমিকম্প নিয়ে উদ্বেগ।

সুতরাং, প্রায় প্রতিটি বিআরআই সদস্য দেশ চীনা ঋণের জালে আটকে যায়। গ্লোবাল ডেভলপমেন্ট সেন্টারের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় প্রকাশিত হয়েছে যে, আরও বিআরআই দেশ এখন ঋণ পরিশোধ করতে না পারার গুরুতর ঝুঁকির মধ্যে আছে, বিশেষ করে এই অতিমারীর সময়। জিবুতি, কিরগিজস্তান, লাওস, মালয়েশিয়া, মঙ্গোলিয়া, মন্টিনিগ্রো, নাইজেরিয়া এবং তাজিকিস্তানের মতো দেশগুলো এই সমস্যায় পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিআরআইয়ের অধীনে সংগ্রহ ও চুক্তি হস্তান্তর প্রক্রিয়ার মূল চ্যালেঞ্জগুলোর কারণে এই দেশগুলো প্রতিযোগিতার পক্ষে উন্মুক্ত নয়, তারা সম্ভবত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার লক্ষণ বজায় রাখার প্রয়াসে তাদের কৌশলগত সম্পদকে অগ্রাহ্য করতে পারে। তবে প্রক্রিয়াটিতে তারা তাদের মূল্যবান সার্বভৌম অধিকার হারাতে বসেছে।

এছাড়াও, পূর্বে উল্লেখিত মুক্তো কৌশলটির অংশ হিসেবে চীন, ভারত মহাসাগরে কমপক্ষে নয়টি কৌশলগত নৌ ঘাঁটি তৈরি করছে। এই ঘাঁটিগুলো চীনকে দেশ থেকে অনেক দূরে, স্টেশন যুদ্ধজাহাজ, জাহাজ চলাচলের রুটগুলোর নিয়ন্ত্রণ এবং এর মাধ্যমে ব্যবসার নিজেদের নিয়মকানুন চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেবে। এটি কেবল একটি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নয় বরং একাধিক প্রকল্পে বিশ্বকে একাধিক উপায়ে প্রভাবিত করার লক্ষ্যে একটি কৌশলগত পরিকল্পনা। বিষয়টির গুরুত্ব বোঝা যায়, অনেক প্রকল্পের শেষ করার তারিখ দেখে। চীনাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিকী, যেমন ২০২১ সালে সিসিপির শতবর্ষ পূর্তি বা ২০৪৯ সালে পিআরসির শতবর্ষ পূর্তিতে, তারা অনেক প্রকল্প শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ করে রেখেছে।

চীনা অংশগ্রহণকারীদের সামন্তবাদী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চিন্তাধারাই, এই আগ্রাসী আচরণ এবং ক্রমবর্ধমান নতুন বাজার দখলের প্রচেষ্টার পেছনের একটি মূল বিষয়। নীতি নির্ধারক, ব্যাংকার, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এন্টারপ্রাইজ ব্যবস্থাপক এবং কূটনীতিকসহ এই পুরো অর্থায়ন এবং অবকাঠামো বিভাগের সাথে জড়িত কর্মকর্তা এবং ব্যক্তিদেরকে আরও বেশি বেশি বিআরআই চুক্তির লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়। তা সে ঋণ গ্রহীতা দেশগুলোর আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক এবং পরিবেশগত প্রভাব যা-ই হোক না কেন। আগাম অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রণোদনাগুলোতে সাধারণভাবে এই চুক্তিগুলো দুর্বল হওয়ার বিষয়ে উদ্বিগ্ন বলে মনে করা হয়। তবে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এসব নিয়েই চীনা ব্যাংকার, নির্মাণ সংস্থা এবং কূটনীতিকরা ১৪০ টিরও বেশি দেশে অস্থির পদ্ধতিতে প্রকল্পগুলো পরিচালনা করছে।

চীন এই ঋণকে বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফা হিসেবেই দেখে। এবং তারা জানে, তাদের এই ঋণ ব্যবস্থাটা ত্রুটিপূর্ণ। তবুও তারা উন্নয়নশীল দেশগুলোর সাথে অবকাঠামোগত ঋণ চুক্তি করছে। আর এই ঋণ চুক্তির উদ্দেশ্যই হলো উন্নয়শীল দেশগুলোর নেতৃত্ব যেন চীনের প্রতি কঠোর না হতে পারে এবং অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হতে না পারে। এই দেশগুলোও ঋণের এক চক্রে চিরকালই ধরা পড়েছিল। এই ব্যবস্থায় তারা আগের ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য নতুন ঋণ নিতে বাধ্য হয়।

চীন একবিংশ শতাব্দীতে তার অর্থনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে নতুন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হয়ে উঠবে বলে মনে হয়। বিশ্ব দেখছে যে বেইজিং তার দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের জন্য অর্থনৈতিক সহযোগিতার নামে আরও আগ্রাসীপন্থা গ্রহণ করছে। এটি জানা যে, চীন একক দেশ এবং বিভিন্ন দেশের জোটগুলোর সাথে, দৃঢ়ভাবে ঋণ কূটনীতির চালটি চালে। ফলে অনায়াসেই বোঝা যায় যে, বিআরআই একটি কল্যাণকর উদ্যোগ না হয়ে বরং দ্রুত বেল্ট অ্যান্ড রোডস ব্লকে পরিণত হচ্ছে। সন্দেহ নেই, বিআরআইকে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংহতকরণের পরিকল্পনা হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে এটি কৌশলগত স্বার্থে বিভিন্ন দেশকে দাবিয়ে রাখার জন্য চীনের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। যে বিশ্ব এরই মধ্যে রোগ থেকে শুরু করে দুর্যোগ, দারিদ্র্য থেকে মহামারী পর্যন্ত বিভিন্ন ধরণের ঋণ এবং সমস্যা বিরুদ্ধে লড়াই করছে- সেই বিশ্বের জন্য একটি উদ্বিগ্ন হওয়ার মতই লক্ষণ।

লেখক: গণমাধ্যম কর্মী ও কমিউনিকেশন কনসাল্ট্যান্ট

প্রিয় পাঠক, ভিন্নমতে প্রকাশিত লেখার বিষয়বস্তু, রচনারীতি ও ভাবনার দায় একান্ত লেখকের। এ বিষয়ে টোয়েন্টিফোর লাইভ নিউজপেপার কোনোভাবে দায়বদ্ধ নয়। আপনাদের ধন্যবাদ।