advertisement
আপনি পড়ছেন

প্রতি বছরই ২৬ নভেম্বর ফিরে এসে পাকিস্তানি হিংস্রতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ২০০৮ সালের এই দিনে লস্কর-এ-তৈয়বা নামীয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠি মুম্বাই শহরে নারকীয় তাণ্ডব ঘটিয়ে বিশ্ববাসীকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। দশ সদস্যের এক খুনের মিশন মুম্বাইয়ের দুটি পাঁচতারা হোটেলসহ মোট পাঁচটি জায়গায় অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে মোট ১৬৮ জন নিরপরাধ মানব সন্তানকে হত্যা করেছিল, যাদের মধ্যে ২৫ জন ছিল বিদেশি নাগরিক।

shamsuddin chowdhury manik retired judge of the appellate division

এছাড়াও ৩০০ জন নিরীহ মানুষকে তারা মারাত্মকভাবে আহত করেছিল। করাচি বন্দর থেকে পাড়ি দিয়ে একটি নৌযান দখল করে ঐ সন্ত্রাসীদের মুম্বাই পর্যন্ত যাত্রা যে ধরনের গোপনীয়তা এবং সামরিক সাদৃশ্য কলাকৌশল অবলম্বন করা হয়েছিল, তা শুধু সামরিক বাহিনীতে প্রশিক্ষিত লোকরাই করতে পারেন বলে প্রথম থেকেই আন্দাজ করা হচ্ছিল যে, এই নিষ্ঠুর অপকর্মটি আইএসআই নামক পাকিস্তান সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীরই মদদে এবং প্রত্যক্ষ ভূমিকার ফসল।

পরিকল্পিতভাবেই তারা বিদেশিদের হত্যা করেছিল আন্তর্জাতিক প্রচারণার জন্য। তারা চারদিনব্যাপী এই নৃশংসতা চালায়। আজমল কাসাব নামক একজন সন্ত্রাসীকে ভারতীয় আইনরক্ষা বাহিনীর সদস্যগণ আটক করতে সমর্থ হয়। কাসাব থেকে কর্তৃপক্ষ এমন সব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়, যা সত্যিই অবিশ্বাস্য। সে বলে তার সাথে আর যে ৯ জন সন্ত্রাসী ছিল তারা সবাই লস্কর- ই-তৈয়বা নামক একটি পাকিস্তানি সন্ত্রাসী দলভুক্ত, সবাই পাকিস্তানি। ভারতের আমন্ত্রণে মার্কিন অপরাধ গোয়েন্দা সংস্থা, এফবিআই’র কর্মকর্তাগণও কাসাবকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে কাসাব বলে যে, তারা করাচি বন্দর থেকে একটি নৌযান জবরদখল করে মুম্বাই পৌঁছেন। তাদের গোটা যাত্রা পথে এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সময় তারা করাচিতে বসে থাকা তাদের নিয়ন্ত্রকদের সাথে অনবরত যোগাযোগ রক্ষা করতো, তারা মোবাইল এবং ইন্টারনেট ব্যবহার করে তাদের মিশন সফল করেছে।

একই সময় পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা বাহিনী আইএসআই কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেন পশ্চিমা বিশ্বের গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তাগণ। দুবার পুলিটজার পুরস্কারপ্রাপ্ত বিশ্বখ্যাতি সম্পন্ন সাংবাদিক স্টিভ কোল, যিনি বহু বছর পাকিস্তানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের উপর গবেষণা চালিয়েছেন, তার পুস্তকে লিখেছেন আইএসআই তাদের এক কর্মকর্তাকে মুম্বাই আক্রমণ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিল।

তিনি আরো লিখেছেন, মুম্বাই আক্রমণের উপর পাকিস্তান যে ব্যাখ্যা দিয়েছে, তাতে বহু অসঙ্গতি রয়েছে। তার লেখা মতে কূটনৈতিক পর্যায়ে পাকিস্তান মুম্বাই আক্রমণের উপর তদন্ত করার প্রতিজ্ঞা করলেও পাকিস্তানি ভূমি ব্যবহারের দাবি অস্বীকার করেছে। তবে পাশাপাশি তারা মুম্বাই আক্রমণে পাকিস্তান এবং লস্কর-ই-তৈয়বার সংশ্লিষ্টতার সমস্ত প্রমাণ ধ্বংস করে দিতে থাকে।

এমনকি কয়েক বছর পর পাকিস্তানের এক সময়ের প্রধানমন্ত্রী নেওয়াজ শরীফও বলেছেন মুম্বাই আক্রমণের সাথে জড়িতদের বিচার না করে পাকিস্তান বিশ্ব দরবারে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করেছে।

নিউজ লাইন নামে পাকিস্তানি ম্যাগাজিন উল্লেখ করেছে যে “এস” উইং নামক আইএসআই’র বিশেষজ্ঞ ইউনিট পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ সন্ত্রাস পালন করেছে। ১৯৮৮ সালে পাকিস্তানি আইএসআই’র পরিকল্পনায় হায়দ্রাবাদে যে নরমোঠ জজ্ঞ হয়েছিল, দুই দশক পর মুম্বাই আক্রমণে তার সাথে প্রচুর মিল রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই দোষীরা আইনের আওতা থেকে পার পেয়েছে। হায়দ্রাবাদ মেসাকারের নায়ক কাদির মাগছিকে পাকিস্তানি আদালত ২০১৭ সালে বেকসুর খালাস দেয় এবং মুম্বাই আক্রমণের মূল হোথা বলে পরিচিত যাকিউর রহমান লাকভির মামলাও স্তব্ধ হয়ে যায় বিচারককে মৃত্যুর হুমকি দেওয়ার পর।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর ইকবাল সন্ত্রাসী সহযোগিতার অভিযোগে ধরা পরে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃপক্ষের হাতে। সে পাকিস্তানি সন্ত্রাসীদের অর্থায়নে জড়িত ছিল। আর এক ব্যক্তির নাম গিলানি, যার আর এক নাম ডেভিড হেডলি, যে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত পাকিস্তানি, সে মার্কিন সরকারের মাদক নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের সাথে কাজ করার সময় আইএসআই’র পরিচয়ে আসে যারা তাকে লস্কর-ই-তৈয়বার সাথে পরিচয়ে করিয়ে দেয়। এই হেডলি যুক্তরাষ্ট্রে গ্রেফতার হলে সে উল্লেখ করে তৈয়বার নেতা সাজিদ মাজিদ বা মাজিদ মির থেকেও সে অর্থ গ্রহণ করতো। এই সাজিদ মাজিদকে বিশ্ব জুড়ে সন্ত্রাস রপ্তানির নায়ক বলা হয়।

হেডলির ভাষ্য মতে এই সাজিদই মুম্বাই আক্রমণে নেতৃস্থানীয় ভূমিকায় ছিল। হেডলি আরো বলে মুম্বাই আক্রমণকারিদের প্রশিক্ষণ দিয়েছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিশেষজ্ঞরা।

এক সময় যুক্তরাষ্ট্র সরকার ভারতকে অনুমতি দিয়েছিল হেডলিকে জিজ্ঞাসাবাদ করার। জবাবে হেডলি বলেছিল, আইএসআই সব সময়ই চাইতো ভারতে এ ধরনের আক্রমণ চালাতে কাশ্মিরে পাকিস্তানপন্থীদের ভেদাভেদ রোধ করতে, তাদেরকে সাফল্যের বার্তা দিতে এবং পাকিস্তানের ভূমি থেকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বিদেশে ছড়িয়ে দিতে। তার জবাব অনুযায়ী লস্কর-ই-তৈয়বাকে একত্রে রাখার কথাও আইএসআই’র বিবেচনায় ছিল, যার জন্য ভারতে আক্রমণের প্রয়োজনীয়তা।

হেডলির দেওয়া তথ্যে জিয়াউদ্দিন আনসারি নামক একজনের কথা উঠে আসে যে নিশ্চিত করেছে যে, মুম্বাই আক্রমণের জন্য অস্ত্র আইএসআই দিয়েছে এবং আক্রমণ চলাকালীন সময়ে করাচির নিয়ন্ত্রণ কক্ষে আইএসআই কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিল। আনসারি মেজর সামির আলিসহ কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করেছে।

হেডলি বলেছে, এই মেজর সামির আলিই তাকে লস্কর-ই-তৈয়বা ভুক্ত করেছিল। আনসারি এও বলেছে আইএসআই’র প্রচেষ্টায়ই মির মাজিদকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। আনসারি যাকিউর রহমান লাকভির উল্লেখ করে বলে সে টেলিফোন নির্দেশনায় ছিল। ২০১৫ সালের ৩রা আগস্ট পাকিস্তানের তদন্ত এজেন্সির প্রাক্তন কর্মকর্তা তারিক খোশা ডন পত্রিকায় আইএসআই, মেজর ইকবাল, মেজর সামির আলি এবং সাজিদ মাজিদের উল্লেখ না থাকলেও পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে আক্রমণকারীরা লস্কর-ই-তৈয়বার লোক এবং সিন্ধু এলাকায় তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।

৯/১১’র পর পাকিস্তান গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই’র জঙ্গী সমর্থনের অভিযোগ আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের নজর কাড়ে। বিশিষ্ট মার্কিন গবেষক স্টিফেন টেনকেল ব্যাক্ত করেন যে আইএসআই’র ‘এস’ শাখাও জঙ্গী সমর্থন কাজে ব্যস্ত।

পাশ্চাত বিশেষজ্ঞগণ বলেন ‘এস’ শাখা বহুজাতিক জঙ্গীবাদের সংগঠক, আইএসআই একটি গোয়েন্দা সংস্থা বিধায় এর সুযোগ ছিল দেশে এবং বিদেশে কর্মকাণ্ড পরিচালনার। যে সুযোগে এটি বিদেশ ভূমিতে জঙ্গী রপ্তানি করেছে। আইএসআই যে এভাবে বিদেশে জঙ্গী ছড়াতো সে কথা পাকিস্তানের এক সময়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাসিরুল্লা বাবর স্বীকার করেছিলেন।

মার্কিন আদালত হেডলিকে সাজা দিলেও সরকার তাকে ভারতে পাঠাতে রাজি হয়নি। ভারতের অনেকেই মনে করেন হেডলি মুম্বাই আক্রমণের ব্যাপারে আইএসআই’র আরো তথ্যাদি প্রদান করলে আইএসআই’র সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নষ্ট হতে পারে এই শঙ্কার কারণেই যুক্তরাষ্ট্র হেডলিকে ভারতের কাছে হস্তান্তর করেনি। হেডলি ভারতীয় প্রশ্নকারীদের আরো বলে আইএস ভেবেছিল যেহেতু জঙ্গী ঘটনা ভারতের মাটিতে ঘটবে, তাই এর জন্য পাকিস্তানকে দোষ দেওয়া যাবে না। সে আরো বলে মুম্বাই আক্রমণকারীদের মনোবল চাঙ্গা রাখার জন্য পাকিস্তানে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে টেলিফোনে তাদের সাথে আলাপ চালিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু কাসাব ভারতের হাতে গ্রেফতার হওয়ায় সব ভেস্তে যায়, এবং পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রে হেডলির গ্রেফতার আইএসআই’র অবস্থান আরো নাজুক করে দেয়।

এরপর ২০১২ সালের মে মাসে সৌদি সরকার জিয়াউদ্দিন আনসারি নামক এক জঙ্গীকে ভারতের হাতে হস্তান্তর করলে আনসারি মুম্বাই আক্রমণের উপর বহু মূল্যবান তথ্য প্রদান করে। আনসারি স্পষ্ট করে বলে যে, মুম্বাই আক্রমণকালে ব্যবহৃত সব অস্ত্র আইএসআই সরবরাহ করেছিল। তিনি বলেন, আক্রমণ চলাকালে করাচির নিয়ন্ত্রণ কক্ষে আইএসআই কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন, যাদের মধ্যে একজনের নাম মেজর সামির আলি।

তিনি আরো বলেন, মার্কিন চাপে এক সময় পাকিস্তান তদন্ত সংস্থা এফআইএ সাজিদ মাজিদ নামক লস্কর-ই-তৈয়বার এক মূখ্য ব্যক্তিকে গ্রেফতার করলেও পরে আইএসআই’র চাপে তাদের মুক্ত করে দেয়া হয়। এফআইএ যাকিউর রহমান লাকভিকে গ্রেফতার করেছিল, যে করাচি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে জঙ্গীদের পরামর্শ দিচ্ছিল, কিন্তু পরবর্তীতে তার বিচার আর হয়নি। এফআইএ’র প্রাক্তন প্রধান তারিক খোশা ডন পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধে উল্লেখ করেন যে, আক্রমণকারী লস্কর-ই-তৈয়বার সদস্য ছিল এবং তারা সিন্ধু প্রদেশেই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। তিনি আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে মামলার শম্ভুক গতির সমালোচনা করেন, এবং এ জন্য সরকারকে দায়ী করেন। তিনি আরো উল্লেখ করেন ২০১৩ সালে এই মামলার একজন প্রসিকিউটারকে হত্যা করা হয়।

২০০৯ সালে ভারত মুম্বাই আক্রমণের উপর ৬৯ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন পাকিস্তানকে প্রদান করলেও পাকিস্তান তার ভিত্তিতে কিছু করেনি। পরবর্তীতে পাকিস্তানের উপর থেকে আন্তর্জাতিক চাপ কমলে, পাকিস্তান এ বিষয়টি ধামাচাপা দিয়ে দেয়।

পাশ্চাত্য বিশেষজ্ঞদের মতে মুম্বাই আক্রমণ জঙ্গী পাচারে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ করে। তারা বলেন, জাতিসঙ্ঘের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে পাকিস্তান তার দেশে প্রতিষ্ঠিত জঙ্গী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে, কোন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না। বরং জঙ্গিদের সাথে আইএসআই সম্পর্ক প্রমাণিতই থেকে যাচ্ছে।

সম্প্রতি মার্কিন সরকার তার দেশে বসবাসরত তাহাউর রানা নামক এক জঙ্গী প্ররোচককে ভারতের হাতে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়। যা কার্যকর হলে ভারত মুম্বাই আক্রমণ আইএসআই’র ভূমিকা সম্পর্কে আরো তথ্য পাবে বলে সবার ধারণা। আক্রমণে পাকিস্তানের সম্পৃক্ততার বড় প্রমাণ হলো এই যে তারা ঐ আক্রমণের মূল হোতা হাফিজ মোহাম্মদ সাঈদ এবং যাকিউর রহমান লাকভিদের বিরুদ্ধে কিছু করছে না। লাকভির মূখ্য ভূমিকা সত্যেও তাকে নামমাত্র সাজা দেওয়া হয়।

লেখক: বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, আপীল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি।

প্রিয় পাঠক, ভিন্নমতে প্রকাশিত লেখার বিষয়বস্তু, রচনারীতি ও ভাবনার দায় একান্ত লেখকের। এ বিষয়ে টোয়েন্টিফোর লাইভ নিউজপেপার কোনোভাবে দায়বদ্ধ নয়। আপনাদের ধন্যবাদ।