দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও মুদ্রার পতন: কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ইরানের অর্থনীতি
- Details
- by আন্তর্জাতিক ডেস্ক
কঠোর নিষেধাজ্ঞা, আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি এবং জাতীয় মুদ্রা রিয়ালের মান কমে যাওয়ায় ইরানের অর্থনীতি গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে। এই ত্রিমুখী চাপের ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান যেমন কমে গেছে, তেমনি দেশজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভও তীব্র আকার ধারণ করেছে।

গত ২৮ ডিসেম্বর রাজধানী তেহরানের বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে দোকানি, ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ধর্মঘট ও সমাবেশের মাধ্যমে এই বিক্ষোভের সূচনা হয়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, রিয়ালের দরপতন এবং চরম অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই আন্দোলন বর্তমানে শ্রমিক, ছাত্র এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।
ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান রবিবার বলেন, চলমান বিক্ষোভের মধ্যে তার সরকার অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো সমাধানে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি স্বীকার করেন যে, সরকারের কার্যক্রমে ‘কিছু ত্রুটি ও সমস্যা’ রয়েছে এবং জনগণের উদ্বেগ, বিশেষ করে অর্থনীতি নিয়ে ভীতি দূর করতে তারা কঠোর পরিশ্রম করছেন।
বিক্ষোভে হতাহতের কোনো আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) ধারণা করছে, নিরাপত্তা বাহিনী ও বিক্ষোভকারী মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা ২,৬১৫ জনে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া আহত হয়েছেন ২,০৫৪ জন এবং ১৮,৪৭০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সংকটের কেন্দ্রে মুদ্রার দরপতন
ইরানি রিয়াল খোলা বাজারে মার্কিন ডলারের বিপরীতে রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত বছরের শুরুতে প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য ছিল ৮ লাখ ১৭ হাজার রিয়াল, যা ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ১৪ থেকে ১৪ লাখ ৭০ হাজার রিয়ালে গিয়ে ঠেকেছে। চলতি সপ্তাহে খোলা বাজারে প্রতি ডলারের মান প্রায় ১৫ লাখ রিয়াল, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা প্রায় শেষ করে দিয়েছে। ২০২০ সাল থেকে রিয়াল তার মানের প্রায় ৮০০ শতাংশ হারিয়েছে।
রিয়ালের এই দরপতনের ফলে আমদানি খরচ বেড়ে গেছে, যা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে এবং ব্যবসায়ীদের পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য করছে। সাধারণ ইরানিদের সঞ্চয় শেষ হয়ে গেছে এবং তারা আশঙ্কা করছেন যে জিনিসপত্রের দাম বাড়তেই থাকবে। নিত্যদিনের মুদ্রার ওঠানামার কারণে পণ্য কিনতে হিমশিম খাওয়া ব্যবসায়ী ও দোকানিরাই সবার আগে প্রতিবাদে নেমেছেন।
জীবনযাত্রার মান গ্রাস করছে মূল্যস্ফীতি
ইরানে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৪০ শতাংশের ওপরে রয়েছে। কিছু এলাকায় খাদ্য ও বাসস্থানের খরচ জাতীয় হারের চেয়ে দ্রুত বাড়ছে। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য না থাকায় মধ্য ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো মৌলিক চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে।
ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতি ২০২০ সালে ৩০.৬ শতাংশ ছিল, যা ২০২১ সালে বেড়ে ৪৩.৪ শতাংশ হয় এবং পরবর্তী দুই বছর ৪৪-৪৬ শতাংশের ঘরে স্থির ছিল। ২০২৪ সালে তা কিছুটা কমে ৩২.৫ শতাংশে নামলেও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) পূর্বাভাস দিয়েছে যে, ২০২৫ সালে মূল্যস্ফীতি আবার বেড়ে ৪২.৪ শতাংশে পৌঁছাবে।
ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্র জানিয়েছে, গত সেপ্টেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৫৮ শতাংশে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ। রুটি ও শস্যজাতীয় পণ্যের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে এবং ফলের দাম বেড়েছে ৭৫ শতাংশ। সরকার নগদ সহায়তা ও ভর্তুকি দিলেও মুদ্রার মান কমে যাওয়ায় তা সাধারণ মানুষের জন্য পর্যাপ্ত হচ্ছে না।
নিষেধাজ্ঞা ও তেলের রাজস্ব হ্রাস
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ফলে দেশটির আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং লেনদেন ও তেল রপ্তানি সীমিত হয়ে পড়েছে। রয়টার্সের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার কারণে ২০২৫ সালের শেষ দিকে ইরানের তেল উৎপাদন দৈনিক ১ লাখ ব্যারেল কমেছে।
আইএমএফ-এর তথ্যমতে, ২০২৫ সালে ইরানের মোট রপ্তানি (তেল ও তেলবহির্ভূত) প্রায় ১৬ শতাংশ কমে ১০ হাজার কোটি ডলারে এবং আমদানি ১০ শতাংশ কমে ৯ হাজার ৮০০ কোটি ডলারে নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে। কেপলার ও ভর্টেক্সার মতো স্বাধীন জ্বালানি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো পূর্বাভাস দিয়েছে যে, তেল উৎপাদন দৈনিক ৫ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত কমতে পারে।
সরকারের আয়ের একটি বড় অংশ আসে তেল বিক্রি থেকে। ২০২১ সালে তেল থেকে আয় ছিল ২৩ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪ সালে বেড়ে ৫৬ বিলিয়ন ডলার হয়েছিল। তবে নিষেধাজ্ঞার কারণে এই আয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাজেট ঘাটতি ও জিডিপি
রাজস্ব আয় কমে যাওয়ায় এবং ব্যয় বাড়ার কারণে ইরান বড় ধরনের বাজেট ঘাটতির মুখে পড়েছে। ২০২৪ সালে বাজেট ঘাটতি ছিল জিডিপির ৪.১ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ৬ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভর্তুকি, বেতন ও সামাজিক সহায়তার খরচ বাড়ায় এই ঘাটতি আরও প্রকট হচ্ছে।
গত কয়েক বছরে অর্থনীতির গতি ধীর হয়ে এসেছে। ২০২১ ও ২০২২ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের ওপরে থাকলেও ২০২৪ সালে তা ৩.৭ শতাংশে নেমে আসে। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রবৃদ্ধির হার মাত্র ০.৩ থেকে ০.৬ শতাংশে নেমে আসতে পারে।
বেকারত্ব পরিস্থিতি
দেশটিতে সামগ্রিক বেকারত্বের হার কমলেও যুব বেকারত্ব একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২৪ সালের শেষ দিকে সামগ্রিক বেকারত্বের হার ৭.২ থেকে ৮.২ শতাংশে নেমে আসে। তবে তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ২০ থেকে ২৩ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করছে, যা জাতীয় গড়ের প্রায় তিনগুণ।
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.