আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে নির্বাচনের আগে আগে দেশে গুমের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যেত এমন চিত্র উঠে এসেছে গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে। কমিশনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ভোটের সময় ঘনিয়ে এলে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মী ও সমর্থকদের বেছে বেছে লক্ষ্যবস্তু করা হতো।

প্রতীকী ছবি

২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন গঠন করে। কমিশন চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেয়।

প্রতিবেদনের ১৬ নম্বর পাতায় উল্লেখ করা হয়েছে, নির্বাচনের আগে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের গণহারে আটক এবং গুম করার প্রবণতা ছিল নিয়মিত ঘটনা। বিশেষ করে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই প্রবণতা আরও তীব্র আকার ধারণ করে।

এই তিনটি নির্বাচনই প্রশ্নবিদ্ধ ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন অধিকাংশ রাজনৈতিক দল বর্জন করেছিল। আর ২০১৮ সালের নির্বাচন ‘রাতের ভোট’ হিসেবে পরিচিতি পায়- ভোটের আগেই ব্যালট বাক্স ভরে রাখার অভিযোগে।

কমিশনের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, বড় আন্দোলন, নিরাপত্তা সংকট ও নির্বাচনের সময়সূচির সঙ্গে গুমের উত্থান-পতনের স্পষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। যেমন, ২০১৩ সালে গুমের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের সরাসরি যোগসূত্র পাওয়া যায়। একই চিত্র দেখা যায় ২০১৮ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করেও।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে মোট ৯৪৮ জন গুমের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে নিখোঁজ ও পরে ফিরে আসা- উভয় শ্রেণির ভুক্তভোগী অন্তর্ভুক্ত। স্থায়ীভাবে নিখোঁজ রয়েছেন ১৫৭ জন।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট নিখোঁজের ৬৮ শতাংশ বিএনপি ও যুবদলের নেতাকর্মী এবং ২২ শতাংশ জামায়াত ও শিবিরের নেতাকর্মী। যদিও গুমের শিকারদের মধ্যে সংখ্যাগতভাবে জামায়াত ও এর সহযোগী সংগঠনের সদস্য বেশি, কিন্তু ফিরে না আসার হার তুলনামূলকভাবে বেশি বিএনপির ক্ষেত্রে।

কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, এই তথ্যগুলো প্রমাণ করে যে গুম কোনো সাধারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ঘটনা ছিল না; বরং এটি ছিল নির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের একটি কৌশল।

কমিশন ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৫৬৪টি গুমের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। এর মধ্যে সর্বাধিক ঘটনা ঘটে ২০১৬ সালে ২১৫টি। এরপর ২০১৭ সালে ১৯৪টি এবং ২০১৮ সালে ১৯২টি গুমের ঘটনা ঘটে।

অন্যান্য বছরের চিত্র- ২০০৯: ১০, ২০১০: ৩৪, ২০১১: ৪৭, ২০১২: ৬১, ২০১৩: ১২৮, ২০১৪: ৯৫, ২০১৫: ১৪১, ২০১৯: ১১৮, ২০২০: ৫১, ২০২১: ৫৬, ২০২২: ১১০, ২০২৩: ৬৫ এবং ২০২৪: ৪৭ জন।

২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনা দেশ ছাড়েন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কমিশনের কাছে মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে সংজ্ঞা অনুযায়ী গুম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে ২৮৭টি অভিযোগ ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ শ্রেণিভুক্ত।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নেতৃত্বে পরিবর্তনের সঙ্গে গুমের সংখ্যার ওঠানামার সম্পর্ক রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, ২০১৬ সালে র‍্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানকে সরানোর পর গুমের সংখ্যা কমতে দেখা যায়।

তবে কমিশন সতর্ক করে বলেছে, এর অর্থ এই নয় যে গুমের চর্চা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বরং অনেক ক্ষেত্রে মানুষ পরে কারাগার বা আদালতে হাজির হয়েছেন, আবার কেউ কেউ স্থায়ীভাবে নিখোঁজ থেকেছেন।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২১ সালের ডিসেম্বরে র‍্যাবের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা গুমের ঘটনায় সাময়িক প্রভাব ফেলেছিল। তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। সন্ত্রাসবাদ দমন ও অপরাধ প্রতিরোধমূলক আটক আইনকে বিরোধী মত দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হতো।

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.