কানাডা-চীন সম্পর্ক: দীর্ঘ টানাপোড়েন শেষে নতুন মোড় ও কৌশল
- Details
- by আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দীর্ঘ কয়েক বছরের কূটনৈতিক শীতলতা ও টানাপোড়েনের পর চীনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে মনোযোগ দিয়েছে কানাডা। বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অটোয়া তাদের পররাষ্ট্র নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে, যার অংশ হিসেবে কানাডীয় প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি সম্প্রতি বেইজিং সফর করেছেন।

পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে কানাডার সঙ্গে চীনের সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় ছিল। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে কানাডা হুয়াওয়ের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা মেং ওয়ানঝৌকে গ্রেপ্তার করলে দুই দেশের সম্পর্কে ফাটল ধরে। এর জেরে বেইজিং দুই কানাডীয় নাগরিককে আটক করে এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। যদিও ২০২১ সালে মেং মুক্তি পান, তবুও দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলেনি। বরং ২০২৩ সালে কানাডীয় আইন প্রণেতাকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে অটোয়া এক চীনা কূটনীতিককে বহিষ্কার করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর কানাডা চড়া শুল্ক আরোপ করলে সম্পর্ক তলানিতে পৌঁছায়। এমনকি ২০২৫ সালের নির্বাচনী প্রচারণার সময়ও প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি চীনকে কানাডার ‘সবচেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
তবে চলতি মাসের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী কার্নির বেইজিং সফরের মাধ্যমে সেই দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার অবসান ঘটেছে। ২০১৭ সালের পর এটিই কোনো কানাডীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রথম চীন সফর। বেইজিংয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে কার্নি বলেন, ‘বিশ্ব পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন হয়েছে।’
চার দিনের এই সফরে কার্নি চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে আলোচনা করেন। বিশ্লেষকরা এই সফরকে একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। সফরের সময় কার্নি বলেন, ‘নতুন বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হবে।’ তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডার সম্পর্ককে গভীর ও বিস্তৃত বলে উল্লেখ করলেও বেইজিংয়ের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ককে ‘বেশি স্থিতিশীল’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থায় ফাটল ধরায় কানাডা এখন নমনীয় এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট পররাষ্ট্রনীতির দিকে ঝুঁকছে। ম্যাকইওয়ান ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ফারহান চ্যাক বলেন, ‘যেখানে প্রয়োজন সহযোগিতা, যেখানে উচিত প্রতিযোগিতা এবং যেখানে সম্ভব সুরক্ষা—এটিই এখন কৌশল।’ বেইজিং-ভিত্তিক বিশ্লেষক আইনার ট্যাঙ্গেন মনে করেন, কানাডা এখন চীনকে ‘বিঘ্ন সৃষ্টিকারী শক্তি’র পরিবর্তে ২০০৫ সালের মতো ‘কৌশলগত অংশীদার’ হিসেবে দেখার চেষ্টা করছে। তবে তিনি উল্লেখ করেন, এই সম্পর্ক মূলত অর্থনীতি, জ্বালানি ও কৃষির মতো নির্দিষ্ট খাতের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে। নিরাপত্তা ও মানবাধিকার ইস্যুতে মতভেদ থেকেই যাবে।
হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনের পর অটোয়া ও ওয়াশিংটনের সম্পর্কের অবনতি এই সফরের অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। ট্রাম্প প্রশাসন বহুপাক্ষিক নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করায় এবং বাণিজ্যে অস্থিরতা তৈরি করায় কানাডা বিকল্প বাজার খুঁজছে। কানাডার রপ্তানির ৬৭.৩ শতাংশই যায় যুক্তরাষ্ট্রে, যা অটোয়ার জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই সফরের তাৎক্ষণিক ফলাফল হিসেবে দুই দেশের মধ্যে একটি প্রাথমিক বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে। এর আওতায় কানাডা বছরে ৪৯,০০০ চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি ৬.১ শতাংশ শুল্ক হারে আমদানির অনুমতি দেবে। বিনিময়ে চীন আগামী ১ মার্চ থেকে কানাডীয় ক্যানোলা তেলের ওপর শুল্ক ৮৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করবে। এছাড়া ক্যানোলা মিল, লবস্টার ও কাঁকড়ার মতো পণ্যগুলো ২০২৬ সাল পর্যন্ত চীনা শুল্কের আওতামুক্ত থাকবে।
কানাডার এই পদক্ষেপে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি ২৪ জানুয়ারি এক মন্তব্যে বলেন, ‘চীনের সঙ্গে চুক্তি করলে কানাডাকে ১০০ শতাংশ শুল্কের মুখে পড়তে হবে।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি মন্তব্য করেন, বেইজিং কানাডাকে ‘পুরোপুরি গিলে খাবে’। ডাভোসে কার্নির বক্তৃতার পর ট্রাম্প কানাডাকে তার ‘বোর্ড অফ পিস’ থেকে বাদ দেন। কার্নি তার বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘আমরা যখন কেবল একটি পরাশক্তির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করি, তখন আমরা দুর্বল অবস্থান থেকে আলোচনা করি।’
তবে কানাডার এই পথে হাঁটতে শুরু করেছে অন্য দেশগুলোও। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারও সম্প্রতি চীন সফর করেছেন, যা ২০১৮ সালের পর কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সফর। বিশ্লেষক ফারহান চ্যাকের মতে, কানাডার এই অবস্থান পুরোপুরি সম্পর্কচ্ছেদ নয় বরং ‘ঝুঁকি কমানোর কৌশল’। আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় চীনের সঙ্গে কানাডার মতের মিলকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত দিক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
আনাদোলু এজেন্সি অবলম্বনে
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.