নিজেদের রক্ষায় নতুন কৌশলে উপসাগরীয় দেশগুলো
- Details
- by আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে নিজেদের রক্ষায় অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলো। সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে নিজেদের নাগরিক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষাই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য বলে জানা গেছে। তবে হামলার মাত্রা বাড়লে আত্মরক্ষার্থে সীমিত পরিসরে ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার কথাও ভাবছে তারা।

গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) দেশগুলোর সরকার বলছে, তাদের প্রধান অগ্রাধিকার হলো জনগণ এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষা করা। কারণ, ওই অঞ্চলে শহর ও জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার পরিমাণ ক্রমশ বাড়ছে। এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক লিওনার্দো জাকোপো মারিয়া মাজুক্কো বলেন, ‘উপসাগরীয় দেশগুলো অত্যন্ত সতর্ক এবং সুপরিকল্পিত কৌশল অনুসরণ করছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘তাদের লক্ষ্য হলো নিজেদের ভূখণ্ড ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষা করা এবং বৃহত্তর সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত থাকা।’
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরুর পর থেকে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার, কুয়েত এবং ওমানসহ জিসিসি দেশগুলোতে শত শত ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আটকে দেওয়া হয়েছে। বেশ কয়েকটি উপসাগরীয় দেশের সরকার জানিয়েছে, বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা এবং পানি শোধনাগারের মতো বেসামরিক অবকাঠামোগুলোও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের অনাবাসিক ফেলো আন্না জ্যাকবস জানান, এই অঞ্চলের দেশগুলো একটি অভিন্ন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘সবগুলো উপসাগরীয় দেশের মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য থাকলেও বর্তমানে তারা একটি যৌথ জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন।’ তার মতে, তারা সবাই সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার উপায় খুঁজছে এবং উত্তেজনা যতটা সম্ভব কমানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জিসিসিভুক্ত দেশগুলো কোনো একক সমন্বিত কৌশল অনুসরণ করছে না। কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক সহকারী অধ্যাপক আলি বাকির জানান, দেশগুলো রাজনৈতিকভাবে একে অপরকে সমর্থন করার পাশাপাশি মূলত তাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ওপর নির্ভর করছে। তিনি বলেন, ‘তারা একে অপরের প্রতি দৃঢ় সমর্থন ব্যক্ত করলেও মূলত নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে।’ তিনি আরও জানান, তাদের এই হিসাব-নিকাশ এই উপলব্ধির ওপর ভিত্তি করে তৈরি যে, তারা নিজেদের রক্ষা করতে প্রস্তুত এবং সংঘাতের নেতিবাচক আর্থিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব সামলাতে সক্ষম। উপসাগরীয় সরকারগুলো এমন কোনো যুদ্ধে জড়াতে সতর্ক, যা তারা শুরু করেনি বা চায়ও না বলে জানান তিনি।
বর্তমানে উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে অংশ নিচ্ছে না। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, উপসাগরীয় ভূখণ্ডে হামলা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে। মাজুক্কো জানান, সরকারগুলো তাদের আত্মরক্ষার অধিকারের ওপর জোর দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘এই অবস্থান হামলা অব্যাহত থাকলে বা বাড়লে ইরানি ভূখণ্ডে হামলার সম্ভাবনা উন্মুক্ত রাখে।’ আলি বাকির সতর্ক করে বলেন, ‘অব্যাহত হামলা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ ফেলতে পারে এবং ওই অঞ্চলের আকাশসীমা রক্ষার আর্থিক ব্যয় বাড়াতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘এর ফলে তারা তাদের কৌশল প্রতিরক্ষা থেকে আক্রমণে পরিবর্তন করার জন্য প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়বে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যদি তারা শেষ পর্যন্ত এই পথ বেছে নেয়, তবে তার কারণ হবে ইরান তাদের বাধ্য করেছে।’
আলি বাকির জানান, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলেও উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটে পুরোপুরি যোগ দেওয়ার বদলে তাদের প্রতিক্রিয়া সীমিত রাখবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এটিকে ইরানের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্টে যোগ দেওয়া হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করবে, যা জিসিসি দেশগুলোর প্রকৃত উদ্দেশ্য নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন। এদিকে মাজুক্কো সতর্ক করে জানান, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে বারবার হামলা সরকারগুলোকে প্রতিশোধ নেওয়ার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তিনি বলেন, ‘পানি শোধনাগারগুলো উপসাগরীয় সমাজের জন্য অপরিহার্য জীবনরেখা। ইরানি হামলা যদি এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে বাড়তে থাকে, তবে উপসাগরীয় দেশগুলো সতর্কতার সঙ্গে আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হতে পারে।’
গত জানুয়ারিতে বিজ্ঞান সাময়িকী ন্যাচারে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলে বিশ্বের মোট কার্যকর পানি শোধনাগার ক্ষমতার প্রায় ৪২ শতাংশ রয়েছে। প্রায় ৫ হাজার শোধনাগার প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ৯০ লাখ ঘনমিটার পানি উৎপাদন করে, যা বিশ্বের অন্যতম পানিশূন্য এলাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাজুক্কো যোগ করেন, এ ধরনের প্রতিক্রিয়ায় বৃহত্তর বিমান অভিযানে যোগ দেওয়ার বদলে হামলার সঙ্গে জড়িত ইরানি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সীমিত আঘাত হানা হতে পারে। ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগের অন্যান্য সম্ভাব্য ব্যবস্থার মধ্যে অর্থনৈতিক বিকল্পও রয়েছে। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত দেশটিতে থাকা ইরানের শত শত কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করার কথা বিবেচনা করছে। আন্না জ্যাকবস বলেন, ‘উপসাগরীয় দেশগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে যে, তারা সামরিক চাপের আগে ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করতে ইচ্ছুক, যেমনটা সংযুক্ত আরব আমিরাত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পর্ক সীমিত করার মাধ্যমে করতে পারে।’
প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি উপসাগরীয় সরকারগুলো কূটনীতির মাধ্যমেও উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছে। ওই অঞ্চলের নেতারা বারবার উত্তেজনা প্রশমন এবং আলোচনার আহ্বান জানাচ্ছেন। গত সপ্তাহে জিসিসি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মন্ত্রীরা সংকট নিয়ে আলোচনা করতে একটি জরুরি বৈঠক করেন এবং আরব দেশগুলোতে হামলা বন্ধ করার জন্য ইরানের প্রতি আহ্বান জানান। সংঘাত শুরুর পর থেকে উপসাগরীয় দেশগুলো ধেয়ে আসা মিসাইল এবং ড্রোন থামাতে বিমান-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করছে। ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ (আইএনএসএস) এবং কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, সংঘাতের প্রথম আট দিনে ইরান আরব দেশ এবং ইসরায়েলে ৭০০টিরও বেশি ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ মিসাইল হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যবস্তুতে এবং ৪০ শতাংশ ইসরায়েলের দিকে পরিচালিত হয়েছিল। পাশাপাশি বিশ্লেষকদের ধারণা, সংঘাত শুরুর পর থেকে ইরান থেকে আরব দেশ ও ইসরায়েলের দিকে ২ হাজারেরও বেশি ড্রোন নিক্ষেপ করা হয়েছে।
মাজুক্কো জানান, ওই অঞ্চলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো দীর্ঘস্থায়ী হামলা মোকাবিলার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘তাদের প্রতিরক্ষা কাঠামো মূলত আকাশযুদ্ধের দিকে নিবদ্ধ এবং এটি এমন একটি স্তরভিত্তিক ব্যবস্থা হিসেবে তৈরি করা হয়েছে, যা ধারাবাহিক আক্রমণ সামলাতে সক্ষম।’ তিনি আরও বলেন, ‘যদিও সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা কঠিন, তবে প্রাপ্ত তথ্য থেকে বোঝা যায় যে, তাদের প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থাগুলো প্রধান শহর এবং কৌশলগত স্থাপনা রক্ষায় অনেকাংশে কার্যকর হয়েছে।’ তবে দীর্ঘ মেয়াদে এই স্তরের প্রতিরক্ষা বজায় রাখা কঠিন হতে পারে। মাজুক্কো বলেন, ‘স্ট্যান্ডার্ড বিমান প্রতিরক্ষা অনুশীলনে সাধারণত সফলভাবে বাধা দেওয়ার জন্য প্রতিটি ধেয়ে আসা শত্রু প্রজেক্টাইলের বিপরীতে দুটি ইন্টারসেপ্টর ফায়ার করতে হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী অভিযানের সময় এটি মিসাইল মজুত দ্রুত শেষ করতে পারে।’
দামি ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের ওপর চাপ কমাতে উপসাগরীয় সামরিক বাহিনী ড্রোন এবং স্বল্প ব্যয়ের আকাশপথের হুমকি মোকাবিলায় অন্যান্য সরঞ্জামও ব্যবহার করছে বলে জানান মাজুক্কো। তিনি বলেন, ‘কাতার উপকূলীয় অঞ্চলের দিকে ধেয়ে আসা আকাশপথের হুমকি থামাতে সারফেস কমব্যাট্যান্ট মোতায়েন করেছে, অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত শাহেদ-টাইপের ড্রোন ধ্বংস করতে এএইচ-৬৪ অ্যাপাচি অ্যাটাক হেলিকপ্টার ব্যবহার করেছে।’
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.