শীর্ষে থেকে এখন মাত্র ৩৫ জন: কেন কমছে জাতিসংঘ মিশনে বাংলাদেশ পুলিশ?
- Details
- by ২৪ ডেস্ক
একসময় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ পুলিশের উপস্থিতি ছিল ঈর্ষণীয়। বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের জন্য বাংলাদেশি পুলিশ সদস্যরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে।

এক সময় যেখানে শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যসংখ্যা কখনো ২৩০-এর নিচে নামেনি, সেখানে বর্তমানে বিভিন্ন মিশনে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ৩৫ জন। এই বড় পতনের পেছনে জাতিসংঘের তহবিল সংকটের পাশাপাশি প্রশাসনিক দুর্বলতা ও সমন্বয়ের অভাবকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশ পুলিশ ১৯৮৯ সালে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নেয়। গত ৩৭ বছরে বাহিনীটির ২১ হাজার ৮১৬ জন সদস্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তিরক্ষার দায়িত্ব পালন করেছেন।
এই দীর্ঘ যাত্রায় ২৪ জন পুলিশ সদস্য জীবন উৎসর্গ করেছেন এবং আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১৫ জন। আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদানের জন্য বাংলাদেশ পুলিশ বহুবার প্রশংসিতও হয়েছে।
বিশেষ করে ২০১৩ ও ২০১৬ সালে বিশ্বব্যাপী শান্তিরক্ষা মিশনে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ছিল সর্বোচ্চ।
পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে পুলিশের জন্য নির্ধারিত ‘কাউন্সেলর’ পদে এখনো কাউকে নিয়োগ না দেওয়া।
শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে পুলিশ কন্টিনজেন্ট পাঠানো, জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, নতুন মিশনের সুযোগ সম্পর্কে আলোচনা এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের জন্য এই পদটি ২০১৯ সালে সৃষ্টি করা হয়।
ফলে বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষে জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সরাসরি যোগাযোগ ও প্রয়োজনীয় লবিং কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জাতিসংঘের বিভিন্ন সদস্য রাষ্ট্র তাদের স্থায়ী মিশনে পুলিশ প্রতিনিধি নিয়োগ দিয়ে থাকে। এসব কর্মকর্তা জাতিসংঘের ডিপার্টমেন্ট অব পিস অপারেশনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখেন এবং নতুন মিশনে জনবল পাঠানো থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রশাসনিক বিষয় সমন্বয় করেন।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বর্তমানে এই দায়িত্ব অনেকাংশে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সেনাবাহিনী ও পুলিশের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের কাঠামো, নির্বাচন পদ্ধতি ও দায়িত্ব আলাদা হওয়ায় পুলিশের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো সবসময় যথাযথভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হয় না।
এ কারণেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ পুলিশের অংশগ্রহণ ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সংকটের পেছনে বৈশ্বিক বাস্তবতাও রয়েছে।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অর্থায়নকারী বড় দেশগুলোর অনুদান কমে যাওয়ায় সামগ্রিকভাবেই বিভিন্ন মিশনের আকার ছোট হচ্ছে। ফলে অনেক দেশ থেকেই শান্তিরক্ষীর সংখ্যা কমানো হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, বাংলাদেশ পুলিশের অংশগ্রহণ তুলনামূলক বেশি কমেছে, কারণ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ ও প্রতিনিধিত্ব দুর্বল হয়ে পড়েছে। শান্তিরক্ষা মিশন শুধু আন্তর্জাতিক মর্যাদার বিষয় নয়, এটি অর্থনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ।
জাতিসংঘ মিশনে দায়িত্ব পালনকারী একজন পুলিশ সদস্য মাসিক দুই হাজার থেকে সাত হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত ভাতা পেয়ে থাকেন। এছাড়া যানবাহন, সরঞ্জাম ও অন্যান্য লজিস্টিক সহায়তার বিপরীতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ আসে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জনবল ও সরঞ্জাম ভাতা বাবদ ২০২৩ সাল পর্যন্ত চার হাজার কোটির বেশি টাকা আয় করেছে বাংলাদেশ পুলিশ। একই সঙ্গে নিহত বা আহত সদস্যদের পরিবারও আন্তর্জাতিক ক্ষতিপূরণ সুবিধা পেয়ে থাকে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সম্প্রতি একটি শান্তিরক্ষা মিশনের জন্য বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা ও কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছিল জাতিসংঘ। কিন্তু প্রয়োজনীয় উপস্থাপনা ও সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে সেই সুযোগ কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। এটি ভবিষ্যতের জন্যও উদ্বেগের কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যদিও বর্তমান পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জের, তারপরও নতুন করে শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ চলছে। হাইতিতে সম্ভাব্য মিশনের জন্য ইতোমধ্যে ৫২৫ জন পুলিশ সদস্যকে প্রস্তুত করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে ওঠা গেলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ পুলিশের হারানো অবস্থান পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে।
পুলিশ সদর দপ্তর ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে ‘কাউন্সেলর’ নিয়োগের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানিয়েছে। তবে এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিযোগিতা বাড়ার এই সময়ে কেবল দক্ষ জনবল থাকাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কার্যকর কূটনৈতিক যোগাযোগ, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়।
অন্যথায়, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ পুলিশের যে ঐতিহ্য ও সুনাম গড়ে উঠেছে, তা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.