ফুটবল আসলে কী? কেবলই কি ৯০ মিনিটের কিছু কৌশল, ট্যাকটিকস আর গায়ের জোর? নাকি তার চেয়েও বেশি কিছু? ফুটবল মাঝে মাঝে এমন কিছু গল্প লেখে, যা কোনো নামী ঔপন্যাসিকও কল্পনা করতে পারেন না। আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলের এক চিলতে দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। মানচিত্রে খুঁজলে যে দেশকে বিন্দু ছাড়া আর কিছুই মনে হবে না, সেই দেশটাই যখন বিশ্বমঞ্চে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায়, তখন চামড়ার গোলকটার প্রতি ভালোবাসা আরও হাজার গুণ বেড়ে যায়।

ফুটবল রোমান্টিকদের নতুন নায়ক: কেপ ভার্দের ‘নীল হাঙর’ ও এক অবিশ্বাস্য রূপকথা
কেপ ভার্দের আরেকটি রূপকথা

রূপকথার শুরু যেখানে:

স্পেনের সাথে খেলার পর সারা বিশ্বের সংবাদমাধ্যমগুলো যখন কেপ ভার্দের এই অবিশ্বাস্য উত্থান নিয়ে কলাম লিখছিল, তখন তাদের পরতে পরতে ছিল এক পরম বিস্ময়। মাত্র সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষের একটা দেশ। ফুটবলারদের অনেকেই হয়তো পার্ট-টাইম চাকরি করেন, কেউবা খেলেন পর্তুগাল বা ফ্রান্সের নিচু স্তরের লিগে। অথচ, মাঠের সবুজ ঘাসে যখন তারা পা রাখলেন, তখন মনে হলো তারা কোনো যুদ্ধজয়ের নেশায় নেমেছেন। বিশ্বকাপের মঞ্চে তাদের অভিষেকটা কেবল একটা দলের অংশগ্রহণ ছিল না, ওটা ছিল একটা জাতির অস্তিত্বের জানান দেওয়া। কেপ ভার্দে প্রমাণ করেছে—'ফুটবলে হৃদয়ের গভীরতা আর ইচ্ছাশক্তি যদি থাকে, তবে বাজেটের শূন্যগুলো স্রেফ কাগজ-কলমের হিসাব মাত্র।'

নীল হাঙরদের নীল নকশা:

তাদের ডাকনাম ‘ব্লু শার্কস’ বা নীল হাঙর। সমুদ্রের নীল জলরাশি যাদের ঘিরে রেখেছে, তাদের রক্তেও তো সেই উত্তাল ঢেউ থাকবেই। শুনেছি কেপ ভার্দের ফুটবলাররা যখন অনুশীলনে যেতেন, তখন নাকি তাদের অনেককে সাধারণ মিনিবাসে চড়ে যাতায়াত করতে হতো। যে দলের ফুটবলারদের তারকাখ্যাতি নেই, বিশ্বজোড়া গ্ল্যামার নেই, তাদের সম্বল ছিল কেবল একে অপরের প্রতি নিরেট বিশ্বাস। মাঠে তাদের খেলায় কোনো আড়ষ্টতা ছিল না। ট্যাকটিক্যাল নিখুঁততার চেয়েও সেখানে বেশি ছিল সহজাত আনন্দ। ওই যে লাতিন আমেরিকার ‘জোগো বোনিতো’ বা সুন্দর ফুটবল, তার একটা আফ্রিকান সংস্করণ যেন দেখা গেল তাদের পায়ে। বড় বড় দলগুলো যখন কোটি কোটি টাকার কোচ আর আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে হিসেবি ফুটবল খেলছে, তখন কেপ ভার্দে খেলল মন খুলে, কোনো হারানোর ভয় ছাড়া।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে আমরা অনেক রূপকথা দেখেছি। কিন্তু কেপ ভার্দের এই গল্পটা একটু আলাদা। এটা কোনো রূপকথার রাজপুত্রের গল্প নয়, এটা খেটে খাওয়া কিছু মানুষের গল্প, যারা ফুটবলকে ভালোবেসেছিল নিঃশর্তভাবে। ম্যাচ শেষে যখন তাদের কোচ আবেগে চোখের জল মুছছিলেন, কিংবা গ্যালারিতে বসে থাকা গুটিকয়েক সমর্থক যখন ড্রাম বাজিয়ে নাচছিলেন—তখন মনে হচ্ছিল, ফুটবল তো আসলে এই আদিম আনন্দের জন্যই তৈরি হয়েছিল। বিশ্বকাপে তারা কতদূর গেল, কটা গোল করল—সেই পরিসংখ্যান কিছুদিন পর হয়তো ধুলো জমা ফাইলের নিচে চাপা পড়ে যাবে। কিন্তু তারা যে রোমাঞ্চ আর মুগ্ধতা ছড়িয়ে দিয়ে গেল, তা থেকে যাবে চিরকাল। খেলা শেষে মাঠের এক কোণে বসে যখন কেপ ভার্দের ডিফেন্ডার ক্লান্ত শরীরে আকাশের দিকে তাকিয়ে হাসছিলেন, তখন ধারাভাষ্যকার বলছিলেন, 'তারা হেরে যেতে পারে, কিন্তু তারা ফুটবল রোমান্টিকদের মন জয় করে নিয়েছে।'

আসলেই তো, ফুটবল তো কেবল ট্রফি জয়ের গল্প নয়; ফুটবল হলো কেপ ভার্দের মতো ছোট ছোট স্বপ্নের ডানা মেলার গল্প। আটলান্টিকের সেই ছোট্ট দ্বীপের হাওয়া আজ যেন বিশ্ব ফুটবলের চেনা সুবাসকে একটু বদলে দিল। অভিবাদন, নীল হাঙরেরা! তোমরা আমাদের মনে করিয়ে দিলে, রূপকথাগুলো এখনো সত্যি হয়। ফুটবল আসলেই এক পরম অনিশ্চয়তার খেলা! যেখানে বড় বড় নাম, সোনালী ইতিহাস আর কোটির অঙ্কে মাপা ট্যাকটিকস মাঠের ঘাসে আছাড় খায় স্রেফ বুকভরা সাহস আর এক চিলতে বিশ্বাসের কাছে। মার্সেলো বিয়ালসার উরুগুয়ে হয়তো ভেবেছিল ফ্লোরিডার তপ্ত রোদে তারা লাতিন ফুটবলের ছন্দ তুলবে। কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছিল, আটলান্টিক থেকে ধেয়ে আসা ‘নীল হাঙরদের’ কামড় কতটা বিষাক্ত হতে পারে। স্পেনকে রুখে দিয়ে কেপ ভার্দে যে রূপকথার প্রথম অধ্যায় লিখেছিল, সেটা উরুগুয়ের জন্য হওয়া উচিত ছিল এক চরম সতর্কবার্তা।

কিন্তু হায়, ‘পাগলা’ বিয়ালসা আর তার বিশ্বসেরা ফুটবল অভিজাতরা সেই সতর্কবার্তা পড়ারই তর সইলেন না! ফলাফল? ব্রিস্টল শহরের সমান জনসংখ্যার এক পুঁচকে দেশের কাছে লাতিন পরাশক্তিদের আরও একবার মুখ থুবড়ে পড়া। ফুটবল রোমান্টিকদের জন্য এর চেয়ে চোখ জুড়ানো, মন ভরানো দৃশ্য আর কী-ই বা হতে পারে!

খাঁচায় বন্দি বিয়ালসা, খাদের কিনারায় উরুগুয়ে:

উরুগুয়ের ফুটবলের সঙ্গে আমাদের পরিচয় সেই ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপ থেকে। ঐতিহ্য আর অহংকার তাদের মজ্জায়। কিন্তু এবারের গ্রুপ 'এইচ'-এর সমীকরণটা তাদের জন্য এক গোলকধাঁধা বানিয়ে ছেড়েছে এই দ্বীপরাষ্ট্রটি। প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবকে হারাতে না পারার পর, কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে এই ড্র উরুগুয়ের বিশ্বকাপ টিকিয়ে রাখাকেই এখন এক মস্ত বড় সুতোর ওপর ঝুলিয়ে দিল। গ্রুপের শেষ ম্যাচে তাদের সামনে দাঁড়িয়ে এখন স্প্যানিশ আর্মাডা। ম্যাচটা এখন উরুগুয়ের জন্য বাঁচা-মরার, যেখানে এক চুল ভুল হলেই ধরতে হবে বাড়ির পথ। অথচ বিয়ালসার মতো মায়েস্ত্রো ডাগআউটে বসেও এই ধাঁধার কোনো উত্তর মেলাতে পারছেন না।

সমুদ্রের হাঙরেরা এখন মহাসমুদ্রে:

অন্যদিকে কেপ ভার্দে? তারা এখন উড়ছে, ডানা মেলে ভাসছে ফুটবলের নীল আকাশে। আগামী শুক্রবার সৌদি আরবের বিপক্ষে ম্যাচ। যে আত্মবিশ্বাস আর ক্ষুধা এই দলটার চোখে-মুখে, তাতে সৌদিকে চূর্ণ করে দেওয়া এখন আর কোনো অলৌকিক কল্পনা নয়। এমনকি যদি তারা ড্র-ও করে, তিন পয়েন্টের সমীকরণ নিয়ে শেষ ৩২-এ পা রাখাটা তাদের জন্য অসম্ভব কিছু নয়। বিশ্বের সংবাদমাধ্যমে পাতা ওল্টালে এখন একটাই নাম—‘ব্লু শার্কস’। যে হাঙরেরা এতদিন সাঁতার কাটত নিজেদের চেনা উপকূলে, তারা এখন বিশ্ব ফুটবলের মহাসমুদ্রে বড় বড় তিমির পিঠে চড়ে বেড়াচ্ছে। এবারের বিশ্বকাপের আসল গল্পটা তো তারাই লিখছে, বাকিরা স্রেফ পার্শ্বচর!

ব্যর্থতার কাঠগড়ায় উরুগুয়ে:

নামের পাশে যাদের এত এত গ্ল্যামার, তাদের এমন ছন্নছাড়া পারফরম্যান্স আসলেই দৃষ্টিকটু। উরুগুয়ে এবার যা খেলছে, তাকে স্রেফ 'অনূর্ধ্ব-মানের' বললেও কম বলা হয়। মাঠের ফুটবলে কোনো তাড়না নেই, নেই কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা। বিয়ালসা হয়তো ডাগআউটে দাঁড়িয়ে মাথার চুল ছিঁড়ছেন, কিন্তু মাঠের এগারো জন যেন কেপ ভার্দের রূপকথার সম্মোহনে আচ্ছন্ন হয়ে রইলেন। শেষ বাঁশির পর ফ্লোরিডার গ্যালারিতে যখন কেপ ভার্দের গুটিকয়েক সমর্থক ড্রাম বাজিয়ে নাচছিলেন, তখন মাঠের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা উরুগুয়ের ফুটবলারদের দেখে মনে হচ্ছিল—তারা কোনো ফুটবল ম্যাচ হারেননি, তারা আসলে সময়ের এক চরম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন। ফুটবল শুধু ইতিহাস দিয়ে খেলা যায় না, ফুটবলটা খেলতে হয় বুক চিরে, রক্ত জল করে। কেপ ভার্দে সেটাই করে দেখাল, আর উরুগুয়ে রয়ে গেল এক রাশ হতাশার চাদরে ঢাকা।

—ডা. আবু হেনা মোস্তফা বেলাল, চিকিৎসক, ক্রীড়া অনুরাগী ও লেখক।

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.