ব্যাংকের ১০০ টাকার ৪০ টাকাই কোটিপতিদের!
- Details
- by ২৪ ডেস্ক
দেশের সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মোট আমানতের প্রায় ৪০ শতাংশই কোটিপতিদের দখলে। অর্থাৎ, ব্যাংকে গচ্ছিত মোট অর্থের পরিমাণ ১০০ টাকা হলে এর মধ্যে ৪০ টাকাই কোটিপতিদের। অন্যদিকে, ব্যাংকগুলোর মোট হিসাবের প্রায় ৯০ শতাংশই ক্ষুদ্র হিসাবধারী হলেও তাদের আমানতের পরিমাণ মাত্র ৪ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যানে এসব তথ্য উঠে এসেছে। শুক্রবার (১০ জুলাই) প্রকাশিত এই পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ব্যাংকে গচ্ছিত মোট অর্থের ৯৬ শতাংশই কোটিপতি বা বিপুল সম্পদের অধিকারীদের। অথচ মোট ব্যাংক হিসাবের ১ শতাংশেরও কম কোটিপতিদের দখলে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জানান, এই পরিসংখ্যানে শুধু ব্যক্তিগত হিসাব নয়, বরং বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাবও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ফলে ব্যক্তিগত হিসাবের তুলনায় প্রাতিষ্ঠানিক হিসাবে আমানতের পরিমাণ স্বাভাবিকভাবেই বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ মাসের শেষে সব ব্যাংকে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ২১ লাখ ৫৮ হাজার ২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ কোটি থেকে ৫০ কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবগুলোতে গচ্ছিত ছিল ৮ লাখ ৫৯ হাজার ১৬২ কোটি টাকা, যা মোট আমানতের ৩৯ দশমিক ৮১ শতাংশ। অন্যদিকে, ১ লাখ থেকে ৯৯ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত থাকা হিসাবগুলোতে গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ ১২ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা, যা মোট আমানতের প্রায় ৫৬ শতাংশ। ১ টাকা থেকে ৯৯ হাজার টাকা পর্যন্ত আমানত থাকা হিসাবগুলোতে রয়েছে মাত্র ৮৯ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা, যা মোট আমানতের মাত্র ৪ শতাংশ।
দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট আমানত হিসাবের সংখ্যা ১৮ কোটি ২৬ লাখ ১২ হাজার ১৫টি। এর মধ্যে ১ কোটি টাকার বেশি থেকে ৫০ কোটি টাকার ওপরে আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৮৫টি। ১ লাখ থেকে ১ কোটি টাকার কম আমানত থাকা হিসাব রয়েছে ১ কোটি ৯১ লাখ ১৮ হাজার ১৮০টি। আর ১ টাকা থেকে ১ লাখ টাকার কম আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা ১৬ কোটি ৩৩ লাখ ৫৭ হাজার ৩৫০টি।
গত তিন মাসে নতুন আমানতের একটি বড় অংশ কোটিপতিদের হিসাবে জমা হয়েছে। ডিসেম্বর শেষে কোটিপতিদের হিসাবে গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৩৬ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। মার্চ শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ লাখ ৫৯ হাজার ১৬২ কোটি টাকায়। অর্থাৎ তিন মাসে এসব হিসাবে আমানত বেড়েছে প্রায় ২২ হাজার ৭৯২ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকিং খাতে মোট আমানত বেড়েছে ৫৭ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা এবং ব্যাংক হিসাব বেড়েছে প্রায় ৪৭ লাখ। অর্থাৎ, ডিসেম্বর থেকে মার্চের মধ্যে নতুন আমানতের প্রায় অর্ধেকই যুক্ত হয়েছে কোটিপতিদের হিসাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, অর্থের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে ব্যাংকের আমানতকে ২৪টি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে ১ লাখ টাকার নিচে আমানতের জন্য পাঁচটি শ্রেণি রয়েছে। ১ লাখ থেকে ১ কোটি টাকার কম আমানতের জন্য রয়েছে নয়টি শ্রেণি। এছাড়া ১ কোটি থেকে ৫০ কোটি টাকার বেশি আমানতের জন্য দশটি শ্রেণি রয়েছে। সম্মিলিতভাবে সবচেয়ে বেশি আমানত রয়েছে ৫০ কোটি টাকার বেশি অর্থ জমা থাকা হিসাবগুলোতে।
মার্চ শেষে ৫০ কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ছিল মাত্র ২ হাজার ৭৪টি। এসব হিসাবে মোট গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ ৩ লাখ ৬ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ, গড়ে প্রতিটি হিসাবে প্রায় ১৪৮ কোটি টাকা রয়েছে, যার বড় অংশই ধনকুবেরদের। কোটি টাকার ওপরে আমানতকারীদের মধ্যে ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান উভয়ই রয়েছে।
ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা জানান, ব্যক্তিগত হিসাবের পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাবও রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক হিসাবে গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ ব্যক্তিগত হিসাবের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি হয়। বিশেষ করে বড় সরকারি প্রতিষ্ঠান, মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন প্রকল্পের বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যাংকে জমা থাকে। ফলে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত হিসাবের সংখ্যা বেশি হলেও কোটি বা শত কোটি টাকার হিসাবগুলোতে অর্থের পরিমাণ অনেক বেশি। কোটি টাকার বেশি সম্পদশালী কিছু ব্যক্তি অনেক সময় কোম্পানির নামেও ব্যাংকে অর্থ জমা রাখেন, যার কারণে কোটিপতিদের হিসাবে আমানতের পরিমাণ বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে. মুজেরি জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া পরিসংখ্যানে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান উভয় ধরনের ব্যাংক হিসাবই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক হিসাবে স্বাভাবিকভাবেই ব্যক্তিগত হিসাবের চেয়ে বেশি আমানত থাকে। কারণ, বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যবহারের সুযোগ থাকা অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। একইভাবে, বেসরকারি খাতেও অনেক ব্যবসার শত কোটি টাকার হিসাব রয়েছে। তাই সংখ্যার দিক থেকে সাধারণ আমানত হিসাব বেশি হলেও, কোটিপতিদের হিসাবে অর্থের পরিমাণ অনেক বেশি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ডিসেম্বর থেকে মার্চ এই তিন মাসে কোটিপতিদের হিসাবের সংখ্যা এবং এসব হিসাবে আমানত উভয়ই বেড়েছে। ডিসেম্বর শেষে ১ কোটি থেকে ৫০ কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪টি। মার্চ শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৮৫টিতে। অর্থাৎ তিন মাসে কোটিপতি হিসাব বেড়েছে ২ হাজার ৪৪১টি। এ সময়ে এই শ্রেণিতে আমানত বেড়েছে প্রায় ২২ হাজার ৭৯২ কোটি টাকা।
মোট আমানত বৃদ্ধির একটি বড় অংশ কোটিপতিদের হিসাব থেকে এসেছে। এই তিন মাসে ব্যাংকিং খাতে মোট আমানত বেড়েছে ৫৭ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা, যার প্রায় অর্ধেকই কোটিপতি আমানতকারীদের সঙ্গে যুক্ত। তবে এই বৃদ্ধি সব শ্রেণিতে সমান নয়। কোটিপতিদের হিসাবের মধ্যেও ভিন্নতা রয়েছে, যেখানে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে ৫০ কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবগুলোতে।
ডিসেম্বর শেষে এই শ্রেণিতে ১ হাজার ৯৯৭টি হিসাব ছিল, যেখানে আমানতের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৮১ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকা। মার্চ শেষে এসব হিসাব বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৭৪টিতে এবং আমানত পৌঁছায় ৩ লাখ ৬ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকায়। ফলে তিন মাসে এই শ্রেণিতে আমানত বেড়েছে ২৪ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা, যা কোটিপতি শ্রেণির প্রবৃদ্ধির প্রধান অংশ।
বিপরীতদিকে, কিছু নির্দিষ্ট কোটিপতি হিসাবের শ্রেণিতে আমানত কমেছে। উদাহরণস্বরূপ, ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা আমানত থাকা হিসাবগুলো। ডিসেম্বর শেষে এই শ্রেণিতে আমানত ছিল ৩৯ হাজার ১০ কোটি টাকা, যা মার্চে কমে দাঁড়ায় ৩৭ হাজার ১৫০ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এই শ্রেণিতে ১ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা কমেছে। পাশাপাশি, তিন মাসে ২০ থেকে ২৫ কোটি, ২৫ থেকে ৩০ কোটি, ৩৫ থেকে ৪০ কোটি এবং ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকা আমানত থাকা হিসাবগুলোতেও অর্থের পরিমাণ কমেছে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জানান, সম্প্রতি ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের প্রবাহ বেড়েছে। এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, চলতি বছরের প্রথম তিন মাস ছিল নির্বাচনের সময় এবং পবিত্র ঈদুল ফিতর। নির্বাচনের সময় ব্যাংক থেকে প্রচুর অর্থ বেরিয়ে যায়। ঈদের সময়ও প্রাতিষ্ঠানিক অর্থ তোলা হয়। এছাড়া, ব্যাংকিং খাতের ওপর আমানতকারীদের আস্থা পুরোপুরি ফিরে না আসায় অনেকেই ব্যাংক থেকে টাকা তুলে অন্য কোথাও বিনিয়োগ করছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা আমানত থাকা ব্যাংক হিসাবগুলোতে সবচেয়ে কম অর্থ রয়েছে। মার্চ শেষে এমন হিসাবগুলোতে মোট আমানত ছিল ৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা। ডিসেম্বর শেষে এই পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৫২১ কোটি টাকা, যা তিন মাসে এই শ্রেণির আমানতে সামান্য হ্রাসের ইঙ্গিত দেয়। এছাড়া এই শ্রেণির হিসাবের সংখ্যাও কমেছে। ডিসেম্বর শেষে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা আমানতের হিসাব ছিল ৬৩ লাখ ৪১ হাজার ৬১৮টি। মার্চে তা কমে দাঁড়ায় ৬৩ লাখ ৩৮ হাজার ৭৫১টিতে।
অন্যদিকে, ব্যাংক হিসাবের সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বড় শ্রেণিটি হলো ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আমানত থাকা হিসাব। মার্চ শেষে এই শ্রেণিতে হিসাবের সংখ্যা ছিল ১৩ কোটি ৭৭ লাখ ৯৩ হাজার ৫১২টি, যেখানে মোট আমানত ছিল ৭ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা। ডিসেম্বর শেষে এমন হিসাব ছিল ১৩ কোটি ৪৪ লাখ ৩০ হাজার ৯৫টি, এবং আমানত ছিল ৭ হাজার ৬৫ কোটি টাকা।
ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বিশ্লেষকরা জানান, ব্যাংকে সাধারণ মানুষের হিসাবের সংখ্যা বেশি হলেও তাদের গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। এই শ্রেণির বেশিরভাগই শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী বা নিম্ন আয়ের মানুষ। তারা বেতন বা দৈনন্দিন লেনদেনের জন্য ব্যাংক ব্যবহার করেন, কিন্তু সাধারণত বড় অঙ্কের সঞ্চয় করেন না। অনেক চাকরিজীবী মাসিক সঞ্চয় করেন, যারা ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকার কিস্তিতে বিভিন্ন সঞ্চয় প্রকল্পে অংশ নেন। এর ফলেই ক্ষুদ্র হিসাবধারীদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.