সস্তা, দ্রুত, নিখুঁত ও প্রাণঘাতী: ‘খাইবার শেকান’ ইরানের সবচেয়ে কার্যকর ক্ষেপণাস্ত্র
- Details
- by আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সংঘাতের নতুন অধ্যায়ে ইরানের সবচেয়ে আলোচিত অস্ত্রগুলোর একটি হয়ে উঠেছে ‘খাইবার শেকান’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। তুলনামূলক কম খরচে তৈরি, দ্রুত মোতায়েনযোগ্য এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ফাঁকি দেওয়ার সক্ষমতার কারণে ক্ষেপণাস্ত্রটি এখন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। খবর ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধু ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষমতাই নয়, বরং এর ব্যবহারে ইরানের নতুন কৌশলই সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করছে। বিভিন্ন গতিপথ, ড্রোন এবং অন্যান্য ক্ষেপণাস্ত্রের সমন্বয়ে একযোগে হামলা চালিয়ে প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে তেহরান।
খাইবার শেকান একটি মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যার পাল্লা প্রায় ৯০০ মাইল (প্রায় ১,৪৫০ কিলোমিটার)। এই দূরত্ব থেকে এটি মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।
বিশ্লেষকদের মতে, আগের প্রজন্মের অনেক ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের আগে দীর্ঘ সময় ধরে জ্বালানি ভরতে হতো। কিন্তু খাইবার শেকান আগে থেকেই জ্বালানিপূর্ণ অবস্থায় সংরক্ষণ করা যায়। ফলে প্রয়োজনের মুহূর্তে খুব দ্রুত ট্রাক বা মোবাইল লঞ্চার থেকে এটি উৎক্ষেপণ সম্ভব হয়।
এই বৈশিষ্ট্য ক্ষেপণাস্ত্রটিকে সহজে স্থানান্তরযোগ্য করে তুলেছে এবং শত্রুপক্ষের আগাম হামলা থেকে রক্ষা পাওয়ার সুযোগও বাড়িয়েছে।
খাইবার শেকানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো এর কিছু সংস্করণে থাকা ম্যানুভারেবল ওয়ারহেড।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রটি লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি পৌঁছালে এর বিস্ফোরক বহনকারী অংশ মূল কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর ঘণ্টায় প্রায় ৬ হাজার মাইল গতিতে লক্ষ্যবস্তুর দিকে ধেয়ে যাওয়ার সময়ও এটি নিজের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে
সাধারণ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নির্ধারিত গতিপথে চললেও খাইবার শেকানের এই বৈশিষ্ট্য রাডার ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য এটিকে আরও কঠিন লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরান শুধু খাইবার শেকান ব্যবহার করেনি; একই লক্ষ্যবস্তুতে একযোগে ড্রোন, তুলনামূলক কম আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং খাইবার শেকান ছুড়ে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করার কৌশল নিয়েছে।
এই বহুমাত্রিক হামলার ফলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে একই সময়ে বিভিন্ন ধরনের হুমকি মোকাবিলা করতে হচ্ছে।যদিও যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে, তবে কয়েকটি প্রতিরক্ষা ভেদ করে নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, খাইবার শেকানের সবচেয়ে বড় সুবিধা এর কম উৎপাদন ব্যয়। ইরান এ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রকৃত ব্যয় প্রকাশ না করলেও সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে, তার তুলনায় খাইবার শেকান অনেক সস্তা।
বিভিন্ন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত একটি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মূল্য ২ মিলিয়ন থেকে ১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। ফলে তুলনামূলক কম খরচে তৈরি বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে প্রতিপক্ষের ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চাপে ফেলার সুযোগ পাচ্ছে ইরান।
সাবেক মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) প্রধান অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল জোসেফ ভোটেলের মতে, ইরান প্রতিটি সংঘাত থেকেই শিক্ষা নিচ্ছে এবং দ্রুত নিজেদের কৌশল পরিবর্তন করছে।
তার ভাষ্য, ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি দীর্ঘদিনের এবং তারা প্রতিনিয়ত নতুন অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আরও কার্যকর হামলার কৌশল তৈরি করছে।
স্বাধীন ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞ ফ্যাবিয়ান হিঞ্জও মনে করেন, প্রতিটি হামলা থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে ইরান বুঝতে পারছে কোন কৌশলে প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
শুধু মার্কিন ঘাঁটিই নয়, ইসরায়েলের দিকেও একাধিকবার খাইবার শেকান নিক্ষেপের দাবি করেছে ইরান।
তেহরানের দাবি, এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে তারা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং বিমানবাহিনীর সদর দপ্তরকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তবে এসব দাবির স্বাধীনভাবে যাচাই সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে ইসরায়েল বলছে, অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্রই তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভূপাতিত করেছে।
‘খাইবার শেকান’ নামটি এসেছে ঐতিহাসিক খাইবার যুদ্ধ থেকে। ৬২৮ সালে আরব উপদ্বীপের খাইবার মরূদ্যান জয়কে স্মরণ করেই এই ক্ষেপণাস্ত্রের নামকরণ করা হয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, উদ্বেগের কারণ শুধু ক্ষেপণাস্ত্রের গতি বা পাল্লা নয়। বরং কম খরচে উৎপাদন, দ্রুত মোতায়েন, গতিপথ পরিবর্তনের সক্ষমতা এবং ড্রোনের সঙ্গে সমন্বিত হামলার কৌশল—এই চার বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় খাইবার শেকানকে বর্তমান সময়ের অন্যতম কার্যকর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে পরিণত করেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখনও অধিকাংশ হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম। অন্যদিকে ইরান বলছে, প্রতিটি সংঘাত থেকেই তারা নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করছে এবং ভবিষ্যতের জন্য নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা আরও উন্নত করছে।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ‘খাইবার শেকান’ শুধু একটি ক্ষেপণাস্ত্র নয়, বরং ইরানের পরিবর্তিত সামরিক কৌশলের অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছে।
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.