আপনি পড়ছেন

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে নতুন ব্যবস্থা চালুর কাছাকাছি পৌঁছেছে ইরান ও ওমান। দীর্ঘদিনের সংঘাত ও বিঘ্নতার পর এই প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ওমান মালাক্কা প্রণালীর আদলে একটি আঞ্চলিক কাঠামোর প্রস্তাব দিলেও ইরান এতে পাল্টা প্রস্তাব দিয়েছে, যা তাদের উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রবেশ ও প্রস্থানের ক্ষেত্রে আরও বেশি তদারকির সুযোগ দেবে।

৫ প্রশ্নে হরমুজ প্রণালী: ব্যবস্থাপনা ও সম্ভাব্য পরিবর্তনের চিত্র
হরমুজ প্রণালীতে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ

সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনায় যুক্ত নন। বরং কৌশলগত এই জলপথ দিয়ে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে হরমুজ প্রণালীতে একটি অস্থায়ী রুট তৈরিতে তারা ওমানের সঙ্গে কাজ করছেন। এর আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানান, উভয় দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে এমন একটি রুট নির্ধারণের বিষয়ে মাস্কাটের সঙ্গে তাদের আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

বর্তমান ব্যবস্থা, প্রস্তাবিত কাঠামো এবং বৈশ্বিক জাহাজ চলাচলে নতুন এই ব্যবস্থার প্রভাব নিয়ে নিচে পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো:

১. স্বাভাবিকভাবে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল কীভাবে পরিচালিত হয়?
স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো ট্রাফিক সেপারেশন স্কিম (টিএসএস)-এর অধীনে চলাচল করে, যা বিপরীত দিক থেকে আসা জাহাজগুলোকে আলাদা রাখতে সাহায্য করে। এই ব্যবস্থায় দুই মাইল চওড়া দুটি শিপিং লেন থাকে, যার মাঝে দুই মাইল চওড়া একটি বাফার জোন থাকে। একটি লেন উপসাগরে প্রবেশের জন্য এবং অন্যটি বের হওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়। প্রণালীর উত্তরে ইরান এবং দক্ষিণে ওমান অবস্থিত হলেও, আন্তর্জাতিক জাহাজগুলো ঐতিহাসিকভাবে ইরান-ওমান যৌথ কর্তৃপক্ষের অধীনে পরিচালিত হওয়ার বদলে নির্ধারিত শিপিং করিডোর ব্যবহার করে আসছে। বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এবং অন্যান্য পণ্যবাহী সংকীর্ণ এই জলপথে নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল চলাচল নিশ্চিত করাই এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য। তবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সংঘাত এই প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে এবং সামুদ্রিক ট্রাফিক পরিচালনার জন্য বিকল্প রুট ও কাঠামোর গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে।

২. ওমানের প্রস্তাব কী?
মাস্কাট মালাক্কা প্রণালীর আদলে একটি যৌথ আঞ্চলিক কাঠামো তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে। মালাক্কা প্রণালীতে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর নিজ নিজ জলসীমার ওপর সার্বভৌমত্ব বজায় রেখে নৌ-নিরাপত্তায় সহযোগিতা করে। ওমানের ধারণা অনুযায়ী, জাহাজ চলাচলের নিয়ন্ত্রণ মূলত কোনো এক পক্ষের হাতে ছেড়ে না দিয়ে নিরাপদ যাতায়াত পরিচালনায় ইরান ও ওমান সহযোগিতা করবে। ওমান এমন একটি রুটেরও প্রস্তাব দিয়েছে যা ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্যে সমানভাবে বিভক্ত থাকবে, যেখানে জাহাজগুলো এক দিক দিয়ে উপসাগরে প্রবেশ করবে এবং অন্য দিক দিয়ে বেরিয়ে যাবে। এই বৃহত্তর কাঠামোটি মালাক্কা প্রণালীতে নৌ-নিরাপত্তা উদ্যোগে ব্যবহৃত ব্যবস্থার মতো শিপিং কোম্পানিগুলোর স্বেচ্ছায় দেওয়া ফিয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হতে পারে। এই প্রস্তাবের উদ্দেশ্য হলো কোনো রাষ্ট্রকে তাদের আঞ্চলিক জলসীমার ওপর সার্বভৌমত্ব সমর্পণ না করেই দুই উপকূলীয় রাষ্ট্রের মধ্যে সহযোগিতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া।

৩. ইরান কেন ওমানের প্রাথমিক প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে?
সমান দুই ভাগে বিভক্ত করার প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে ইরান নিজস্ব বিকল্প উপস্থাপন করেছে। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিভাবাদির মতে, তেহরান প্রণালীর নিজেদের দিকের শিপিং রুট পরিচালনা করতে চায়। অন্যদিকে ওমান বিপরীত লেনের পুরোটা নয়, বরং কেবল একটি অংশ তদারকি করবে। এর বাস্তবিক তাৎপর্য অনেক বেশি। ইরানের প্রস্তাবে তেহরান কেবল একদিকের প্যাসেজ ব্যবহারকারী জাহাজের মধ্যে নিজেদের ভূমিকা সীমাবদ্ধ রাখার বদলে, প্রবেশ ও প্রস্থান উভয় ক্ষেত্রেই সামুদ্রিক ট্রাফিকের তদারকি পাবে। ইরানি কর্মকর্তারা যুক্তি দেন যে, যেকোনো নতুন ব্যবস্থাকে অবশ্যই দেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা রক্ষা করতে হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, তেহরান ও মাস্কাট একটি গ্রহণযোগ্য রুট খুঁজছে, যা বর্তমান উত্তর ও দক্ষিণ করিডোর উভয়টি থেকেই আলাদা হবে।

৪. হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
হরমুজ হলো পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরের সঙ্গে সংযোগকারী সামুদ্রিক প্রবেশদ্বার, যা এটিকে বিশ্বের অন্যতম কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ চেকপয়েন্টে পরিণত করেছে। উপসাগরীয় উৎপাদকদের রপ্তানি করা বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বিশ্ববাজারে পৌঁছানোর আগে অবশ্যই এই প্রণালী দিয়ে যেতে হয়। এর অর্থ হলো, দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্নতার সামান্য সম্ভাবনাও তেলের দাম, শিপিং খরচ, বীমা প্রিমিয়াম এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রত্যাশাকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে ইরানের জন্য বিষয়টি অর্থনীতির গণ্ডি পেরিয়ে আরও বিস্তৃত। তেহরান তাদের উপকূলরেখার কাছাকাছি সামুদ্রিক কার্যকলাপে প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করে। অন্যদিকে ওয়াশিংটন এবং অন্যান্য সরকার নৌ চলাচলের স্বাধীনতার ওপর জোর দিয়েছে এবং এমন যেকোনো ব্যবস্থার বিরোধিতা করেছে, যা ইরানকে আন্তর্জাতিক শিপিংয়ে সীমাবদ্ধতা বা একতরফা শর্ত আরোপের সুযোগ দিতে পারে। তাই আলোচনাটি কেবল জাহাজ কোথায় চলবে তা নির্ধারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জলপথের ওপর ইরানের কতটা কর্তৃত্ব প্রয়োগ করা উচিত, সেই বৃহত্তর প্রশ্নের সঙ্গে এটি জড়িত।

৫. মালাক্কা মডেল কি এই বিরোধের সমাধান করতে পারে?
মালাক্কা মডেলটি একটি সম্ভাব্য আপসের পথ তৈরি করে, কারণ এটি অব্যাহত জাতীয় সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সহযোগিতাকে একত্রিত করে। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর প্রণালী নিয়ন্ত্রণকারী কোনো অতি-জাতীয় কর্তৃপক্ষ তৈরি না করেই সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষার মতো বিষয়গুলোতে সমন্বয় করে। হরমুজেও একই ধরনের নীতি প্রয়োগ করা হলে তা ইরান ও ওমানকে নিজ নিজ জলসীমার ওপর এখতিয়ার বজায় রেখে যৌথভাবে নৌ চলাচল সহজ করতে সহায়তা করতে পারে। তবে হরমুজ প্রণালীর ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশ তুলনামূলক অনেক বেশি জটিল। মূল বিষয়টি হলো, চূড়ান্ত কোনো ব্যবস্থা ইরানকে ইনবাউন্ড এবং আউটবাউন্ড উভয় শিপিংয়ে ভূমিকা রাখার সুযোগ দেয় কি না, পাশাপাশি অন্যান্য দেশ এবং বাণিজ্যিক অপারেটরদের এই আস্থা প্রদান করে কি না যে রুটটি অনুমানযোগ্য এবং নিরাপদ থাকবে। আরাঘচি রোববার জানান, ওমানের সঙ্গে আলোচনা চূড়ান্ত হওয়ার পথে রয়েছে এবং উভয় পক্ষই দুই দেশের সার্বভৌম অধিকারকে সম্মান করে এমন একটি রুটের দিকে কাজ করছে। আলোচনার বিষয়ে ইরানের সর্বশেষ বর্ণনার ওপর ওমান প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি। যদি কোনো চুক্তি হয়, তবে তা হরমুজ প্রণালীর পরিচালনায় একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে এবং জলপথটি নিয়ে উত্তেজনা কমানো ও আরও অনুমানযোগ্য বাণিজ্যিক নৌ চলাচল পুনরুদ্ধারের বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হয়ে উঠতে পারে।

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.