ইসরায়েলি দখলদারিত্ব নিয়ে যুক্তরাজ্যের অবস্থান পরিবর্তন: প্রতিক্রিয়াকে ‘অপ্রতুল’ বলছেন বিশ্লেষকরা
- Details
- by আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের অব্যাহত দখলদারিত্বকে বেআইনি বলে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে যুক্তরাজ্য। লন্ডনের এই স্বীকৃতিকে তাৎপর্যপূর্ণ আইনি ও রাজনৈতিক পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা। তবে তাদের মতে, এই স্বীকৃতির বাস্তবায়নে ব্রিটিশ সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ এখনো প্রত্যাশার তুলনায় বেশ অপ্রতুল।

মঙ্গলবার ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড ঘোষণা করেন, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের দখলদারিত্ব বেআইনি বলে যুক্তরাজ্য সরকার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) ২০২৪ সালের জুলাইয়ের পরামর্শমূলক মতামতের মূল পর্যবেক্ষণের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান সামঞ্জস্যপূর্ণ করল দেশটি। লন্ডনের এই ঘোষণা তাদের আগের অবস্থান থেকে বড় ধরনের পরিবর্তন নির্দেশ করে। কারণ, পুরো দখলদারিত্বের বৈধতা নিয়ে আগে যুক্তরাজ্য সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সুনির্দিষ্ট মতামত প্রকাশ করেনি।
যুক্তরাজ্য সরকার ইসরায়েলি বসতি স্থাপন ও এর সম্প্রসারণকে লক্ষ্য করে কিছু পদক্ষেপের ঘোষণা দিলেও, ইসরায়েলের সঙ্গে দেশটির সামগ্রিক সম্পর্ক মূলত অপরিবর্তিত রয়েছে। সরকারের এই দ্বিচারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা।
ইতালির ইউনিভার্সিটি অব মলিসের আন্তর্জাতিক আইনের সহযোগী অধ্যাপক লুইগি দানিয়েলে আনাদোলুকে বলেন, ‘আইনি ও রাজনৈতিক এই পরিবর্তনটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যদিও তা যথেষ্ট নয়।’
২০২৪ সালের জুলাই মাসে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত রায় দেন, পূর্ব জেরুজালেমসহ ফিলিস্তিনের অধিকৃত ভূখণ্ডে ইসরায়েলের অব্যাহত উপস্থিতি বেআইনি। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দেন, ইসরায়েল যত দ্রুত সম্ভব সেখানে নিজেদের দখলদারিত্বের অবসান ঘটাতে বাধ্য। আদালত আরও বলেন, ইসরায়েলকে অবিলম্বে সমস্ত নতুন বসতি স্থাপন কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে এবং অধিকৃত ভূখণ্ড থেকে সমস্ত দখলদারদের সরিয়ে নিতে হবে।
ব্রিস্টলের ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট অব ইংল্যান্ডের ফৌজদারি আইনের অধ্যাপক গেরহার্ড কেম্প জানান, দখলদারিত্ব নিয়ে যুক্তরাজ্যের এই অবস্থান আইসিজের সিদ্ধান্তের সঙ্গে তাদের সরকারি নীতিকে এক কাতারে নিয়ে আসায় এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
আনাদোলুকে তিনি বলেন, ‘পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমসহ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের দখলদারিত্ব যে বেআইনি, যুক্তরাজ্য স্পষ্টভাবেই সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে এবং এটি একটি ভালো দিক।’
তবে কেম্প উল্লেখ করেন, আইসিজের পরামর্শমূলক মতামতটি আরও বিস্তৃত ছিল। সেখানে অধিকৃত ভূখণ্ডে ইসরায়েলের বিভিন্ন নীতি ও কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে বর্ণবৈষম্য এবং পৃথকীকরণ ব্যবস্থার বিষয়গুলোও উঠে এসেছিল। কিন্তু ব্রিটিশ বিবৃতিতে এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলা হয়নি। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ব্রিটিশদের এই অবস্থান কেবল আইসিজের কাজের ওপর নয়, বরং মাঠপর্যায়ের বাস্তব ও আইনি পরিস্থিতি সংক্রান্ত তাদের নিজস্ব মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করেও তৈরি হয়েছে বলে মনে হয়।
অধিকৃত পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতি থেকে পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছেন এড মিলিব্যান্ড। পাশাপাশি বসতি সম্প্রসারণে নির্মাণ, অবকাঠামো, অর্থায়ন বা রিয়েল এস্টেটের মতো পরিষেবা প্রদানকারী কোম্পানি ও ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থার কথা জানান তিনি।
কেম্প বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞাগুলো অত্যন্ত নির্দিষ্ট এবং তা শুধু বসতির পণ্য ও কিছু পরিষেবার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সামগ্রিকভাবে এগুলো ইসরায়েলের ওপর সরাসরি আরোপিত হয়নি।’
ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতায় সমর্থন দেওয়া বা উসকানি দেওয়ার অভিযোগে চরমপন্থী দখলদারদের আরেকটি দলের ওপরও নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে যুক্তরাজ্য।
তবে অধ্যাপক কেম্পের মতে, এই পদক্ষেপগুলো মূল সংকটকে অমীমাংসিত রেখে দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ বন্ধ করাই এই নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য। তাই এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ বলা যেতে পারে, তবে মূল সংকট—অর্থাৎ অবৈধ দখলদারিত্বের অবসানে আরও অনেক পদক্ষেপ প্রয়োজন।’
অধ্যাপক দানিয়েলের মতে, যুক্তরাজ্যের অবস্থানের আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো তারা গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে আখ্যায়িত করতে রাজি হয়নি।
দানিয়েলে বলেন, ‘অধিকৃত ভূখণ্ডের পরিস্থিতির অবৈধতা নিয়ে মিলিব্যান্ড স্পষ্ট ভাষায় কথা বললেও, তিনি গণহত্যার বিষয়টি কোনোভাবেই উল্লেখ করেননি। আমার মতে এটিই প্রধান সমস্যা।’
মঙ্গলবার ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, গণহত্যার অভিযোগগুলো বিবেচনার জন্য যুক্তরাজ্য পূর্ণ ও ন্যায্য বিচারিক প্রক্রিয়াকে সমর্থন করে এবং কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে উপযুক্ত আদালত থেকেই চূড়ান্ত রায় আসা উচিত বলে ব্রিটিশ সরকার মনে করে।
তবে দানিয়েলে যুক্তি দেন, ব্রিটেনের এই দৃষ্টিভঙ্গি ইসরায়েল এবং অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে দেশটির কর্মকাণ্ডের মধ্যে একটি কৃত্রিম বিভাজন তৈরির ঝুঁকি বাড়ায়।
তিনি বলেন, ‘মিলিব্যান্ড যেন (যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী) অ্যান্ডি বার্নহাম এবং এই পদক্ষেপ ঘোষণাকারী অন্যান্য দেশগুলোর সঙ্গে মিলে একটি ভ্রান্ত ধারণা তৈরি করার চেষ্টা করছেন যে, গ্রিন লাইনের ভেতরে থাকা ইসরায়েল বৈধ ও ভালো, যার সঙ্গে বাণিজ্য, সামরিক ও নজরদারি সহায়তা অব্যাহত রাখা যায়; আর ফিলিস্তিনের অধিকৃত ভূখণ্ডে থাকা ইসরায়েল অবৈধ ও খারাপ। তবে আমরা জানি যে এই বিভাজনটি একেবারেই ভিত্তিহীন।’
দানিয়েলে আরও বলেন, এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির সুযোগ নিয়ে সরকারগুলো একদিকে বসতি স্থাপনের নিন্দা জানায় ও একক দখলদারদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, অন্যদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের অর্থনৈতিক, সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা পুরোদমে চালিয়ে যায়।
বসতি স্থাপন কার্যক্রমে সমর্থন দেওয়া বৃহত্তর রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে শুধু একক দখলদারদের লক্ষ্য করে নেওয়া পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হতে পারে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন দানিয়েলে। তিনি বলেন, কেবল সবচেয়ে চরম ঘটনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে সংকট সমাধান করা একেবারেই অসম্ভব।
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.