আপনি পড়ছেন

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী নুরুল হুদার অজান্তে তার প্রতিষ্ঠানের নামে কোটি টাকার ঋণ নেওয়া এবং কয়েক কোটি টাকার পণ্য আমদানির অভিযোগ উঠেছে ইসলামী ব্যাংকের ছয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। সিআইডির তদন্তে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্যবসায়ীর অজান্তে ১ কোটি টাকার ঋণ, ইসলামী ব্যাংকের ৬ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্তে প্রমাণ
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির লোগো

তদন্ত অনুযায়ী, নুরুল হুদার প্রতিষ্ঠান মেসার্স আল ওয়ালিদ ট্রেডিংয়ের নামে ১ কোটি ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৩৪২ টাকার ঋণ তৈরি করা হয়। একই প্রতিষ্ঠানের নামে চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ২ কোটি ৩৬ লাখ টাকার পণ্য আমদানির রেকর্ডও পাওয়া গেছে। তবে নুরুল হুদার দাবি, ওই ঋণের অর্থ কিংবা আমদানি করা কোনো পণ্যই তিনি পাননি।

ঋণের মধ্যে বর্তমানে ৮৭ লাখ ১৫ হাজার ২৮৩ টাকা বকেয়া রয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোতে (সিআইবি) তার প্রতিষ্ঠানটি নেতিবাচক ঋণগ্রহীতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এতে ২০২২ সাল থেকে তার আমদানি ব্যবসা কার্যত বন্ধ হয়ে আছে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চট্টগ্রাম সিআইডির এসআই মো. আব্দুল করিমের আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসলামী ব্যাংকের ছয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রতারণা, জালিয়াতি, জাল নথি তৈরি ও তা ব্যবহার এবং ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে।

অভিযুক্ত ছয়জন হলেন ইসলামী ব্যাংকের খুলশী শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মোরশেদুল আলম, তৎকালীন সেকেন্ড অফিসার মো. মহিউদ্দিন, ফরেন এক্সচেঞ্জ কর্মকর্তা মুহাম্মদ জুবায়ের আলম চৌধুরী, জুনিয়র কর্মকর্তা রাফায়েত সালাহ উদ্দিন, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মনিরুল মওলা এবং সাবেক চেয়ারম্যান ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের ৯ আগস্ট ইসলামী ব্যাংকের খুলশী শাখায় মেসার্স আল ওয়ালিদ ট্রেডিংয়ের নামে একটি চলতি হিসাব খোলেন নুরুল হুদা। আমদানি ব্যবসার প্রয়োজনে তিনি ওই ব্যাংকের মাধ্যমে নিয়মিত এলসি খুলতেন।

অভিযোগ রয়েছে, এলসি খোলার সময় ব্যাংকের কর্মকর্তারা তার কাছ থেকে শুধু স্বাক্ষর করা কয়েকটি খালি চেক নিতেন। মোরশেদুল আলম ও মহিউদ্দিনের নির্দেশে ফরেন এক্সচেঞ্জ কর্মকর্তা জুবায়ের এসব চেক সংগ্রহ করতেন।

ব্যবসায়ীর বক্তব্য অনুযায়ী, বন্দরে পণ্য পৌঁছানোর পর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের মাধ্যমে পণ্য খালাসের খরচসহ প্রয়োজনীয় অর্থ তার হিসাব থেকে সমন্বয় করার জন্য এসব চেক নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তদন্তে অভিযোগ পাওয়া গেছে, কর্মকর্তারা ভাউচারের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট অর্থ পরিশোধ করলেও গ্রাহকের স্বাক্ষর করা চেকগুলো তাকে ফেরত দেননি। বরং সেগুলো নিজেদের হেফাজতে রেখে দেন।

সিআইডির তদন্তে দেখা গেছে, আল ওয়ালিদ ট্রেডিংয়ের নামে চীন থেকে চায়না আপেল, চায়না আদাসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি করা হয়। এসব আমদানির মোট মূল্য ছিল ১ লাখ ৯৩ হাজার ৫১৫ মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।

তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, নুরুল হুদার অজান্তেই রমিজ ও মনির নামে দুজনসহ অভিযুক্তদের প্রতিনিধিরা এসব পণ্য খালাস করেন। পরে পণ্যগুলো ব্যবহার করে ব্যবসা পরিচালনা, মুনাফা অর্জন এবং অর্থ আত্মসাৎ করা হয়।

এ ছাড়া ব্যাংকের কাছে থাকা নুরুল হুদার স্বাক্ষর করা খালি এলসি অনুমোদন ফরম ও অন্যান্য নথি ব্যবহার করে তার অজ্ঞাতসারে পাঁচটি মেয়াদি মুদারাবা পোস্ট ইমপোর্ট (এমপিআই) ঋণ হিসাব খোলার অভিযোগ রয়েছে।

এসব হিসাবের এসএমএস অ্যালার্ট সুবিধাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। ফলে হিসাব থেকে টাকা জমা বা উত্তোলনের কোনো তথ্য নুরুল হুদার মোবাইলে পৌঁছাত না।

পাঁচটি ঋণ হিসাবের বিপরীতে মোট ১ কোটি ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৩৪২ টাকা ঋণ তৈরি করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এই অর্থ আগে তৈরি হওয়া আমদানি দায় পরিশোধে ব্যবহার করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ওই ঋণের কিছু অংশ পরিশোধ করা হলেও এখনো ৮৭ লাখ ১৫ হাজার ২৮৩ টাকা বকেয়া রয়েছে।

২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ব্যাংক থেকে ঋণ পরিশোধের নোটিশ পাওয়ার পর প্রথমবারের মতো বিষয়টি জানতে পারেন নুরুল হুদা। তার দাবি, তিনি কোনো ঋণের আবেদন করেননি এবং এসব ঋণের অর্থও তার হাতে আসেনি।

বিষয়টি জানার পর তিনি ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং পরে আইনি নোটিশ পাঠান। তার অভিযোগ, সমাধানের পরিবর্তে তাকে গালিগালাজ করা হয় এবং মামলা দিয়ে হয়রানি ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। তদন্তেও মামলা প্রত্যাহারে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আদালতের নির্দেশে বিতর্কিত ঋণসংক্রান্ত নথিগুলো সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়। সেখানে হস্তলিপি বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হয়।

ফরেনসিক প্রতিবেদনে ব্যাংকের ঋণসংক্রান্ত বিভিন্ন নথিতে থাকা স্বাক্ষরের সঙ্গে নুরুল হুদার প্রকৃত স্বাক্ষরের স্পষ্ট পার্থক্য পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৫ সালের মার্চে মহানগর হাকিম আদালতে এ ঘটনায় মামলা করেন নুরুল হুদা। মামলায় মোট নয়জনকে আসামি করা হয়েছিল। তদন্ত শেষে সিআইডি তিনজনকে অব্যাহতির সুপারিশ করেছে। তারা হলেন ইসলামী ব্যাংকের আগ্রাবাদ জোনাল অফিস সাউথের সাবেক প্রধান মোহাম্মদ জহির উদ্দিন, মিয়া মোহাম্মদ বরকত উল্লাহ এবং মুহাম্মদ জুবায়ের আজম হেলালী।

নুরুল হুদা বলেন, আমদানি ব্যবসার জন্য খুলশী শাখায় হিসাব খোলার পর তিনি নিয়মিত এলসি খুলতেন। এলসি খোলার সময় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তার কাছ থেকে স্বাক্ষর করা খালি চেকসহ বিভিন্ন কাগজপত্র নিত।

তার ধারণা, তিনি ২০ থেকে ২৫টি এলসি খুলেছিলেন। এসব এলসির মাধ্যমে মূলত সৌদি আরব থেকে পণ্য আমদানি করতেন। কিন্তু পরবর্তীতে জানতে পারেন, তার হিসাব ব্যবহার করে সৌদি আরব ছাড়াও দুবাই, ভিয়েতনাম ও চীনসহ বিভিন্ন দেশের পণ্য আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে।

তার নামে মোট কতগুলো এলসি খোলা হয়েছে এবং সেগুলোর মাধ্যমে কী পরিমাণ অর্থ লেনদেন হয়েছে, তা জানতে ব্যাংকের কাছে একাধিকবার হিসাব বিবরণী ও সংশ্লিষ্ট নথি চেয়েও তিনি পাননি বলে অভিযোগ করেন। বরং তাকে এক শাখা থেকে অন্য শাখায় যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

নুরুল হুদার ভাষ্য, তার হিসাব ব্যবহার করে অনিয়ম করার পর তাকেই ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২৩ সালের দিকে বিষয়টি তার নজরে আসে। ব্যাংক থেকে তার নামে একটি বড় অঙ্কের চেক ইস্যুর কথা জানানো হলে তিনি সেটি নিজে দেননি বলে জানান।

এরপর ব্যাংকে গিয়ে নিজের নামে থাকা ঋণের নথিপত্র দেখতে চান তিনি। সেখানে গিয়ে দেখতে পান, তার নামে ঋণ থাকলেও তিনি কোনো ঋণের আবেদন করেননি এবং সংশ্লিষ্ট আবেদনপত্রে তার স্বাক্ষরও নেই।

সমাধানের আশায় শাখা, জোনাল অফিস ও প্রধান কার্যালয়ে দীর্ঘদিন যোগাযোগ করেও কার্যকর ব্যবস্থা পাননি বলে জানান নুরুল হুদা। পরে ২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তাদের আইনি নোটিশ দেন এবং শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন।

মামলাটি বর্তমানে অভিযোগ গঠনের শুনানির পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাদীপক্ষের আইনজীবী নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদন ও চার্জশিট জমা দেওয়ার পর মামলাটি বিচার শুরুর প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে তিনজনকে অব্যাহতির সুপারিশের বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে আইনজীবী বলেন, তারা সরাসরি ঘটনাস্থলে যুক্ত না থাকলেও পরোক্ষভাবে অনিয়মের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তার দাবি, প্রতিষ্ঠানের অধস্তন কর্মকর্তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ওপরও বর্তায়।

আইনজীবী আরও বলেন, জাল নথি ব্যবহার, চেক জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়টি আগেই ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে আইনি নোটিশের মাধ্যমে জানানো হয়েছিল। কিন্তু এরপরও ব্যাংকের পক্ষ থেকে কার্যকর অভ্যন্তরীণ তদন্ত বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তার ভাষ্য, পরবর্তীতে ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদনে স্বাক্ষর জালিয়াতির বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। অভিযোগ গঠনের সময় আদালতে এসব বিষয় তুলে ধরা হবে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে মামলার এক নম্বর আসামি মোহাম্মদ মোরশেদুল আলমের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি মামলা বিচারাধীন থাকার কথা জানিয়ে ফোন কেটে দেন। পরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি আর সাড়া দেননি।

অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংকের খুলশী শাখার ব্যবস্থাপক মো. আবুল মনসুর আদালতে বিচারাধীন বিষয় হওয়ায় এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.