আপনি পড়ছেন

যুদ্ধবিরতির পর সংঘাতের তীব্রতা কিছুটা কমলেও অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনিদের জীবনে প্রতিদিন মৃত্যু ও ধ্বংসযজ্ঞ অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির (আইসিআরসি) মুখপাত্র প্যাট গ্রিফিথস এই তথ্য তুলে ধরেছেন।

রেড ক্রস : গাজায় প্রতিদিন মৃত্যু ও ধ্বংসযজ্ঞ চলছে
ইসরায়েলি বিমান হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গাজার একটি এলাকা

সংবাদ সংস্থা আনাদোলুকে দেওয়া এক বক্তব্যে গ্রিফিথস বলেন, ‘বিষয়টি স্পষ্ট করা দরকার: গাজায় ফিলিস্তিনিদের জন্য প্রতিদিন মৃত্যু ও ধ্বংসযজ্ঞ চলছে। এই দুর্ভোগ বাস্তব এবং প্রতিদিনের—এমনকি যখন গাজা সংবাদপত্রের শিরোনামে থাকে না তখনও।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখানে ফিলিস্তিনিদের স্বাভাবিক জীবন এমনভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে যা কল্পনা করাও কঠিন। শিশুরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। মানুষ বিশেষজ্ঞ বা দীর্ঘস্থায়ী রোগের চিকিৎসা সেবা পাচ্ছে না। বহু পরিবার তাদের বাড়িঘর ও জীবিকা হারিয়েছে। অনেকে এখনো নিখোঁজ প্রিয়জনদের কোনো খোঁজ পাচ্ছেন না; তারা আটক আছেন নাকি নিহত হয়েছেন, তা-ও তাদের জানা নেই।’

এক সপ্তাহের সফরে বর্তমানে গাজা সিটিতে অবস্থান করছেন গ্রিফিথস। তিনি জানান, পুরো উপত্যকাজুড়ে এখনো খাবার, পানি, আশ্রয় এবং স্বাস্থ্যসেবার মতো জরুরি মানবিক সহায়তার তীব্র প্রয়োজন রয়েছে।

আইসিআরসি মুখপাত্র বলেন, ‘আইসিআরসিতে আমরা পরিবর্তিত পরিস্থিতি ও সংঘাতের মাত্রা অনুযায়ী আমাদের মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করি। তবে মনে রাখতে হবে, জরুরি মানবিক প্রয়োজন এখনো রয়ে গেছে। খাদ্য, পানি, আশ্রয়, স্বাস্থ্য এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে আরও অনেক কাজ করা প্রয়োজন।’

তিনি উল্লেখ করেন, গাজায় কর্মরত আইসিআরসি কর্মীদের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সুযোগ বা প্রবেশাধিকার।

তিনি বলেন, ‘সংকটাপন্ন মানুষের কাছে সাহায্য পৌঁছাতে হলে আমাদের তাদের কাছে যাওয়ার সুযোগ থাকতে হবে—সেটি যেখানেই হোক, এমনকি বন্দিশালাগুলোতেও। কিন্তু সব সময় তা সম্ভব হয় না।’

নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ কিংবা অনুমতি দেওয়ার দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষের অনীহার কারণে এই প্রবেশাধিকার সীমিত হতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি। গ্রিফিথস বলেন, ‘মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সুযোগ দেওয়া সশস্ত্র সংঘাতের পক্ষগুলো ও দখলদার শক্তির একটি আইনি বাধ্যবাধকতা। তবে মানবিক কর্মী হিসেবে এটি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ কারণেই যাদের এই বিষয়ে প্রভাব রয়েছে, তাদের সঙ্গে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথ সুগম করতে আমরা নিয়মিত আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি।’

গ্রিফিথস জানান, সমস্যাটি কেবল মানুষের কাছে পৌঁছানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং গাজায় প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী প্রবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও বড় বাধা রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘মানুষের এখনো মানসম্মত ও পুষ্টিকর খাবারের ভীষণ প্রয়োজন। হাসপাতাল ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে এখনো ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের তীব্র সংকট রয়েছে। ধ্বংসস্তূপ নিরাপদে অপসারণ, মানবদেহের অবশিষ্টাংশ অনুসন্ধান কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা মেরামতের জন্য ভারী যন্ত্রপাতি এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রবেশের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে।’

জেনারেটর সচল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও ইঞ্জিন তেলের ঘাটতির কথাও তুলে ধরেন তিনি। তিনি বলেন, ‘গাজার প্রতিটি মানুষ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে সংকটে পড়ছে। বিদ্যুৎ পেতে তাদের জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা চালানোর জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি ও ইঞ্জিন তেল প্রয়োজন। কিন্তু সেখানে পর্যাপ্ত জ্বালানি প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।’

গ্রিফিথসের মতে, এই সংকটের কারণে পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে, যা বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলছে। কারণ তারা ইতিমধ্যেই তাদের বাড়িঘর ও উপার্জনের পথ হারিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘গাজায় এই ঘাটতি মৌলিক পরিষেবাগুলোকে ব্যাহত করছে এবং পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। মানুষ যখন বাস্তুচ্যুত হয়ে বাড়িঘর হারায়, তখন তারা তাদের জীবিকাও হারায়। ফলে তাদের হাতে নগদ টাকার অভাব দেখা দেয় এবং বাজারে যা পাওয়া যায় তাও তারা কিনতে পারে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘এসব পরিস্থিতি এই মুহূর্তে গাজার ফিলিস্তিনিদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে। এ কারণেই আমরা কোনো ধরনের বাধা ছাড়া খাদ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, ওষুধ ও অন্যান্য সামগ্রী প্রবেশের জোর দাবি জানিয়ে আসছি।’

ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার সময় আইসিআরসি আন্তর্জাতিক মানবিক আইন সমুন্নত রাখার আহ্বান অব্যাহত রেখেছে জানিয়ে গ্রিফিথস বলেন, ‘এ কারণেই ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনায় আমরা আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে আসছি, যার মূল লক্ষ্য সশস্ত্র সংঘাতের সময় বেসামরিক নাগরিকদের দুর্ভোগ কমানো।’ তিনি আরও বলেন, ‘গাজার ফিলিস্তিনিদের জীবনমানের উন্নতির লক্ষ্যে সংলাপ ও টেকসই সমাধান খোঁজার জন্য যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন, আমরা সেটির আহ্বান জানিয়ে যাচ্ছি। কারণ এর চেয়ে কম কিছু দিয়ে অসংখ্য অমূল্য জীবন রক্ষা করা সম্ভব নয়।’

তাঁবু ও বিপজ্জনক ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের মধ্যকার কঠিন পছন্দ:
গ্রিফিথস জানান, বাস্তুচ্যুত হওয়া বা বাড়িঘর হারানো গাজার হাজার হাজার ফিলিস্তিনি তাঁবুতে বাস করতে বাধ্য হচ্ছেন। তাদের অনেককেই একাধিকবার স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে।

তীব্র গরম ও শীতের মধ্যে তাঁবুতে তিন বছর কাটানোর পর বিকল্প কোনো উপায় না পেয়ে কিছু পরিবার ধসে পড়ার ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে ফিরে যাচ্ছে।

সম্প্রতি গাজা সিটিতে শতাধিক মানুষের আশ্রয় নেওয়া একটি ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ধসে পড়ার ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি জানান, সেখান থেকে অনেককে উদ্ধার করা গেলেও শিশুসহ বেশ কয়েকজন নিহত হয়।

তিনি বলেন, ‘মাথার ওপর এক টুকরো ছাদের জন্য তাঁবুর জীবন কিংবা ধসে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নেওয়া—এমন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি কোনো পরিবারেরই হওয়া উচিত নয়।’

শীত আসন্ন হওয়ায় ভারী বৃষ্টি ও বাতাসের কারণে ভবন ধসের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেন গ্রিফিথস। তিনি ধ্বংসস্তূপ অপসারণের ভারী যন্ত্রপাতি এবং টেকসই আশ্রয় সামগ্রী গাজায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার আহ্বান জানান।

স্বাভাবিক জীবনের আকাঙ্ক্ষা:
ধ্বংসযজ্ঞ ও অবর্ণনীয় দুর্ভোগের মাঝেও গাজার ফিলিস্তিনিরা স্বাভাবিক জীবনে ফেরার তীব্র আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে যাচ্ছেন বলে উল্লেখ করেন গ্রিফিথস। তাদের এই আকাঙ্ক্ষা হলো স্কুলে যাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা, কাজ করা, পরিবারের সঙ্গে থাকা এবং নিজের বাড়িতে ফিরে যাওয়া।

তিনি উল্লেখ করেন, গত বছরের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির ফলে সংঘাতের তীব্রতা কিছুটা কমেছে এবং গাজায় কিছু খাদ্য ও পণ্য প্রবেশ করতে পেরেছে, তবে সেখানকার সামগ্রিক মানবিক সংকট এখনো অত্যন্ত তীব্র রয়ে গেছে।

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.