আইএলও: পুরুষদের চেয়ে বাংলাদেশি নারীদের আয় ২৫% কম
- Details
- by ২৪ ডেস্ক
বাংলাদেশে পুরুষদের তুলনায় নারীরা গড়ে ২২ থেকে ২৫ শতাংশ কম আয় করেন। শিক্ষা, পেশা বা অন্যান্য দৃশ্যমান বিষয়ের মাধ্যমে মজুরির এই বৈষম্যের বড় অংশের কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এক নতুন প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে।

‘দ্য জেন্ডার পে গ্যাপ ইন বাংলাদেশ: ট্রেন্ডস, কজেস অ্যান্ড পলিসি অপশনস’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি ১৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়েছে, মাসিক মজুরির হিসাবে পুরুষরা যখন ১ হাজার টাকা আয় করেন, তখন নারীরা পান ৭৫০ থেকে ৭৮০ টাকা। শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৩-এর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে মজুরিতে নারী-পুরুষের এই ব্যবধান বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে সামান্য বেশি। তবে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ভারত ও শ্রীলঙ্কাসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য কয়েকটি দেশের তুলনায় এই ব্যবধান কিছুটা কম।
লিঙ্গভিত্তিক মজুরি ব্যবধান (জেন্ডার পে গ্যাপ বা জিপিজি) বলতে মূলত পুরুষদের গড় আয়ের অনুপাতে নারী ও পুরুষের গড় মজুরির পার্থক্যকে বোঝায়। উদাহরণ হিসেবে, ২০ শতাংশ মজুরি ব্যবধানের অর্থ হলো পুরুষরা যখন ১০০ টাকা আয় করেন, নারীরা তখন পান ৮০ টাকা। তবে এর মানে এই নয় যে একই ধরনের কাজ করে নারী ও পুরুষ সবসময় ভিন্ন মজুরি পাচ্ছেন। পেশা, খাত, কাজের সময় ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের পার্থক্যও মজুরির ওপর প্রভাব ফেলে। এ কারণে আইএলও ফ্যাক্টর-ওয়েটেড জিপিজিসহ পরিপূরক পরিমাপ পদ্ধতি ব্যবহার করেছে, যা একই ধরনের কর্মীদের মধ্যে তুলনা করে মজুরি ব্যবধানের আরও স্পষ্ট তথ্য তুলে ধরে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে মজুরি পাওয়া কর্মীদের মধ্যে নারী ও পুরুষের আয়ের যে পার্থক্য রয়েছে, তার বড় অংশই দৃশ্যমান কারণগুলো দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। শিক্ষা, পেশা ও কর্মক্ষেত্রের পার্থক্যের মাধ্যমে কেবল একটি অংশের ব্যাখ্যা মেলে, বাকি অংশটি অব্যাখ্যাত থেকে যায়। আইএলওর মতে, এটি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বৈষম্যের বড় ধরনের ভূমিকার ইঙ্গিত দেয়।
একই সঙ্গে নারীদের মজুরিভিত্তিক চাকরিতে অংশগ্রহণের হারও পুরুষদের তুলনায় অনেক কম। ২০২৩ সালে নারী কর্মসংস্থানের হার ছিল ৪০ দশমিক ২ শতাংশ, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ এই ব্যবধান ছিল ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশ পয়েন্ট। এছাড়া কর্মসংস্থানে থাকা নারীদের মাত্র ১৯ শতাংশ মজুরিভিত্তিক কর্মী ছিলেন, বিপরীতে পুরুষদের ক্ষেত্রে তা ছিল ৪৮ শতাংশ। ফলে মোট মজুরিভিত্তিক কর্মীদের মধ্যে নারীদের অংশ ছিল মাত্র ১৭ শতাংশ।
মজুরিভিত্তিক কাজে যুক্ত নারীরা মূলত কম আয়ের খাত ও পেশাগুলোতেই বেশি কেন্দ্রীভূত। উৎপাদন খাতে নারী মজুরিভিত্তিক কর্মীদের ৪১ শতাংশ কাজ করেন, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে তা ২৩ শতাংশ। অন্যদিকে নারী মজুরিভিত্তিক কর্মীদের ১৯ শতাংশ গৃহস্থালির কাজে এবং ১২ শতাংশ শিক্ষা খাতে নিয়োজিত। প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, বাংলাদেশে ব্যবস্থাপক পর্যায়ের পদে নারীদের অংশ মাত্র ৬ দশমিক ২ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম সর্বনিম্ন।
বয়স, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ধরন অনুযায়ীও মজুরি ব্যবধানে ভিন্নতা দেখা যায়। কর্মীদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যবধান বাড়ে। তবে উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে ব্যবধান কিছুটা কমে আসে। আনুষ্ঠানিক খাতের তুলনায় অনানুষ্ঠানিক খাতে এই বৈষম্য বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অধ্যয়নে পারিবারিক দায়িত্বকেও একটি অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মজুরিভিত্তিক কাজে যুক্ত নারীরা সপ্তাহে গড়ে ২৭ দশমিক ৭ ঘণ্টা গৃহস্থালির কাজে ব্যয় করেন, যেখানে পুরুষরা ব্যয় করেন ৭ দশমিক ৬ ঘণ্টা। মজুরিভিত্তিক কাজ ও পারিবারিক কাজ মিলিয়ে নারীরা সপ্তাহে গড়ে ৭৩ দশমিক ৭ ঘণ্টা কাজ করেন, বিপরীতে পুরুষরা কাজ করেন ৫৯ ঘণ্টা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব খাতে নারী কর্মীর অনুপাত বেশি, সেসব খাতে গড় মজুরি তুলনামূলক কম। এতে প্রতীয়মান হয় যে ঐতিহ্যগতভাবে নারীদের সঙ্গে যুক্ত পেশাগুলোর মূল্যায়ন কম করা হয়। অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনায় মজুরি নির্ধারণের দুর্বল ব্যবস্থা, যৌথ দরকষাকষির সীমিত সুযোগ, পেশাগত বিভাজন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতি, আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং সস্তা শ্রমের আধিক্যকে এই বৈষম্যের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশের আইনি কাঠামোতে সমমানের কাজের জন্য সমান মজুরির বিধান রয়েছে এবং সংবিধানে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। তবে আইএলও জানিয়েছে, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনও ঘাটতি রয়ে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে ন্যূনতম মজুরির অসম্পূর্ণ আওতা, শ্রম পরিদর্শনের সীমিত সক্ষমতা এবং কিছু নির্দিষ্ট শর্ত ও পেশায় নারীদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ।
সমমানের কাজের জন্য সমান মজুরির নীতিকে স্পষ্ট ও কার্যকর করার সুপারিশ করেছে আইএলও। একই সঙ্গে কাজের বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করা এবং মজুরি নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের বিষয়টি আরও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
প্রতিবেদনে কাজের ক্ষেত্রে নমনীয় পরিবেশ বাড়ানো এবং কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা ও হয়রানির বিরুদ্ধে সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া শক্তিশালী শ্রম পরিদর্শন ও বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা চালু এবং লিঙ্গভিত্তিক মজুরি বৈষম্য সংক্রান্ত তথ্যের মানোন্নয়নের তাগিদ দিয়েছে আইএলও। সংস্থাটি বলেছে, মজুরির এই ব্যবধান কমাতে সরকার, মালিক, শ্রমিক ও অন্যান্য অংশীজনের সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.