বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা আগের চেয়ে কমেছে, অথচ অলস বসে থাকা কেন্দ্রের ভাড়া বা ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ খরচ এক লাফে বেড়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা। অন্তর্বর্তী সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় নানাভাবে সাশ্রয়ের চেষ্টা করলেও ব্যয়ের লাগাম টানা সম্ভব হয়নি। উল্টো এক বছরের ব্যবধানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ প্রায় ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়া এবং বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে ডলারে লেনদেনের শর্তই মূলত এই খরচ বাড়ার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।

ছবি - সংগৃহীত

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, উৎপাদন খরচ কমানোর লক্ষ্যে ১০টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করা হয়নি। ফলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯৮ মেগাওয়াট থেকে কমে ২৭ হাজার ৪১৪ মেগাওয়াটে দাঁড়িয়েছে। সক্ষমতা কমলেও এই অর্থবছরে কেন্দ্রভাড়া বাবদ গুনতে হয়েছে ৪২ হাজার কোটি টাকা। অথচ ঠিক আগের অর্থবছরে (২০২৩-২৪) এই খাতে খরচ ছিল ৩২ হাজার কোটি টাকা। আর ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২৪ হাজার ৯১১ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিপরীতে ভাড়া বাবদ ব্যয় হয়েছিল ২৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ কেন্দ্রভাড়ার অঙ্ক প্রতি বছরই লাফিয়ে বাড়ছে।

উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে জ্বালানি ব্যবস্থাপনার অসামঞ্জস্যতাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। সস্তা জ্বালানি হিসেবে পরিচিত গ্যাসের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। ফলে বাধ্য হয়ে কয়লা ও তেলের মতো ব্যয়বহুল জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আগের বছর কয়লাভিত্তিক উৎপাদন ছিল ২০ শতাংশ, যা গত বছর বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৭ শতাংশে। গ্যাসের তুলনায় কয়লায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ প্রায় দ্বিগুণ। এছাড়া ভারত থেকে প্রতিদিন প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়, যার বিল ডলারে পরিশোধ করতে হয়। পাশাপাশি বিদেশি ঋণে নির্মিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কিস্তিও ডলারে শোধ করতে হয়।

ডলারের বিনিময় হারের ঊর্ধ্বগতি পিডিবির আর্থিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। বর্তমানে দেশে ১৩৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৬৮টিই বেসরকারি। পিডিবির দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, বেসরকারি খাতের ৯০ শতাংশেরও বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল ডলারে হিসাব করা হয়। এমনকি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের বিলও ডলারে নির্ধারিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গত অর্থবছরের শুরুতে ডলারের দাম ছিল ১১৮ টাকা, যা বছর শেষে ১২২ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। এর আগের অর্থবছরে এই দর ১০৯ টাকা থেকে বেড়ে ১১৮ টাকা হয়েছিল। ডলারের বিপরীতে টাকার এই অবমূল্যায়ন সরাসরি বিদ্যুৎ খাতের খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে।

বিদ্যুৎ খাতের এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি ও অসম চুক্তিগুলো খতিয়ে দেখতে গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। গত ২৫ জানুয়ারি প্রকাশিত ওই কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার থেকে সাড়ে ৯ হাজার মেগাওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। এই অলস সক্ষমতার জন্য বছরে ১১ হাজার থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকা (৯০ থেকে ১৫০ কোটি ডলার) গচ্চা দিতে হচ্ছে। গত দেড় দশকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিল ১১ গুণ বাড়লেও ক্যাপাসিটি চার্জ বেড়েছে প্রায় ২০ গুণ। অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন না বাড়লেও চুক্তির মারপ্যাঁচে কেন্দ্রভাড়া বেড়েই চলেছে।

জ্বালানি তেল কেনা নিয়েও পিডিবি এক অদ্ভুত পরিস্থিতির শিকার। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নিজেরা তেল আমদানি করে প্রতি লিটার ৭০ টাকায় কিনছে। অন্যদিকে, পিডিবিকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কাছ থেকে প্রতি লিটার ফার্নেস অয়েল কিনতে হচ্ছে ৮৬ টাকায়। বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলেও দেশে তা সমন্বয় করা হয়নি। বিপিসির এই বাড়তি দাম আদায়ের কারণেও পিডিবির উৎপাদন খরচ কমানো সম্ভব হচ্ছে না। যদিও বিপিসির দাম সমন্বয়ের একটি প্রস্তাব বর্তমানে বিইআরসির বিবেচনাধীন রয়েছে।

খরচ ও ভর্তুকির পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ ছিল ১১ টাকা ৫৪ পয়সা। পরের বছর তা সামান্য কমে ১১ টাকা ৪৪ পয়সা হলেও, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ১২ টাকা ৩৪ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ প্রতি ইউনিটে খরচ বেড়েছে ৯০ পয়সা। উৎপাদন খরচের তুলনায় বিক্রয়মূল্য কম হওয়ায় (গড় ৭ টাকা ৪ পয়সা) পিডিবিকে প্রতি বছর বিশাল অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে। গত অর্থবছরে এই খাতে ভর্তুকি লেগেছে ৫৯ হাজার কোটি টাকা।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানিয়েছেন, গত গ্রীষ্মে লোডশেডিং এড়াতে বাড়তি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছিল। গ্যাসের অভাবে তেল ও কয়লার ব্যবহার বাড়ায় খরচ বেড়েছে। তবে কেন্দ্রভাড়া কমাতে বর্তমানে আলোচনা চলছে এবং পর্যালোচনা কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘লুণ্ঠনমূলক ব্যয়ের’ ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছেন। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম এ বিষয়ে বলেন, বিগত সরকার লুণ্ঠনমূলক ব্যয়ের মাধ্যমে উৎপাদন খরচ বাড়িয়েছিল। বর্তমান সরকার দায়মুক্তি আইন বাতিল করলেও সেই সব অসম চুক্তি এখনও বহাল রেখেছে। খরচ কমানোর সুনির্দিষ্ট উপায় প্রস্তাব করা হলেও সরকার সে পথে হাঁটছে না, বরং আগের ধারাবাহিকতায় খাতটি পরিচালনা করছে।

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.