মেক্সিকোর পাহাড়ি শহর পাচুকার আকাশে আজও কখনও কখনও কর্নওয়ালের বাতাস ভেসে আসে। অবশ্য ভূগোলের বই খুলে দেখলে এমন কথা মানা কঠিন। ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমের এক প্রান্তিক উপদ্বীপ আর মেক্সিকোর মধ্যভাগের এক খনিশহরের মধ্যে হাজার হাজার মাইল সমুদ্রের দূরত্ব। কিন্তু মানুষের ইতিহাসে দূরত্ব বলে কিছু নেই। মানুষ যেখানে যায়, তার সঙ্গে ভেসে যায় ভাষা, স্মৃতি, খাবার, গান—এমনকি ফুটবলও।

খনি শ্রমিকের ঘাম থেকে জন্ম নেয়া মেক্সিকান ফুটবলের ইতিকথা
সম্পাদিত ছবি

পাচুকার স্টেডিয়ামে যখন সমর্থকেরা বিশাল এক পতাকা মেলে ধরে, সেখানে দেখা যায় এক খনি শ্রমিককে। তার এক হাতে খনির গাঁইতি, অন্য হাতে এক অদ্ভুত আকৃতির পেস্ট্রি। পাশে কালো পতাকায় সাদা ক্রস। যারা কর্নওয়ালকে চেনে, তারা মুহূর্তেই বুঝতে পারে—এ মানুষটি কর্নিশ।

মেক্সিকোর ফুটবল ইতিহাসের শিকড়ে যে কিছু ইংরেজ খনি শ্রমিকের ঘাম মিশে আছে, সেই স্মৃতির প্রতিই এই শ্রদ্ধা।

গল্পটির শুরু ১৮২৪ সালে

মেক্সিকো তখন সদ্য স্বাধীন। দীর্ঘ যুদ্ধ দেশের অর্থনীতিকে বিধ্বস্ত করেছে। বিশেষ করে রূপার খনিগুলো প্রায় মৃত। ঠিক সেই সময় কর্নওয়ালের এক খনি প্রকৌশলী, জন টেলর, দূর দেশ মেক্সিকোর রিয়াল দেল মন্তের খনিগুলোর দিকে তাকিয়ে ভাবলেন—যা কর্নওয়ালে পেরেছি, এখানেও পারব।

তার সেই সিদ্ধান্তের ফলেই শুরু হলো মানুষের এক অদ্ভুত যাতায়াত। কর্নওয়াল থেকে মানুষ এল মেক্সিকোতে, আবার ফিরে গেল ইংল্যান্ডে। সঙ্গে আনল নিজেদের ভাষা, খাবার, ধর্ম, অভ্যাস এবং খেলাধুলা।
ফুটবল তখনও পুরোপুরি জন্মায়নি।

প্রথমে এসেছিল ক্রিকেট

১৮৫০-এর দশকে কর্নিশ ব্যবসায়ী ফ্র্যাঙ্ক রুল পাচুকায় একটি ক্রিকেট দল গড়লেন। তখন ইংল্যান্ডেই ফুটবলের নিয়মকানুন পুরোপুরি স্থির হয়নি। ক্রিকেট মাঠের সেই খেলোয়াড়দের অনেকেই পরে ফুটবল খেলতে শুরু করল। যেন এক খেলার ভেতর থেকেই জন্ম নিল আরেক খেলা।

১৮৯২ সালে স্থানীয় একটি সংবাদপত্রে প্রথম ফুটবল দলের উল্লেখ পাওয়া যায়। মজার বিষয়, সেই সংবাদটি ছিল দল ভাঙনের খবর। পাচুকা আর রিয়াল দেল মন্তের খেলোয়াড়দের মধ্যে মতবিরোধ।

কর্নিশদের ইতিহাসে বিভাজন নতুন কিছু নয়। সমুদ্র পাড়ি দিয়েও তারা সেই স্বভাব বদলাতে পারেনি।
শেষ পর্যন্ত সবাই বুঝল, আলাদা থাকলে চলবে না।
১৮৯৫ সালে ফ্র্যাঙ্ক রুলের উদ্যোগে কয়েকটি ক্লাব একত্রিত হয়ে গঠন করল নতুন সংগঠন—পাচুকা অ্যাথলেটিক ক্লাব।

সেখান থেকেই শুরু

কেউ তখন ভাবতেও পারেনি যে এই ছোট্ট ক্লাব একদিন মেক্সিকোর ফুটবল ইতিহাসের জন্মকাহিনির অংশ হয়ে যাবে।

বিশ শতকের শুরুতে মেক্সিকোতে ফুটবলের আরও কয়েকটি কেন্দ্র গড়ে উঠল। ভেরাক্রুজের ওরিসাবা, মেক্সিকো সিটি এবং অন্য কয়েকটি শহরের দল মিলে গঠন করল দেশের প্রথম লিগ।

মেক্সিকোর ফুটবল তখন শিশু

কিন্তু শিশুরা যেমন দ্রুত বড় হয়, তেমনি ফুটবলও বাড়তে লাগল।

খনির শ্রমিকেরা মাঠে খেলত, আর তাদের স্ত্রী ও কন্যারা মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে উৎসাহ দিত। কর্নিশ মহিলাদের কথা আলাদা করে মনে রাখা উচিত। কারণ তারা শুধু দর্শক ছিলেন না; তারা সঙ্গে এনেছিলেন কর্নওয়ালের বিখ্যাত পেস্ট্রি।

খনিশ্রমিকদের জন্য বানানো সেই খাবারের পুরু প্রান্ত ছিল হাতলস্বরূপ। ধুলো-ময়লা লেগে থাকা হাত দিয়ে সেটুকু ধরে খাওয়া যেত। প্রয়োজন হলে খনির গভীরেও নামিয়ে দেওয়া যেত।

আজ মেক্সিকোতে সেই  পেস্ট্রি  বদলে হয়েছে "পাস্তে"।

কিন্তু নাম বদলালেও ইতিহাস বদলায় না

পাচুকার রাস্তায় আজও পাস্তের দোকান দেখা যায়। রিয়াল দেল মন্তেতে এখনও কর্নিশ পতাকা উড়ে। এমনকি প্রতি বছর সেখানে আন্তর্জাতিক পাস্তে উৎসবও হয়।

ইতিহাস কখনও কখনও অদ্ভুত রকমের জেদি। সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আসা স্মৃতিগুলোকে সে সহজে মরতে দেয় না।

১৯০৮ সালে পাচুকা দলে প্রথম মেক্সিকান খেলোয়াড়ের আগমন ঘটে। ধীরে ধীরে ফুটবল কেবল প্রবাসী ইংরেজদের খেলা রইল না; হয়ে উঠল মেক্সিকানদেরও খেলা।

তারপর বিপ্লব এলো

মেক্সিকান বিপ্লবের অভিঘাতে বহু পরিবার শহর ছেড়ে চলে গেল। পাচুকার প্রথম যুগের ক্লাবটি হারিয়ে গেল ইতিহাসের কুয়াশায়।

কিন্তু ফুটবল কখনও পুরোপুরি মরে না

যেমন নদী শুকিয়ে গেলেও তার পুরোনো খাত রয়ে যায়।
১৯৫০ সালে ক্লাবটি নতুনভাবে ফিরে এল। আবার হারাল। আবার ফিরে এল।

আজ সেই ক্লাব সাতবারের মেক্সিকান চ্যাম্পিয়ন। দক্ষিণ আমেরিকার কনমেবল প্রতিযোগিতাও জিতেছে। অথচ তাদের পরিচয়ের কেন্দ্রে এখনও রয়েছে এক খনি শ্রমিক, একটি গাঁইতি আর এক টুকরো পাস্তে।

পাচুকার মানুষ নিজেদের বলে "লস তুসোস" - গর্ত খুঁড়ে বসবাসকারী প্রাণীর নাম থেকে নেওয়া এই পরিচয়। যেন তারা নিজেদের শিকড় ভুলতে চায় না।

ফুটবল ক্লাবের ইতিহাস আসলে মানুষের ইতিহাস

একটি বল মাঠে গড়িয়েছে বলে নয়, বরং সেই বলের পেছনে ছুটতে ছুটতে মানুষ এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে বন্ধুত্ব, সংস্কৃতি ও স্মৃতির সেতু তৈরি করেছে বলে।

২০২৬ সালে মেক্সিকো আবার বিশ্বকাপের আয়োজক হবে। পৃথিবীর নানা দেশের মানুষ তখন এই দেশে আসবে।

তারা হয়তো জানবে না, পাচুকার কোনো এক গলির দোকানে যে গরম পাস্তে বিক্রি হচ্ছে, তার জন্ম একদা আটলান্টিকের ওপারে কর্নওয়ালের খনিগ্রামে।

কিন্তু ইতিহাসের সৌন্দর্য এখানেই। সব গল্প জানার প্রয়োজন হয় না।

কিছু গল্প কেবল খাবারের গন্ধে, পুরোনো পতাকার রঙে, কিংবা স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে ভেসে থাকা এক টুকরো স্মৃতিতে বেঁচে থাকে।

লেখক: ডা. আবু হেনা মোস্তফা বেলাল

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.