এক দশকে ছয় প্রধানমন্ত্রী: যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতা তুঙ্গে
- Details
- by আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে চলমান অস্থিরতার নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে। ব্রেক্সিট গণভোটের পর থেকে গত এক দশকে ছয়জন প্রধানমন্ত্রী বিদায় নিয়েছেন, যার ফলে দেশটি এখন তাদের সপ্তম সরকারপ্রধান নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। মাত্র দুই বছরেরও কম সময় আগে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসা স্টারমার লেবার পার্টির নতুন নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করবেন।

২০২৪ সালে কনজারভেটিভ পার্টির দীর্ঘ শাসনামলের পর স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ডাউনিং স্ট্রিটে প্রবেশ করেছিলেন স্টারমার। সে সময় তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘আমরা বলেছিলাম বিশৃঙ্খলার অবসান ঘটাব এবং আমরা তা করব।’ তবে ২০১৬ সালের পর থেকে রাজনৈতিক সংকটের চেয়েও দ্রুত বদলেছে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের বাসিন্দাদের নাম। ডেভিড ক্যামেরন, থেরেসা মে, বরিস জনসন, লিজ ট্রাস, ঋষি সুনাক এবং সবশেষ স্টারমার এই তালিকায় যুক্ত হয়েছেন।
অথচ আগের দশকগুলোর চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ১৯৭৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যে মাত্র পাঁচজন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। মার্গারেট থ্যাচার, জন মেজর, টনি ব্লেয়ার, গর্ডন ব্রাউন এবং ডেভিড ক্যামেরন মিলে প্রায় চার দশক দেশ শাসন করেছেন।
যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বে বারবার পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা নিচে তুলে ধরা হলো:
ডেভিড ক্যামেরন: ব্রেক্সিট জুয়ায় প্রধানমন্ত্রিত্বের অবসান
২০১০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত জোট সরকার ও পরে কনজারভেটিভ পার্টির সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন ডেভিড ক্যামেরন। দলের মিত্রদের কাছে তিনি একজন সৌভাগ্যবান রাজনৈতিক নেতা হিসেবে বিবেচিত হতেন। ২০১৫ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি কনজারভেটিভ পার্টিকে আবার ক্ষমতায় এনেছিলেন। তবে ব্রেক্সিট গণভোট তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি টানে। ২০১৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত ওই গণভোটে যুক্তরাজ্যের জনগণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পক্ষে রায় দেয়। ক্যামেরন ইইউতে থাকার পক্ষে প্রচার চালিয়েছিলেন। ৭২ শতাংশ ভোটারের উপস্থিতিতে ‘লিভ’ বা ইইউ ছাড়ার পক্ষে ৫১ দশমিক ৯ শতাংশ ভোট পড়ে। গণভোটের পরদিন সকালে পদত্যাগ করেন ক্যামেরন। ব্রেক্সিট-পরবর্তী অস্থির যুগে পতন হওয়া প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনি।
থেরেসা মে: ব্রেক্সিট চুক্তির বারবার ব্যর্থতা
ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিয়ে ২০১৬ সালের জুলাইয়ে ক্ষমতায় আসেন থেরেসা মে। ২০১৭ সালের মার্চে তিনি আর্টিকেল ৫০ প্রয়োগ করে আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ ছাড়ার প্রক্রিয়া শুরু করেন এবং নিজের অবস্থান শক্ত করতে আগাম নির্বাচন ডাকেন। তবে এই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। কনজারভেটিভ পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে তাকে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টির ওপর নির্ভর করতে হয়। পার্লামেন্ট তার ব্রেক্সিট চুক্তি তিনবার প্রত্যাখ্যান করে। ব্রেক্সিট সমর্থক ও ইইউ সমর্থক উভয় পক্ষই তাকে ব্যর্থতার দায়ে অভিযুক্ত করে। ২০১৯ সালের ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টির বড় পরাজয়ের পর তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেন। সে সময় থেরেসা মে জানান, তিনি চুক্তি পাসের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন এবং দেশের জন্য নতুন একজন প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্ব দেওয়াই ভালো হবে।
বরিস জনসন: ব্রেক্সিট বিজয় থেকে কেলেঙ্কারি
‘ব্রেক্সিট সম্পন্ন করার’ প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০১৯ সালে ক্ষমতায় আসেন বরিস জনসন। তিনি আশির দশকের পর কনজারভেটিভ পার্টিকে সবচেয়ে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা এনে দেন। তবে কোভিড-১৯ মহামারি এবং পরবর্তীতে বেশ কয়েকটি কেলেঙ্কারিতে তার পতন ত্বরান্বিত হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকর ছিল ‘পার্টিগেট’ কেলেঙ্কারি, যেখানে লকডাউন চলাকালে সরকারি ভবনে পার্টির আয়োজন করা হয়েছিল। জনসন বারবার দাবি করেছিলেন যে তিনি জেনেশুনে নিয়ম ভাঙেননি এবং সরল বিশ্বাসেই কাজ করেছেন। একটি অনাস্থা ভোটে টিকে গেলেও কয়েকদিনের মধ্যে দলের মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তাদের গণপদত্যাগের মুখে তিনি ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। তারা জানিয়েছিলেন, জনসনের নেতৃত্বকে আর সমর্থন করা সম্ভব নয়। ২০২২ সালের ৭ জুলাই তিনি কনজারভেটিভ পার্টির নেতার পদ ছাড়ার ঘোষণা দেন।
লিজ ট্রাস: অর্থনীতির ধাক্কা
মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি সংকটের মধ্যে কর ছাড় ও নিয়ন্ত্রণমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী হন লিজ ট্রাস। তার এবং তৎকালীন অর্থমন্ত্রী কোয়াসি কোয়ার্টেংয়ের ‘মিনি-বাজেট’ নামে পরিচিত কর ছাড়ের পরিকল্পনা আর্থিক বাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি করে। পাউন্ডের দরপতন ঠেকাতে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। চাপের মুখে ট্রাস তার অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাতিল করেন এবং কোয়ার্টেংয়ে বরখাস্ত করেন। দলের ভেতরে ক্ষোভ বাড়লে ২০২২ সালের অক্টোবরে পদত্যাগ করেন তিনি। মাত্র ৪৫ দিন ক্ষমতায় থেকে তিনি যুক্তরাজ্যের ইতিহাসের সবচেয়ে স্বল্পমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী হন। পদত্যাগের সময় তিনি বলেন, ‘আমি স্বীকার করছি যে ম্যান্ডেট নিয়ে কনজারভেটিভ পার্টি আমাকে নির্বাচিত করেছিল, তা আমি পূরণ করতে পারিনি।’
ঋষি সুনাক: স্থিতিশীলতা তবে উদ্ধার নয়
ট্রাসের বিদায়ের পর ২০২২ সালের অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী হন ঋষি সুনাক। তিনি অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও দলের ভেতরের কোন্দল মেটানোর প্রতিশ্রুতি দেন। মূল্যস্ফীতি কমানো, অর্থনীতি শক্তিশালী করা, ঋণ হ্রাস ও অবৈধ অভিবাসন ঠেকানোর মতো বিষয়গুলোকে তিনি অগ্রাধিকার দেন। তবে ১৪ বছরের কনজারভেটিভ শাসন নিয়ে জনগণের ক্ষোভ চরমে পৌঁছায়। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল সরকারকে চাপে রাখে। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টির কাছে বড় ব্যবধানে হেরে ক্ষমতা ছাড়তে হয় তাকে এবং ক্ষমতায় আসেন কিয়ার স্টারমার।
কিয়ার স্টারমার: বিশৃঙ্খলা অবসানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া নেতা
স্টারমারের বিজয়কে একটি বড় বাঁকবদল হিসেবে দেখা হয়েছিল। ২০১৯ সালের পরাজয়ের পর লেবার পার্টিকে পুনর্গঠন করে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন তিনি। তবে অর্থনৈতিক চাপ, দলের জনপ্রিয়তা হ্রাস এবং নাইজেল ফারাজের রিফর্ম ইউকে দলের উত্থান তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে কিছু জনমত জরিপে রিফর্ম পার্টি লেবার পার্টিকে ছাড়িয়ে যায়। কল্যাণভাতা কমানোর সিদ্ধান্তে দলের বিদ্রোহ এবং কয়েকজন মন্ত্রীর পদত্যাগে তার কর্তৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এ বছর স্থানীয় নির্বাচনে বড় পরাজয়ের পর লেবার আইনপ্রণেতাদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয় যে, স্টারমারের নেতৃত্বে আগামী সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হওয়া সম্ভব নয়। পদত্যাগের ভাষণে স্টারমার বলেন, ‘আমার দল এখন প্রশ্ন তুলছে যে আগামী সাধারণ নির্বাচনে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আমি সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি কি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি উত্তরটি পেয়েছি।’
এরপর কী ঘটবে?
লেবার পার্টি নতুন নেতা নির্বাচন না করা পর্যন্ত কিয়ার স্টারমার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকবেন। দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটি ৯ জুলাই মনোনয়নের প্রক্রিয়া শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রার্থীদের অন্তত এক-পঞ্চমাংশ লেবার আইনপ্রণেতার সমর্থন পেতে হবে। একক প্রার্থী থাকলে জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়েই নতুন নেতার নাম ঘোষণা হতে পারে। তবে একাধিক প্রার্থী থাকলে তা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গড়াতে পারে। নির্বাচনে লড়ার ঘোষণা দেওয়ায় গ্রেটার ম্যানচেস্টারের সাবেক মেয়র অ্যান্ডি বার্নহামকে এই পদের দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে রাখা হচ্ছে। তিনি এরই মধ্যে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংয়ের সমর্থন পেয়েছেন। এছাড়া সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেনার এবং সাবেক সশস্ত্র বাহিনী মন্ত্রী আল কার্নস। পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্সে লেবার পার্টির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় এই নেতৃত্ব পরিবর্তনের কারণে আগাম সাধারণ নির্বাচনের প্রয়োজন হবে না। নতুন নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর রাজা তৃতীয় চার্লস তাকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানাবেন এবং তিনিই হবেন যুক্তরাজ্যের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী।
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.