কাতারের এলএনজি বন্ধের শঙ্কা, বড় জ্বালানি ঝুঁকিতে বাংলাদেশ
- Details
- by ২৪ ডেস্ক
হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে চলমান সংকটের কারণে কাতার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। কাতার এনার্জি তাদের ‘ফোর্স মেজর’ পরিস্থিতির মেয়াদ বাড়ানোয় বাংলাদেশসহ এশিয়া ও ইউরোপের বেশ কয়েকটি আমদানিকারক দেশে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

হরমুজ প্রণালী দিয়ে এলএনজি পরিবহন এখনো প্রায় স্বাভাবিক হয়নি। ফলে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে যেসব চালান বিভিন্ন দেশে যাওয়ার কথা ছিল, সেগুলোর অনেকগুলোই বাতিল বা স্থগিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। পাকিস্তানের ক্রেতাদের অক্টোবর পর্যন্ত সরবরাহ বাতিল হওয়ার আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেপ্টেম্বরের পর সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার তথ্য পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি এবং স্পট মার্কেট—দুই উৎস থেকেই এলএনজি আমদানি করে। কাতার ও ওমানের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি রয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের পর দুই দেশ থেকেই নিয়মিত এলএনজি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মাঝে মধ্যে কিছু চালান এলেও তা দেশের প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়।
এ অবস্থায় জরুরি ভিত্তিতে বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহের চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। কিন্তু নির্ধারিত কয়েকটি চালান সময়মতো না পৌঁছানোয় দেশে গ্যাসের সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ইউরো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাতার এনার্জির সাম্প্রতিক বাতিল করা কিছু এলএনজি চালানের সময়সীমা নভেম্বরের প্রথম ভাগ পর্যন্ত গড়িয়েছে। ফলে ইউরোপ ও এশিয়ার ক্রেতারা বিকল্প সরবরাহকারীর কাছ থেকে গ্যাস সংগ্রহের চেষ্টা করছে। কেউ কেউ অন্য জ্বালানিতে যাচ্ছে, আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।
ইতালির জ্বালানি কোম্পানি এডিসন জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে নভেম্বরের শুরুর সময়ের মধ্যে নির্ধারিত আরও পাঁচটি এলএনজি কার্গো কাতার এনার্জি সরবরাহ করতে পারবে না।
এডিসনের সঙ্গে কাতার এনার্জির চুক্তির আওতায় এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত বাতিল হওয়া চালানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯টি। এসব চালানে মোট প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনমিটার প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের কথা ছিল।
তবে এডিসন জানিয়েছে, বাতিল হওয়া চালানের মধ্যে ২১টির বিকল্প ব্যবস্থা করা হয়েছে। এসব চালানে প্রায় ২০০ কোটি ঘনমিটার গ্যাস ছিল। বিকল্প উৎস থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারায় গ্রাহকদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে কাতার এনার্জি মার্চে প্রথমবার ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করে। এরপর পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় কয়েক দফায় এর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।
কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির বিশেষজ্ঞ অ্যান-সোফি করবো মনে করেন, রাজনৈতিক সমাধান না হলে এই সংকট আরও কিছু সময় অব্যাহত থাকতে পারে। স্বাভাবিকভাবে এলএনজি রপ্তানি কবে শুরু হবে, সে বিষয়ে কাতার এনার্জি নির্দিষ্ট নিশ্চয়তা দিতে না পারায় মাসে মাসে পরিস্থিতির মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।
সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে কাতারের এলএনজি সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমে গেছে। আইসিআইএসের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর প্রথম ছয় মাসে কাতার মাত্র ১৮টি এলএনজি কার্গো রপ্তানি করেছে। আগের বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৫০৯টি।
এর প্রভাব পড়েছে কাতারের জ্বালানি আয়ে। গ্যাস বিক্রি থেকে দেশটির আয় প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার বা ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলার কমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কাতারের সরবরাহ ঘাটতি পূরণে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে এলএনজি রপ্তানি বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে চালু হওয়া নতুন কিছু এলএনজি প্রকল্পও বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ আনছে। পাশাপাশি নাইজেরিয়া ও মালয়েশিয়ায় উৎপাদন বাড়ার কারণে বিশ্ববাজারে কিছুটা স্বস্তি এসেছে।
তবে এসব উদ্যোগ কাতার থেকে কমে যাওয়া সরবরাহের পুরো ঘাটতি পূরণ করতে পারছে না। এশিয়ার কয়েকটি দেশে গ্যাসের ব্যবহার কমেছে এবং কোথাও কোথাও বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে।
ইউরোপের দেশগুলোও উচ্চমূল্যের স্পট মার্কেট থেকে অতিরিক্ত এলএনজি কেনার পরিবর্তে মজুত থাকা গ্যাস বেশি ব্যবহার করছে। ফলে বাজারে পাওয়া সীমিত এলএনজি তুলনামূলক বেশি দামে কিনতে সক্ষম দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোই সুবিধা পাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ অ্যান-সোফি করবোর মতে, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে দীর্ঘ সময় এলএনজি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে বিশ্ববাজারে এর প্রভাব পড়বে। অন্য দেশগুলো উৎপাদন বাড়ালেও ২০২৬ সালে বৈশ্বিক এলএনজি বাণিজ্যের মোট পরিমাণ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কাতারের সরবরাহ সংকটে সব আমদানিকারক দেশ সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। যেসব দেশ এলএনজির ওপর বেশি নির্ভরশীল এবং আমদানির বড় অংশ কাতার বা সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে সংগ্রহ করে, তাদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
বিশেষ করে বিকল্প কার্গো দ্রুত নিশ্চিত করতে না পারলে সংকট আরও তীব্র হতে পারে। স্বল্পমেয়াদি চুক্তির ওপর বেশি নির্ভরশীল আমদানিকারকরাও বাড়তি চাপের মধ্যে রয়েছে।
অ্যান-সোফি করবোর মূল্যায়নে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারত রয়েছে। বিপরীতে জাপানের ঝুঁকি তুলনামূলক কম। কারণ, দেশটি কাতারের ওপর অতটা নির্ভরশীল নয় এবং বিভিন্ন উৎসের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে সরবরাহ নিশ্চিত করেছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নাইজেরিয়ায় নতুন এলএনজি রপ্তানি অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে। এসব প্রকল্প চালু হলে কাতারের বাইরে থেকে সরবরাহ বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে বিশ্ববাজারে এলএনজির সরবরাহ-চাহিদার ভারসাম্য স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে ফিরতে ২০২৮ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি খুলে গেলেই এলএনজি সরবরাহ তাৎক্ষণিকভাবে স্বাভাবিক হয়ে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। যুদ্ধের আগে বৈশ্বিক এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।
বর্তমানে কিছু তেলবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করলেও এলএনজি বহনকারী জাহাজের চলাচল সীমিত। এসব জাহাজ বিশেষায়িত হওয়ায় দ্রুত বিকল্প জাহাজের ব্যবস্থা করাও কঠিন।
এ ছাড়া কাতারের গ্যাস রপ্তানির জন্য হরমুজ প্রণালীর বাইরে কার্যকর বিকল্প পথ খুবই সীমিত। ফলে জলপথ স্বাভাবিক হলেও উৎপাদন ও পরিবহন ব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে সময় লাগতে পারে।
কাতার এনার্জির যেসব এলএনজি উৎপাদন ইউনিট সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, সেগুলো থেকে উৎপাদন পুনরায় চালু করতেও প্রায় দুই মাস সময় লাগতে পারে। আর রাস লাফান এলাকায় হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত দুটি উৎপাদন ইউনিট মেরামতে তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে কাতার এনার্জি জানিয়েছে।
জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর সীমিত আকারে এলএনজি পরিবহন ফের শুরু হয়েছিল। কিন্তু নতুন করে হামলা ও নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়ায় সেই উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ফলে বাংলাদেশসহ এলএনজি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর সামনে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.